ইবি শিক্ষিকা রুনা হত্যা: ‘কী হবে এই বাচ্চা চারটির’
কুষ্টিয়া প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম
কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি ও সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনার (বাঁয়ে) কবরের সামনে স্বজনদের সঙ্গে তার বড়ে তাইবা।
খুনির ছুরির আঘাতে পৃথিবীকে বিদায় জানানো কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি ও সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনা রেখে গেছেন ছোট ছোট চারটি সন্তান, যার মধ্যে সবচেয়ে বড়টির বয়স ৯ বছর এবং সবার ছোটটির বয়স মাত্র ৭ মাস।
জানাজার সময় রুনার বাবা কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, “মা ছাড়া এই এতিম বাচ্চাদের কে দেখবে? কী হবে এই মাসুম বাচ্চা চারটির?”
জানাজা শেষে দাফন হয়েছে রুনার। তার আগে ময়না তদন্তে উঠে এসেছে মৃত্যুর কারণ।
বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে চিকিৎসকদের প্রাথমিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, উপর্যুপরি আঘাতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে রুনার মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. হোসেন ইমাম ময়নাতদন্তের বিষয়ে এই তথ্য দিয়েছেন।
তিনি বলেন, “আসমা সাদিয়া রুনার গলার ডান পাশের নিচের দিকে একটি গভীর ক্ষত পাওয়া গেছে। ধারালো ছুরি বা কোনো ধারালো অস্ত্রের আঘাতে ওই ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে। এতে গলার বড় রক্তনালী কেটে গেছে। সেখানে প্রচুর রক্ত জমাট বাঁধা অবস্থায় পাওয়া যায়। ওই রক্তনালী কেটে যাওয়ার ফলে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয় এবং এর কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে।”
ডা. হোসেন ইমাম বলেন, “তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। বুকে, পিঠে, পেটে ও হাতে প্রায় অন্তত ২০টি আঘাত রয়েছে। তবে এসব আঘাত গভীর নয়, এগুলোর কারণে মৃত্যু হয়নি। হামলার সময় নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে গিয়ে এসব আঘাত পেয়েছেন তিনি।”
আরো উচ্চতর বা ফরেনসিক ময়নাতদন্ত করা হবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে এই চিকিৎসক বলেন, “আপাতত না। কারণ ঘটনাটির সব কিছু পরিষ্কারভাবে বোঝা যাচ্ছে। এটা আমাদের প্রাথমিক প্রতিবেদন। তবে চিকিৎসকদের একটি বোর্ড বসিয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হবে।”
এ ঘটনায় একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। বোর্ডের সদস্যরা হলেন, আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. হোসেন ইমাম, মেডিকেল অফিসার (এমও) রুমন রহমান ও সুমাইয়া জান্নাত।
চার সন্তানের কান্না
বৃহস্পতিবার বাদ জোহর কুষ্টিয়ার কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে জানাজার পর কুষ্টিয়া কেন্দ্রীয় পৌর গোরস্থানে আসমা সাদিয়া রুনার দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে। এই জানাজায় কুষ্টিয়া-৩ আসনে সংসদ সদস্য ও ইসলামী বক্তা মুফতি আমির হামজা, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নকিব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ ও উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মো. ইয়াকুব আলীসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অংশ নেন।
নিহত শিক্ষিকা রুনার বাবা আশিকুল হক কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “আমার অনেক স্বপ্ন ছিল মেয়েকে নিয়ে। এই মেয়ে আমার বড় মেয়ে। এখন তার চারটা বাচ্চা এতিম হয়ে গেল। মা ছাড়া এই এতিম বাচ্চাদের কী হবে! কে দেখবে এখন তাদের? ছোট বাচ্চাটা কীভাবে মানুষ হবে মাকে ছাড়া?”
শিক্ষিকা রুনা চারটি শিশু সন্তান রেখে গেছেন। তারা হলো, তাইবা (৯), তাবাসসুম (৭), আয়েশা (৭ মাস) ও এক ছেলে সাজিদ (৫)। তারা বারবার ছুটে যাচ্ছিল মায়ের মরদেহের কাছে। মাকে দেখার আকুতি করছিল। তাদের কান্না থামছিল না।
বুধবার (৪ মার্চ) বিকেল ৪টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের থিওলজি অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ অনুষদ ভবনে আসমা সাদিয়া রুনাকে ছুরিকাঘাত করে আত্মহননের চেষ্টা করেন একই বিভাগের সাবেক কর্মচারী ফজলুর রহমান। খবর পেয়ে প্রক্টরিয়াল বডি ও ইবি থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে উভয়ের রক্তাক্ত দেহ উদ্ধার করে। পরে তাদেরকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে পাঠানো হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক রুনাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঢাকা/কাঞ্চন/রাসেল