ঢাকা     সোমবার   ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ ||  মাঘ ১২ ১৪৩২

Risingbd Online Bangla News Portal

ব্যাংক ঋণ না পেয়ে মহাজনে ঝুঁকছেন হাওরের ভূমিহীন চাষিরা

রুমন চক্রবর্তী, কিশোরগঞ্জ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১১:৫৯, ২৬ জানুয়ারি ২০২৬   আপডেট: ১২:০৮, ২৬ জানুয়ারি ২০২৬
ব্যাংক ঋণ না পেয়ে মহাজনে ঝুঁকছেন হাওরের ভূমিহীন চাষিরা

ধানের জমিতে সার দিচ্ছেন কিশোরগঞ্জের হাওরের এক কৃষক।

হাওরে এখন পুরোদমে চলছে বোরোচাষ। চারা রোপণ প্রায় শেষ পর্যায়ে। সদ্য বোনা জমিতে দেওয়া হচ্ছে সেচ। সার প্রয়োগ ও পরিচর্যায় ব্যস্ত কৃষক। এই ব্যস্ততার মাঝেই ভূমিহীন চাষিরা ছুটছেন পুঁজির খোঁজে। তাদের কেউ ঋণের জন্য এনজিওতে, অবার অনেকে কড়া নাড়ছেন মহাজনের দরজায়।

ভূমিহীন চাষিরা জানান, ব্যাংকের দরজা তাদের জন্য প্রায় বন্ধ। জমির কাগজপত্র না থাকায় এবং জমির মালিক জামিনদার না হওয়ায় ব্যাংকের কৃষিঋণ থেকে বঞ্চিত হয়ে এখন চরম সংকটে পড়েছেন তারা।

আরো পড়ুন:

কিশোরগঞ্জের হাওর এলাকায় বোরো ধান চাষে জড়িত চাষিদের বড় একটি অংশই ভূমিহীন। তারা বড় কৃষক বা জমির মালিকদের কাছ থেকে এক বছরের জন্য জমি ভাড়া নিয়ে চাষাবাদ করেন। কিন্তু, জমির মালিকানা বা কাগজপত্র না থাকায় এসব কৃষক ব্যাংক থেকে কৃষিঋণ পান না। ফলে পুঁজির সংকটে বাধ্য হয়ে তাদের যেতে হচ্ছে এনজিও ও মহাজনের কাছে। সেখানে নিতে হয় চড়া সুদের ঋণ। অন্যদিকে, ব্যাংকের কৃষিঋণের বড় অংশ চলে যাচ্ছে জমির মালিকদের হাতে, যারা নিজেরা সরাসরি চাষ করেন না জমি।

কৃষি বিভাগ ও কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হাওরের বোরো চাষিদের প্রায় ৮০ শতাংশই ভূমিহীন। স্থানীয়ভাবে ‘জমা’ পদ্ধতিতে তারা জমি ভাড়া নিয়ে চাষ করেন। জমা, সার, বীজ, সেচসহ সবকিছুর জন্যই শুরুতেই দরকার নগদ টাকা। নিজের নামে জমির কাগজ না থাকায় ব্যাংক কৃষিঋণ দেয় না তাদের। ফলে ঋণের বোঝা নিয়েই শুরু হয় তাদের চাষাবাদ। তার ওপর রয়েছে অকাল বন্যা ও বৈরী আবহাওয়ার ঝুঁকি। সব মিলিয়ে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেও লাভ থাকে না কৃষিতে।

করিমগঞ্জের চংনোয়াগাঁয়ের ভূমিহীন কৃষক আব্দুল কুদ্দুস বলেন, “ব্যাংক আমারারে কয় জমির কাগজ দেহাইতে। আমরা তো জমির মালিকই না। জমির কোনো কাগজপত্র নাই আমারার কাছে। তাই বাধ্য হইয়া মহাজনের কাছ থেইক্যা টাকা নেওন লাগে। কড়া সুদে টাকা নেওন লাগে।”

জমি প্রস্তুতে ব্যস্ত কয়েকজন কৃষক


হাওর উপজেলা মিঠামইনের গোপদীঘির আলাল মিয়া বলেন, “ফসল ওঠার পর আগে সুদের টাকা শোধ করতে হয়। লাভ থাকে হাতে গোনা।” 

