ঢাকা     রোববার   ১৫ মার্চ ২০২৬ ||  চৈত্র ২ ১৪৩২ || ২৬ রমজান ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণহীন ক্ষমতা বিশ্বকে কীভাবে বদলে দিয়েছে

সাইমন স্পিকম্যান কোর্ডাল || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২১:২৪, ১৫ মার্চ ২০২৬   আপডেট: ২১:২৯, ১৫ মার্চ ২০২৬
ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণহীন ক্ষমতা বিশ্বকে কীভাবে বদলে দিয়েছে

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় অনেক আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ প্রশ্ন তুলছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল, সেটি আদৌ কার্যকর আছে কি না।

নিজের দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে মনে হচ্ছে প্রায় সীমাহীন ক্ষমতা প্রয়োগ করছেন, আর মার্কিন সংবিধানে নির্ধারিত ক্ষমতার ভারসাম্য ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাগুলো যেন তার ক্ষমতা সীমিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে।

আরো পড়ুন:

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প শপথ নেওয়ার পর থেকে তিনি স্বাধীন রাষ্ট্র ভেনেজুয়েলা ও ইরানের ওপর দুটি উসকানিবিহীন হামলার নির্দেশ দিয়েছেন; গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্ত করার হুমকি দিয়েছেন; ইউরোপের সঙ্গে ঐতিহ্যগত জোটে টানাপোড়েন সৃষ্টি করেছেন; জাতসংঘকেও দুর্বল করেছেন এবং ব্যাপক শুল্ক আরোপ করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে নাড়িয়ে দিয়েছেন।

জাতিসংঘ ব্যবস্থাপনা ও আন্তর্জাতিক আইনের যে সীমাবদ্ধতাগুলো আগে ছিল, সেগুলো যেন এখন আর কার্যকর নয়। ট্রাম্প জানুয়ারিতে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, তার ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ করবে কেবল তার নিজস্ব নৈতিকতা।

তাহলে ট্রাম্পকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কী কী ব্যবস্থা আছে? তিনি কি সত্যিই স্বাধীনভাবে বিভিন্ন দেশে হামলা চালাতে, ইচ্ছামতো শুল্ক আরোপ করতে এবং বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রের নেতা হিসেবে বৈশ্বিক নীতি প্রায় একাই নির্ধারণ করতে পারেন? আর যদি তাই হয়, তাহলে এত পর্যবেক্ষক কেন এখন বলছেন যে ইরানের বিরুদ্ধে তার যুদ্ধ দুর্বল হয়ে পড়ছে?

আন্তর্জাতিক আইন কি ট্রাম্পকে কোনোভাবে থামাতে পেরেছে?
এখন পর্যন্ত নয়।

বিশ্লেষকদের মতে, ভেনেজুয়েলা ও ইরানের ওপর তার হামলা দুটিই আন্তর্জাতিক আইন এবং জাতিসংঘ সনদের স্পষ্ট লঙ্ঘন, বিশেষ করে সনদের ২(৪) অনুচ্ছেদে বলপ্রয়োগের নিষেধাজ্ঞার বিধান।

আন্তর্জাতিক আইন দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা বিশ্ব এবং বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে- এমন বিতর্ক নতুন নয়। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সিতে আন্তর্জাতিক আইনের সামান্য যে প্রতীকী সীমাবদ্ধতাও ছিল, সেটিও কার্যত উপেক্ষিত হয়েছে।

ট্রাম্প নিজেও আন্তর্জাতিক আইনকে পাশ কাটিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে কখন এবং কতটা আন্তর্জাতিক আইন প্রযোজ্য হবে, সেটি তিনিই ঠিক করবেন।

ডাবলিনের ট্রিনিটি কলেজের আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনবিষয়ক অধ্যাপক এবং আগে আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতে কাজ করা মাইকেল বেকার আল জাজিরাকে বলেন, “অনেক দিক থেকেই আন্তর্জাতিক আইন ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করেছে, এবং সেই স্বার্থই সাধারণত জাতিসংঘ সনদের মূল নীতিগুলো ঘিরে গড়ে ওঠা নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থাকে সমর্থন করার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইনের মূল্য উপলব্ধি করতে গেলে দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি দরকার, যা স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক এজেন্ডার সঙ্গে সহজে মেলে না।”

