সুই-সুতায় টিকে থাকার লড়াই
নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম || রাইজিংবিডি.কম
ঈদ সামনে রেখে পোশাকে নকশা ফুটিয়ে তুলতে ব্যস্ত সময় পার করছেন চট্টগ্রামের খুলশীর ঝাউতলা বিহারি পল্লীর সূচিশিল্পীরা।
ঈদ সামনে। চট্টগ্রামের খুলশীর ঝাউতলা বিহারি পল্লীর সরু গলিগুলোতে এখন ব্যস্ততা চোখে পড়ার মতো। কাঠের ফ্রেমে টানটান কাপড়, নিপুণ হাতে সুই-সুতার চলাচল। জরি, চুমকি আর পাথরে ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে নকশা। ঈদের জন্য নান্দনিক পোশাক তৈরিতে দিনরাত কাজ করছেন এখানকার সূচিশিল্পীরা।
ঝাউতলা বিহারি কলোনি একসময় কারচুপি আর জারদৌসির জন্য পরিচিত ছিল দেশজুড়ে। এখন এই পেশায় টিকে আছেন হাতে গোনা কয়েকজন। ঈদের মৌসুম এলেই কাজের চাপ বৃদ্ধি পায় তাদের। এই সময় প্রায় ১৫ থেকে ২০টি কারখানায় কাজ চলে। বছরের অন্য সময় এই সংখ্যা অর্ধেকে নামে।
সূচিশিল্পীরা জানান, যন্ত্রে তৈরি পোশাকের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় হার মানছে হাতের কাজ। জীবিকার তাগিদে অনেক কারিগর অন্য পেশায় চলে গেছেন। নতুন কেউ এই কাজে আসছেন না। ঈদ এলেই টিকে থাকার নতুন আশায় কাজ করেন তারা। ছোট কারখানাগুলোতে এখন একই ফ্রেমে ২ থেকে ৬ জন পর্যন্ত কাজ করছেন।
কারচুপি ও জারদৌসি মূলত হস্তশিল্প। কাঠের ফ্রেমে নকশা আঁকা কাপড় বসিয়ে সুই, জরি, সুতা, পুঁতি, চুমকি আর পাথর দিয়ে তৈরি হয় অলংকরণ। মোগল স্থাপত্যের ছাপ এই কাজের বড় বৈশিষ্ট্য। মিনার, কলকা আর লতাপাতার নকশা বেশি দেখা যায়। পিওর সিল্ক, মসলিন, জর্জেট আর ভেলভেটের কাপড়ে এই কাজ সবচেয়ে ভালো ফুটিয়ে তুলতে পারেন কারিগররা।
সূচিশিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানান, একটি পাঞ্জাবিতে কাজ শেষ হতে লাগে একদিন থেকে এক সপ্তাহ। শাড়িতে সময় লাগে এক মাস পর্যন্ত। জটিল নকশায় কখনো দুই মাসের বেশি সময়ও চলে যায়। কাজভেদে পারিশ্রমিক ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত। আগে উন্নত নকশার শাড়ি বা বিয়ের লেহেঙ্গাতে লাখ টাকার কাজও হতো। এখন সে ধরনের অর্ডার প্রায় নেই।
পাঞ্জাবিতে সুতার কাজ করছেন একজন সূচিশিল্পী
বিহারি পল্লীর কামাল উদ্দিন নামের এক কারখানার মালিক জানান, সালোয়ারের কারচুপি করতে খরচ পড়ে ৩ থেকে ২০ হাজার টাকা। পাঞ্জাবিতে আড়াই হাজার থেকে ১০ হাজার, থ্রি পিসে ২ থেকে ১২ হাজার ও লেহেঙ্গায় ৫ থেকে ১৫ হাজার টাকার মতো খরচ হয়। বোরকায় সাড়ে ৩ থেকে ৭ হাজার ও ওড়নায় দেড় থেকে ২ হাজার টাকার মতো খরচ হয়। শাড়িতে ১০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়।
স্থানীয় কারিগর মোহাম্মদ রাকিব বলেন, “বেনারসি শাড়ি, পাঞ্জাবি, সালোয়ার কামিজ, থ্রি পিস, আবায়া আর বোরকার অর্ডার বেশি আসছে ঈদকে ঘিরে। অনলাইনে অর্ডার বাড়ছে। অনেকেই সরাসরি এসে কাজ দিয়ে যান। তবে, কাঁচামালের সংকট বড় সমস্যা। জরি, সুতা, পুঁতি আর সিল্কের কাপড় আগে ভারত ও পাকিস্তান থেকে আসত, আমদানি খরচ বেড়েছে। সব জিনিসের দাম বেড়ে গেছে। তাই পোশাকে ডিজাইনে খরচ অনেক বেড়েছে। ফলে গ্রাহকের আগ্রহ কমেছে।”
ঢাকা/রেজাউল/মাসুদ