ঢাকা     বুধবার   ১৮ মে ২০২২ ||  জ্যৈষ্ঠ ৪ ১৪২৯ ||  ১৬ শাওয়াল ১৪৪৩

ভাঙছে পদ্মার পাড়, কাঁদছে মানুষ

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি  || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০০:৪৮, ২৯ জানুয়ারি ২০২২   আপডেট: ০০:৫৫, ২৯ জানুয়ারি ২০২২
ভাঙছে পদ্মার পাড়, কাঁদছে মানুষ

কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার বহলবাড়ীয়া, সাহেবনগর ও আশপাশের প্রায় ৯ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে পদ্মা নদীতে ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙনে ইতোমধ্যেই নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে কয়েক হাজার বিঘা ফসলি জমি। এছাড়াও হুমকির মধ্যে রয়েছে উত্তর বঙ্গের সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র সড়কপথ কুষ্টিয়া-পাবনা মহাসড়ক। শুষ্ক মৌসুমে নদী ভাঙ্গনের এমন ভয়াবহ রূপ এর আগে কখনও দেখেনি বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নদীর বাম তীরে রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প রক্ষায় পদ্মা নদীর আড়াইশ মিটার ভেতরে এসে গ্রোয়েন করার কারণে পদ্মা তার গতিপথ পরিবর্তন করে ডানতীরে ভাঙন সৃষ্টি করেছে। সেই সঙ্গে অপরিকল্পিত ও অবৈধভাবে নদী থেকে বালি উত্তোলনের কারণেও নদী ভাঙন দেখা দিয়েছে। 
এদিকে আয়ের একমাত্র উৎস ফসলি জমি হারিয়ে নদী তীরবর্তী জনপদের মানুষগুলো চরম বিপদের মধ্যে রয়েছেন।

মিরপুর উপজেলার সাহেব নগর গ্রামের বৃদ্ধা সরিজান নেছা (৭৮)। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘বাবারে এর আগে আরও তিনবার গাঙ্গের ভাঙনে ঘরবাড়ি হারায়ে এই গ্রামে আইসি। আমার শ্বশুর বসা দিয়ে গেছে। আর কয়দিনি বা বাঁচপো মরার আগে এই বাড়িডাও মনে হচ্ছে আর থাকপিনা। সরকার যদি এই ভাঙন ঠেকানির কাজ করি দিতি তালি আর ভাঙবি না।’

বহলবাড়ীয়ার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মেহেদী হাসান অভিযোগ করে বলেন, ‘রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রতিরক্ষায় পদ্মা নদীর ৩০০মিটার ভেতরে বাঁধ তৈরী করেছে। গত বছর থেকেই নদীর পানি বহলবাড়িয়া খাদিমপুর সাহেব নগর এলাকার উপর চাপ সৃষ্টি করে। তখনই আমরা বিষয়টি সমাধানের জন্য নেতাদের বলেছি, কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। গত ৭ দিনে সাড়ে ৭০০ একর ফসলি জমি নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে।’

স্থানীয় স্কুল শিক্ষক মওদুদ আহমেদ রাজিব বলেন, ‘ভাঙনের মাত্রা অনেক বেশি। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এখানকার স্কুল, কলেজ, মাদরাসা, মসজিদসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি অবকাঠামো নদীগর্ভে যাওয়ার অপেক্ষায় আছে। এখানে ভাঙন যে তীব্র আকার ধারণ করেছে তাতে শত শত মানুষ রাতে না ঘুমিয়ে বসে বসে পাহাড়া দিচ্ছে কখন যে কার সাহায্যে দৌঁড়াতে হয়।’

কুষ্টিয়া সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শাকিরুল ইসলাম বলেন, `কুষ্টিয়াসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১০ জেলার সঙ্গে উত্তর বঙ্গ ও ঢাকার যোগাযোগ রক্ষাকারী একমাত্র মহাসড়কটি পদ্মার ভাঙনে ঝুঁকির মধ্যে আছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি স্থান নদীর পাড় থেকে মাত্র ১৫০ থেকে ২০০ মিটার দূরত্বের মধ্যে চলে এসেছে। যা দুই বছর আগেও অন্তত ২ কিলোমিটার দূরে ছিল। বিষয়টি জানিয়ে উর্দ্ধতন মহলে পত্র চিঠি দিয়েছি। তাছাড়া বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড কুষ্টিয়ার সঙ্গেও আমি কথা বলেছি। উনারা ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেবেন বলে জানিয়েছেন।’

পানি উন্নয়ন কুষ্টিয়া তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আব্দুল হামিদ বলেন, ‘পদ্মার ডানতীর ভাঙনের ঝুঁকি কয়েক বছর আগে থেকেই দেখা দিয়েছে। এবারের বন্যার পানি কমে যাওয়ার পর একদিকে নদীর মাঝখানে চর জেগে উঠেছে। অন্যদিকে পদ্মার বামতীরে রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র রক্ষায় নদীর প্রায় আড়াইশ থেকে ৩শ মিটার ভিতরে এসে গ্রোয়েন করার কারণে নদীর মরফোলজিক্যাল চেঞ্জ বা গতিপথের পরিবর্তন হওয়ায় ভাঙন দেখা দিয়ে থাকতে পারে।’

তিনি আরো বলেন, ‘সমস্যা সমাধানে ইতোমধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ড উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা বা ডিপিপি প্রেরণ করেছে। সেটা প্রি-একনেক থেকে আবার সম্ভাব্যতা যাচায়ের জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। জরুরী ভিত্তিতে বালি ভর্তি জিও ব্যাগ ফেলানোর উদ্যোগ এখন প্রক্রিয়াধীণ।

কাঞ্চন/ মাসুদ

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়