তিনি আরো বলেন, “বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডকে অর্থপূর্ণভাবে সীমাবদ্ধ করার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনের সক্ষমতা প্রায় নেই বললেই চলে। এবং অন্য দেশগুলো ট্রাম্পের ‘গ্যাংস্টারসুলভ’ আচরণের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়াতে ব্যর্থ হওয়ায় এই পরিস্থিতির পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনাও কম।”

জাতিসংঘ কি কিছু করতে পারছে?
তেমনটা নয়।

প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই জাতিসংঘের ভূমিকা ছিল সংঘাতের বদলে সংলাপকে উৎসাহিত করা এবং আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জের জন্য বৈশ্বিক সমাধান তৈরি করা। কিন্তু ট্রাম্পের সঙ্গে এই সংস্থার সম্পর্কও খুব সরল নয়।

একদিকে, তিনি গাজায় জাতিসংঘের ত্রাণ কার্যক্রমকে পাশ কাটিয়ে ‘বোর্ড অব পিস’ গঠনের চেষ্টা করেছেন। অন্যদিকে, কিছু প্রকল্পে বৈধতা পেতে তিনি আবার জাতিসংঘের সহায়তাও চেয়েছেন; যেমন- আগস্টে তিনি হাইতিতে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে সহায়তার জন্য জাতিসংঘকে একটি সহায়তা অফিস গঠনের আহ্বান জানান।

“তবে জাতিসংঘের সমর্থন কাজে লাগলেও ট্রাম্প যে সনদ মেনে চলতে চান না, সেটি স্পষ্ট,” বলেছেন ক্রাইসিস গ্রুপের সাবেক জাতিসংঘ পরিচালক রিচার্ড গোয়ান।

তিনি বলেন, “অন্যান্য জাতিসংঘ সদস্যরা দেখছে যে যুক্তরাষ্ট্র নিয়মিত আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গ করছে। কিন্তু নিরাপত্তা পরিষদের মতো ফোরামে তারা ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে খুব জোরে সমালোচনা করতে দ্বিধা করে, কারণ তারা ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়ার ভয় পায়।”

“ফলে ট্রাম্প বুঝে গেছেন যে, তিনি যখন খুশি জাতিসংঘকে পাশ কাটিয়ে যেতে পারেন এবং তাতেও পার পেয়ে যেতে পারেন, আর প্রয়োজনে নিজের স্বার্থে সংস্থাটিকে ব্যবহার করতে পারেন।”

অন্যান্য বড় শক্তিগুলো কী করছে?
একটি সীমা পর্যন্ত তারা এগোয়।

কানাডা, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্সসহ কিছু ইউরোপীয় দেশ, যাদের ‘মিডল পাওয়ার’ বলা হয়, তারা ট্রাম্পের একতরফাভাবে গ্রিনল্যান্ড দখলের প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে।

কিন্তু ইউরোপীয় শক্তিগুলো ভেনেজুয়েলা ও ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের উসকানিবিহীন যুদ্ধের নিন্দা করতে ব্যর্থ হয়েছে। এতে মধ্যপ্রাচ্য ও গ্লোবাল সাউথের সংঘাত নিয়ে তাদের দ্বৈত মানদণ্ড প্রকাশ পেয়েছে।

অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ইরানের পাল্টা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত উপসাগরীয় দেশগুলো যদি যুক্তরাষ্ট্রে তাদের বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে, তাহলে যুদ্ধ দ্রুত শেষ হতে পারে।

লন্ডনের রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষক এইচ এ হেলিয়ার বলেন, “মিডল পাওয়ারগুলো কিছু চাপ তৈরি করতে পারে, কিন্তু ভেটো দিতে পারে না। ইউরোপীয় সরকার এবং উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর যৌথ পদক্ষেপ যুদ্ধের খরচ বাড়াতে পারে এবং কিছু কৌশলগত পরিবর্তন আনতে পারে। কিন্তু কাঠামোগত বাস্তবতা হলো, যুক্তরাষ্ট্র এখনো সামরিক, আর্থিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিতে প্রাধান্য ধরে রেখেছে।”

“ছোট দেশগুলো সাধারণত ঝুঁকি এড়াতে চায়, তারা ওয়াশিংটনের অনুসরণ করে বা আঞ্চলিক জোটের আশ্রয় নেয়,” বলেন তিনি।

