ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৪ কার্তিক ১৪২৪, ১৯ অক্টোবর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

নরম আলোয় ললিতপুরে দুই বিকাল

শান্তা মারিয়া : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৬-১৪ ২:১৫:১৪ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৬-১৪ ২:১৫:১৪ পিএম

(লক্ষ্মণরেখার বাইরে: ১৯)

 

শান্তা মারিয়া: বিকেলের নরম আলো গড়িয়ে পড়েছে প্রাচীন শহরের রাজপথে। দাঁড়িয়ে আছি রাজপ্রাসাদের সামনে। মনে হচ্ছে রূপকথার দেশ। সিংহদরজা দিয়ে এখনি বেরিয়ে আসবে রাজপুত্র রূপকুমার। কিংবা প্রাসাদের অলিন্দে এসে দাঁড়াবে রাজকন্যা কাঞ্চনমালা। নাহ্, তেমন কিছু ঘটল না। যদিও সত্যিই রাজপ্রাসাদের সামনেই দাঁড়ানো আমরা। কাঠমান্ডু শহর থেকে একটু দূরেই ললিতপুর বা পাটন। আসলে এটা কাঠমান্ডু লাগোয়া। বাগমতী নদীর কাছাকাছি। এটি কাঠমান্ডু আর পোখরার পর নেপালের তৃতীয় বৃহত্তম শহর। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে এখানে নগর গড়ে ওঠে।

ললিতপুর যাওয়া হয়েছিল দুবার। ২০০৮ এবং ২০১৬ সালে। প্রথমবার আমি, মাহমুদ সেলিমভাই, জয়পুরহাটের শাহীনভাই এবং খুজিস্তা বেগম জোনাকি গেলাম পাটন বেড়াতে। সঙ্গে বোধহয় আরো দু’চারজন ছিলেন। বিকেলের নরম আলোয় প্রথমবারের মতো দেখলাম একটি প্রাচীন শহর। শহরটি টুরিস্টদের জন্য সংরক্ষিত করে রেখে দেওয়া হয়েছে। প্রাচীন প্রাসাদ, মন্দির সব আশ্চর্য মোহময় পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। আমরা গিয়েছিলাম ললিতপুর দরবার স্কোয়ারে। রাজপ্রাসাদের সামনে খোলা জায়গা। মনে পড়ছিল কবিতা ‘দূরে বহুদূরে স্বপ্নলোকে উজ্জয়িনীপুরে।’ সত্যিই মনে হচ্ছিল স্বপ্নলোকে বিগত জন্মের ফেলে আসা কোনো স্মৃতির সন্ধানে এখানে এসেছি। সেবার যদিও রাজপ্রাসাদের ভিতরে ঢোকা হয়নি। সময় ছিল না।

পরের বার গেলাম বেশ বড় দলে। নেটজ-এর প্রধান হাবীব মুনিরভাই অনেক পড়াশোনা জানা মানুষ। তিনি পাটন শহরের ইতিহাসটাও জানিয়ে দিলেন। আমিও অবশ্য উইকিপিডিয়া থেকে আগেই পাটন শহরের ইতিহাস পড়ে নিয়েছিলাম যেটা কোথাও বেড়াতে গেলে আমি বরাবরই করে থাকি। তবে মুনিরভাই ইতিহাসের ঘটনাগুলো বর্ণনা করছিলেন বেশ প্রাণবন্তভাবে যা উইকিপিডিয়ায় সম্ভব নয়।


এখানে খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকের দিকে প্রথমে ছিল কিরাত রাজ্য। পরে লিচ্ছবি গণরাজ্য ছিল ললিতপুরে। পরে মল্লরাও এখানে রাজত্ব গড়ে তোলে। সতেরশ আটষট্টি সালে ললিতপুর গোর্খারাজ্যের অন্তভূর্ক্ত হয়। পৃথ্বি নারায়ণ শাহের সময়ে সেটা ঘটে বলতে গেলে বিনাযুদ্ধে।

মহাভারতে কিরাতদের কথা পড়েছি। আর লিচ্ছবিদের গণরাজ্যের গল্প তো ইতিহাস। লিচ্ছবি, মল্ল, শকদের গণরাজ্য। সেই প্রাচীন ভারতবর্ষে টুকরো টুকরো ছোট ছোট রাজ্য যেখানে গনতন্ত্রের চর্চা রয়েছে। খুব অদ্ভুত লাগছিল। মনে হচ্ছিল যেন কোনো মন্ত্রবলে প্রাচীন ভারতে ফিরে গেছি।

আমরা রাজপ্রাসাদে আর একটি মন্দিরে ঢুকলাম। রাজপ্রাসাদের অন্দরমহলে একটা প্রাচীন পুকুর। সিঁড়ি বেয়ে নামতে হয় বেশ অনেক ধাপ। প্রাচীন পুকুরে এখনও জল আছে সেটাই আশ্চর্য। জায়গাটার নাম তুষাহিতি। পুকুরের সিঁড়ির ধাপ, ঘাটের কারুকার্য আশ্চর্য সুন্দর। দেখে সত্যিই মনে হয় এখানে একসময় রানী আর রাজকন্যারা ঘাটে বসে চুল এলিয়ে দিয়ে গল্প করতেন। তাদের নিক্কন সৃষ্টি করতো মোহময় ছন্দ।