একই এলাকার চাষি রফিক মিয়া বলেন, ‍“যদি একবার বন্যা হয়, তাইলে তো আমরার সব শেষ হইয়া যায়। ঋণ আর সুদ তো থাইক্যাই যায়।”

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কিশোরগঞ্জ জেলায় মোট কৃষক পরিবার ৫ লাখ ২১ হাজার ৬০০টি। এর মধ্যে ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষক পরিবার রয়েছে ৪ লাখ ৬৩ হাজার ১৯৬টি। অর্থাৎ জেলার অধিকাংশ কৃষকই ব্যাংকের কৃষিঋণের আওতার বাইরে। এই বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠেছে, কৃষিঋণ আসলে কাদের দেওয়া হচ্ছে।

কৃষি ব্যাংকের করিমগঞ্জ উপজেলার মরিচখালী বাজার শাখার কর্মকর্তা সাগর আহমেদ বলেন, “বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী জমির মালিক যদি ভূমিহীন কৃষকের জামিনদার হন, তবেই কৃষিঋণ দেওয়া সম্ভব।” তবে স্থানীয় চাষিদের অভিযোগ, বাস্তবে এমন জামিনদার খুব কমই পাওয়া যায়।

জমির মালিক করিমগঞ্জ উপজেলার গুণধর ইউনিয়নের তাজুল ইসলাম। তিনি জানান, “শ্রমিক সংকট, উচ্চ মজুরি এবং অন্য পেশায় যুক্ত হয়ে পড়ার কারণে তারা নিজেরা আর চাষাবাদ করেন না। তাই এক বছরের জন্য টাকার বিনিময়ে তাদের জমি জমা দিয়ে দেন ভূমিহীন কৃষকের কাছে। 

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. মো. সাদিকুর রহমান বলেন, “যারা সরাসরি মাঠে নেমে চাষ করেন, তাদের সহজ শর্তে কৃষিঋণ দেওয়া জরুরি। পাশাপাশি কৃষকদের শস্যবীমার আওতায় আনা দরকার।” 

তিনি বলেন, “এ বছর কিশোরগঞ্জ জেলায় ১ লাখ ৬৮ হাজার ২৬০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ হচ্ছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১১ লাখ ৯৫ হাজার ২৯ মেট্রিক টন ধান। জেলায় ৩৩টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান কৃষিঋণ বিতরণ করে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কৃষিঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫৫৯ কোটি ৮১ লাখ টাকা। এর মধ্যে বিতরণ হয়েছে ৭৩ শতাংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৬০ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। এখন পর্যন্ত বিতরণ হয়েছে ২৬৯ কোটি ৩৪ লাখ টাকা।”

অগ্রণী ব্যাংক জেলার কৃষিঋণ বিতরণের লিডিং প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানের জেলা ঋণ বিতরণ কমিটির সদস্যসচিব হলেন ব্যাংকটির কিশোরগঞ্জ আঞ্চলিক কার্যালয়ের এজিএম মোবারক হোসেন। তিনি বলেন, “যাদের জমির কাগজপত্র আছে, তারা খুব সহজেই কৃষিঋণ পায়। যাদের জমির কাগজ নেই, তাদের বেলায় জমির মালিককে জামিনদার হতে হয়।”

কৃষকদের অধিকার ও বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে কাজ করছে, ফ্যামিলি টাইস ফর ওমেন ডেভেলপমেন্ট। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক খুজিস্তা বেগম জোনাকি জানান, হাওরের কৃষকরা বরাবরই অবহেলিত। আমরা চাই ব্যাংক কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তাদের সহজ শর্তে অথবা কৃষি কার্ডের মাধ্যমে সহজ ঋণ বাস্তবায়ন করা হোক। বাস্তবতা হলো, যারা জমির মালিক অথচ চাষ করেন না, তারাই সহজে ঋণ পাচ্ছেন। আর যারা মাঠে নেমে ধান ফলান, তারাই ঋণবঞ্চিত। এই বৈষম্য দূর না হলে হাওরের বোরো চাষ টেকসই হবে না বলে মনে করছেন তিনি।

ঢাকা/মাসুদ

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়