এদিকে চীন ও রাশিয়া আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের সমালোচনা করলেও সরাসরি উত্তেজনা বাড়ানোর পথ এড়িয়ে চলছে। আর ভারতস ব্রিকসের অনেক সদস্য প্রায় নীরব থেকেছে, যা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের মুখোমুখি হওয়ার বদলে কৌশলগত অস্পষ্টতার ইঙ্গিত দেয়।

যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা?
সেখানেও খুব একটা (নিয়ন্ত্রণ) নেই।

যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোার্ট ট্রাম্পের শুল্কনীতির কিছু অংশ আটকে দিয়েছিল, যেখানে তিনি মিত্রদের কম শুল্ক দিয়ে পুরস্কৃত এবং সমালোচকদের ওপর বেশি শুল্ক চাপিয়ে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করছিলেন।

কিন্তু অন্য অনেক ঐতিহ্যগত নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা যেমন কংগ্রেস, বিচার বিভাগ কিংবা সংবাদমাধ্যম, ট্রাম্পের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে খুব একটা সীমাবদ্ধ করতে পারেনি।

এটি পুরোপুরি নতুন নয়; আগের প্রেসিডেন্টরাও কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া যুদ্ধ শুরু করেছেন। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের ক্ষেত্রে এটি অনেক বেশি নিয়মিত এবং পদ্ধতিগত।

প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কিম লেন শেপপেলের মতে, শক্তিশালী মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো ট্রাম্প প্রশাসনকে জবাবদিহির আওতায় আনতে ব্যর্থ হয়েছে।

তিনি বলেন, “তার শক্ত সমর্থকরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে ইরানে বন্ধুত্বপূর্ণ সরকার প্রতিষ্ঠা হলে অল্পসময়ের জন্য জ্বালানির দাম বাড়লেও তারা মেনে নিতে প্রস্তুত। আর তার বিরোধীরা সব বিষয়েই তার বিরোধী, তাই তিনি তাদের উপেক্ষা করেন বা হুমকি দেন।”

“ট্রাম্প জনমতের চেয়ে বাজারের পারফরম্যান্সের দিকে বেশি নজর দেন। তাই তিনি বলতে শুরু করেছেন, তিনি খরচ কমিয়ে আনছেন এবং ইরান যুদ্ধ স্বল্পমেয়াদি; যাতে বাজার আবার চাঙ্গা হয়,” বলেন অধ্যাপক কিম লেন শেপপেল।

তাহলে কেন বলা হচ্ছে ট্রাম্পের যুদ্ধ দুর্বল হয়ে পড়ছে?
অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, স্পষ্ট যুদ্ধলক্ষ্য বা সমাধানের পথ না থাকায় ট্রাম্প এমন এক সংঘাতের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকিতে আছেন, যা ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে এবং অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলছে; যা তার প্রশাসন আগে হয়তো কল্পনাও করেনি।

ট্রাম্প বারবার বলেছেন, যুদ্ধ দ্রুত শেষ হবে। যদিও তার ঘোষিত লক্ষ্যগুলোর কোনোটিই এখনো অর্জিত হয়নি।

ইরানের ওপর হামলা, তেহরানের পাল্টা আঘাত এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করার হুমকির কারণে তেলের দাম বেড়ে গেছে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।

আন্তর্জাতিক আনবিক সংস্থা (আইএইএ) আন্তর্জাতিক মজুত থেকে ৪০০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিলেও দাম খুব একটা কমেনি।

ইরান সতর্ক করেছে, হরমুজ প্রণালিতে তাদের চাপ অব্যাহত থাকলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে।

শেষ পর্যন্ত মাইকেল বেকারের মতে, ট্রাম্পের নব্য সাম্রাজ্যবাদী প্রবণতাকে সীমিত করার সবচেয়ে বড় কারণ হতে পারে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার অর্থনৈতিক প্রভাব এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদের মধ্যে তার বৈশ্বিক সামরিক তৎপরতা, ব্যক্তিগত স্বার্থসাধন এবং যুদ্ধের মানবিক ক্ষতির প্রতি তার উদাসীনতা নিয়ে বাড়তে থাকা অসন্তোষ।

[নোট: সাইমন স্পিকম্যান কোর্ডাল তিউনিসিয়াভিত্তিক ফ্রিল্যান্সার সাংবাদিক। তার এই লেখাটি ১৫ মার্চ প্রকাশ করেছে আলজাজিরা। তিনি দ্য গার্ডিয়ানসহ বিশ্বের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে স্বাধীনভাবে কাজ করেন]

ঢাকা/রাসেল

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়