এই শহরের আরেক নাম ইয়ালা। কারণ রাজা ইলাম্বর একসময় নিজের নামে এই শহরের নামকরণ করেছিলেন। ২০১৫ সালের ভূমিকম্পে পাটনের অনেক ক্ষতি হয়। অনেক প্রাচীন স্থাপনা ধ্বংস হয়ে যায়। বিশেষ করে পাটনের দরবার স্কোয়ার বেশ ক্ষতির মুখে পড়ে। তবে সেসব দ্রুতই মেরামত করা হচ্ছে। সাধ্যমত দ্রুতগতিতে কাজ চলছে দেখে এলাম। সম্রাট অশোক এবং তার কন্যাও এখানে এসেছিলেন বলে শোনা যায়। তারা এখানে একটি স্তম্ভ স্থাপন করেন।


পাটন বা ললিতপুর ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। দুহাজার বছরের বেশি প্রাচীন এই জনপদে যে অবাক করা স্থাপনাগুলো রয়েছে সেগুলোর কাঠের কাজ দেখলে সত্যিই বিস্ময়ে মুগ্ধ হয়ে যেতে হয়। মঙ্গলময় সিংহও রয়েছে পাটনের বিভিন্ন স্থাপনার সামনে। আমরা একটি মন্দিরের ভিতরে ঢুকে দেখলাম সেখানে এখনও পূজা হয়। সন্ধ্যায় আরতি জ্বলে। ভিতরে ছোট্ট একটি আশ্রয়কেন্দ্রের মতোও রয়েছে। সেখানে দুতিনজন সেবায়েত ও ছাত্র বাস করেন। যদিও এই এলাকায় কোনো বাণিজ্যিক স্থাপনা পুরোপুরি নিষিদ্ধ।

প্রাচীন সেই মন্দিরের আরতি দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল প্রাচীন ভারতবর্ষের আধ্যাত্মিক রূপটি যেন দেখতে পাচ্ছি। এই ধুপের ধোঁয়া ভেসে আসছে দুহাজার বছর ধরে। সঙ্গে বয়ে এনেছে প্রাচীন দিনের সৌরভ। হিন্দু ও বৌদ্ধ দুই ধর্মাবলম্বী লোকদের জন্যই কিন্তু পাটনে মন্দির রয়েছে।

ললিতপুরে শুধু দেখা আর প্রাচীন সময়ে হারিয়ে যাওয়াই নয়। কেনাকাটা করার মজা রয়েছে ভালোই। পাটনে জিনিসপত্রের দাম বেশ সস্তা। থামেলের তুলনায় তো সস্তা বটেই। একথাও জানা ছিল ফেলুদার অ্যাডভেঞ্চার ‘যতকাণ্ড কাঠমান্ডুতে’ পড়ার সুবাদে। দেখলাম সত্যিই তাই। দরবার স্কোয়ারেই বিক্রি হচ্ছে পাথরের  মালা, হার, দুলসহ নানারকম গহনাপত্র। আর একটু এদিক-ওদিক তাকালেই চোখে পড়ে অসংখ্য দোকান। যদিও প্রাচীন এলাকার সৌন্দর্য ও আমেজ নষ্ট হবে বলে দোকানগুলো মূল স্পট থেকে একটু দূরে। পাটন থেকে প্রথমবার প্রচুর শাল কিনেছিলাম।

পাটনে তোপসে আর জটায়ু পুরনো এক গলিতে খুঁজে পেয়েছিল নকল ওষুধের কারখানা। আমিও প্রথমবার একটু এদিক-ওদিক মানে দরবার স্কোয়ারের পিছনের গলিগুলো খুঁজে দেখলাম। বেশ নিরিবিলি জায়গা। পাটনে কাঠের কাজ বিখ্যাত। এখান থেকে ছবির ফ্রেম, বৌদ্ধ দেবী তারার প্রতিকৃতি আর জপযন্ত্র কিনেছিলাম। পরের বারও বেশ কিছু কেনাকাটা করলাম। আসলে জিনিসগুলো এত সুন্দর যে এখান থেকে কিছু না কেনা প্রায় অসম্ভব। আমার ঘরে ধুলোপড়া অবস্থায় এখনও পাটন থেকে কেনা কাঠের ফটোফ্রেমগুলো রয়েছে। সেগুলো দেখলে মন চলে যায় ললিতপুরের সেই বিকেলে। মনে পড়ে মাহমুদ সেলিম ভাইয়ের কণ্ঠে শোনা, ‘আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে’। সত্যিই ললিতপুরের দুটি বিকেলই আমার জীবনের দারুণ সুন্দর স্মৃতি।





রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৪ জুন ২০১৭/তারা

Walton
 
   
Marcel