বিভিন্ন ধর্ম ও সভ্যতায় রোজার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
সাতসতেরো ডেস্ক || রাইজিংবিডি.কম
ছবি: সংগৃহীত
ইসলাম ধর্মের পাঁচটি মূল স্তম্ভের একটি হলো রোজা। রমজান মাসে মুসলমানরা এক মাস ধরে রোজা পালন করেন। তবে ইসলামের আবির্ভাবের আগেও মধ্যপ্রাচ্যে রোজা বা উপবাসের ধারণা প্রচলিত ছিল বলে জানা যায়। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ধর্ম ও সভ্যতায় রোজার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস তুলে ধরা হলো।
ফেরাউন বা প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতা
প্রাচীন মিশরীয়রা দেবতাদের নৈকট্য অর্জন, সন্তুষ্টি লাভ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের উদ্দেশ্যে নানা আচার-অনুষ্ঠান পালন করতেন। এর মধ্যে উপবাসও ছিল গুরুত্বপূর্ণ একটি অনুশীলন। তারা বসন্ত উৎসব, ফসল উৎসব এবং নীলনদের প্লাবন উৎসব উদযাপন করতেন। এসব আচার-অনুষ্ঠানের লক্ষ্য ছিল আত্মাকে পাপ ও ত্রুটি থেকে শুদ্ধ করা, যাতে দেবতারা অসন্তুষ্ট না হন। তবে তাদের উপবাসের ধরন নিয়ে প্রত্নতাত্ত্বিক ও গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কেউ মনে করেন, উপবাস কেবল পুরোহিতদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। আবার কেউ বলেন, সাধারণ মানুষও উপবাস পালন করতেন। অন্য কিছু গবেষক আসমানি কিতাবভিত্তিক ধর্মগুলোর রোজার সঙ্গে প্রাচীন মিশরীয় উপবাসের সরাসরি সম্পর্ক খুঁজে পান না।
কিছু গবেষকের মতে, তাদের উপবাস সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত চলত। এ উপবাসের মেয়াদ তিন দিন থেকে ৭০ দিন পর্যন্ত হতে পারত। এ সময় তারা খাদ্য, পানীয় ও যৌন সম্পর্ক থেকে বিরত থাকতেন। মৃত ব্যক্তিদের আত্মার শান্তির উদ্দেশ্যেও উপবাস পালনের প্রচলন ছিল। আবার এমন উপবাসও ছিল, যেখানে ৭০ দিন ধরে কেবল শাকসবজি ও পানি গ্রহণের অনুমতি ছিল।
জরথুস্ত্রবাদ ও ইয়াজিদি ধর্ম
খ্রিস্টপূর্ব তিন হাজার বছরেরও বেশি আগে পারস্য অঞ্চলে জরথুস্ত্রবাদ প্রচলিত ছিল। বর্তমানে এই ধর্মের অনুসারীরা ইরাক, সিরিয়া, তুরস্ক, ইরান, ভারত, আফগানিস্তান ও আজারবাইজানসহ বিভিন্ন দেশে বসবাস করেন। জরথুস্ত্র-এর শিক্ষা থেকে এ ধর্মের সূচনা। দীর্ঘ সময় তার চিন্তাধারা ধর্মীয় ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হলেও পরবর্তী সময়ে অন্যান্য ধর্মের আবির্ভাবে এর প্রভাব কমে যায়।
জরথুস্ত্রবাদে উপবাসকে নিরুৎসাহিত করা হতো। তাদের বিশ্বাস ছিল, উপবাস মানুষের শক্তি কমিয়ে দেয় এবং অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়ায়, যা সমাজের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে ইয়াজিদি ধর্ম-এ তিন দিনের রোজা রাখার প্রচলন রয়েছে। তাদের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী রোজা মঙ্গলবার শুরু হয়ে বৃহস্পতিবার শেষ হয়। এটি সূর্যোদয়ে শুরু হয়ে সূর্যাস্তে শেষ হয়। ধর্মযাজকেরা টানা তিন দিন রোজা পালন করেন এবং ‘ঈদ ইজি’ নামের উৎসবের মাধ্যমে তা সমাপ্ত করেন। ইয়াজিদিদের মধ্যে দুই ধরনের রোজা রয়েছে— সাধারণ মানুষের জন্য এবং ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব বা বিশেষ শ্রেণির জন্য।
শিশু, প্রতিবন্ধী ও অসুস্থরা এ থেকে অব্যাহতি পান। ধর্মীয় ব্যক্তিত্বরা বিশেষ রোজা পালন করেন। দরিদ্র ব্যক্তিরা মানত করলে তাও পালন করতে পারেন। বছরের বেশিরভাগ সময় এ রোজা রাখা যায়, তবে সাধারণ মানুষের জন্য এটি বাধ্যতামূলক নয়।
এছাড়া ‘সাওম খুদান’ নামে আরেক ধরনের রোজাও প্রচলিত আছে, যা সাধু-অলিয়া ও আগ্রহী সাধারণ মানুষ পালন করেন। বেশি দিন রোজা রাখলে তা নিয়ে গর্ব করার রীতিও রয়েছে।
ইহুদিধর্ম
মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ মানুষ তিনটি আসমানি ধর্ম অনুসরণ করেন, পাশাপাশি হাজার বছরের পুরোনো অন্যান্য বিশ্বাসও বিদ্যমান। ইহুদিধর্ম আব্রাহামিক ধর্মগুলোর মধ্যে প্রাচীনতম। এ ধর্মে ‘ইয়োম কিপুর’ বা প্রায়শ্চিত্তের দিনে উপবাসের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ইহুদি বিশ্বাস অনুযায়ী, এই দিনেই মুসা দ্বিতীয়বার সিনাই পর্বত থেকে অবতরণ করেন এবং তার সঙ্গে তাওরাতের ফলক ছিল। ইয়োম কিপুর ২৬ ঘণ্টা স্থায়ী হয় এবং এটি ইহুদিদের সবচেয়ে পবিত্র ধর্মীয় দিন হিসেবে বিবেচিত। এই দিনে তারা পার্থিব ভোগ-বিলাস থেকে বিরত থেকে ইবাদত ও আত্মসমালোচনায় সময় ব্যয় করেন। সূর্যাস্ত থেকে পরদিন রাত পর্যন্ত উপবাস পালন করা হয়। ইহুদিধর্মের নিয়ম অনুযায়ী, অসুস্থ বা গর্ভবতী নারীরা উপবাস থেকে অব্যাহতি পান।
আধুনিক ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব বা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের কর্মক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকলে তারা রোজা নাও রাখতে পারেন। এছাড়া স্বেচ্ছা উপবাসেরও প্রচলন রয়েছে, যা পাপের প্রায়শ্চিত্ত, করুণা প্রার্থনা বা নিয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশের উদ্দেশ্যে পালন করা হয়।
খ্রিষ্টধর্ম
খ্রিষ্টধর্ম-এ উপবাসের উদ্দেশ্য হলো ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তার নৈকট্য অর্জন। খ্রিষ্টানদের কাছে উপবাস ঈশ্বরের সঙ্গে আধ্যাত্মিক সম্পর্কের প্রতীক এবং যিশুখ্রিষ্ট-এর শিক্ষা অনুসরণের অঙ্গীকারের নিদর্শন।
বাইবেলে উপবাসের নির্দিষ্ট সময় বা মাস উল্লেখ নেই। প্রতিটি গির্জা বা সম্প্রদায় তাদের অনুসারীদের জন্য উপবাসের সময় নির্ধারণ করে। ফলে খ্রিষ্টানদের মধ্যে উপবাস পালনের পদ্ধতি ও সময়ে ভিন্নতা রয়েছে।
ইস্টার-এর আগে ৪০ দিনের উপবাস (লেন্ট) পালিত হয়, যা বিভিন্ন গির্জার ঐতিহ্যের ওপর নির্ভর করে। এই সময় খ্রিষ্টানরা সাধারণত দিনে অন্তত ১২ ঘণ্টা খাদ্য থেকে বিরত থাকেন। কেউ কেউ আরও দীর্ঘ সময় উপবাস পালন করেন।
মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে উপবাস বা রোজা কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়; বরং আত্মশুদ্ধি, প্রায়শ্চিত্ত, কৃতজ্ঞতা ও সৃষ্টিকর্তার নৈকট্য লাভের এক প্রাচীন ও বহুমাত্রিক অনুশীলন। ইসলাম ধর্মে রমজানের রোজা যেমন একটি নির্ধারিত বিধান, তেমনি অন্যান্য ধর্ম ও সভ্যতাতেও উপবাসের নিজস্ব ঐতিহ্য ও তাৎপর্য রয়েছে।
সূত্র: বিবিসি
ঢাকা/লিপি