ঢাকা     শুক্রবার   ০৬ মার্চ ২০২৬ ||  ফাল্গুন ২১ ১৪৩২ || ১৬ রমজান ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

গণবিশ্ববিদ্যালয়ে তোলপাড়

ধর্ষণের শিকার ছাত্রীকে নিরাপত্তা দেওয়ায় গবিসাসে গকসুর ‘মব’

সাভার (ঢাকা) প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৩:০৬, ৬ মার্চ ২০২৬   আপডেট: ০৩:০৬, ৬ মার্চ ২০২৬
ধর্ষণের শিকার ছাত্রীকে নিরাপত্তা দেওয়ায় গবিসাসে গকসুর ‘মব’

বৃহস্পতিবার বিকেলে ঢাকার সাভারে গণবিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবনের নিচতলায় গবিসাস কার্যালয়ে এসে সেটি বন্ধ করার নির্দেশ দেন গকসুর ভিপি-জিএসসহ ২৫-৩০ জন শিক্ষার্থী।

ঢাকার সাভারের আশুলিয়ায় এক ছাত্রীকে গণধর্ষণের ঘটনার খবর প্রকাশ ও তাকে নিরাপত্তা দেওয়াকে ঘিরে গণবিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি (গবিসাস) বন্ধ করে সাংবাদিকদের বের করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে গণবিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (গকসু) নেতাদের বিরুদ্ধে। 

প্রশাসনের অংশ হিসেবে গবিসাস বন্ধ করার এখতিয়ার আছে বলে ভাষ্য খাড়া করেছেন গকসু নেতারা। যদিও গণবিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী স্পষ্ট জানিয়ে দেন, গকসু এই ধরনের কোনো এখতিয়ার রাখে না।

আরো পড়ুন:

সম্প্রতি গণবিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী গণধর্ষণের শিকার হওয়ার পর গকসু ভিপির হয়রানির শিকার হয়ে সংবাদ সম্মেলনে এলে তাকে তুলে নিয়ে হেনস্তার চেষ্টা করে তার স্ত্রী পরিচয় দেওয়া এক ছাত্রীসহ কয়েকজন। সেদিন কার্যালয়েও ভাঙচুর করেন হামলাকারীরা। এরই ধারাবাহিকতায় গকসু ভিপির নেতৃত্বে এবার গবিসাস কার্যালয়ে এসে সেটি বন্ধই ঘোষণা করে গেলেন গকসুর নেতারা।

বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) বিকেলে ক্যাম্পাসের একাডেমিক ভবনের নিচতলায় গবিসাস কার্যালয়ে এসে গকসুর ভিপি ইয়াসিন আল মৃদুল দেওয়ান, জিএস রায়হান খানসহ গকসুর নেতারা এসে এই নির্দেশ দেন। তবে এই বিষয়ে কোনো লিখিত নির্দেশ দিতে রাজি হননি তারা। এমনকি এই ঘটনার ভিডিও বক্তব্যও দিতে রাজি হননি।

গকসু নেতাদের দাবি, গকসু প্রশাসনের অংশ, সে হিসেবে তারা এই নির্দেশ দিয়েছেন। 

তবে উপাচার্য আবুল হোসেন বলেছেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে এমন কোনো নির্দেশের বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না।

প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থী ও গবিসাসের সদস্যরা জানান, বেলা আড়াইটার দিকে গকসু ভিপি ইয়াসিন আল মৃদুল দেওয়ান, জিএস রায়হান খান, এজিএস সামিউল হাসানসহ গকসুর ১৭ থেকে ১৮ জন প্রতিনিধি এবং ৮ থেকে ১০ জন শিক্ষার্থীসহ ২৫ থেকে ৩০ জন শিক্ষার্থী গবিসাস কার্যালয়ে আসেন। তখন সেখানে গবিসাস সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকসহ চারজন সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন। 

গকসু জিএস রায়হান খান কার্যালয়ে ঢুকে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের উদ্দেশে বলেন, “গবিসাসের কাজে শিক্ষার্থীরা আস্থা হারিয়েছেন। সিংহভাগ শিক্ষার্থীর মতে গবিসাস অকার্যকর হয়ে গেছে। তাই কাজ বন্ধ থাকবে। ভর্তি কমে যাওয়া, বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল নেতিবাচক প্রচারে গবিসাস কাজ করে। এসব কারণে অধিকাংশ শিক্ষার্থীর ম্যান্ডেটে গণবিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি আজ থেকে বন্ধ ঘোষণা করা হলো।”

গবিসাসের কার্যালয়ে টেবিল চাপড়ে এমন ভাষায় হুমকি দিতে থাকেন রায়হান খান।

সদলবলে রায়হান খান পাঁচ মিনিটের মধ্যে গবিসাস সদস্যদের অফিস ত্যাগ করতে আল্টিমেটাম দেন। তাদের সঙ্গে আসা এক শিক্ষার্থী গবিসাসের একটি বৈদ্যুতিক বাতি ভেঙে ফেলেন। সেখানে থাকা আইন বিভাগের শিক্ষার্থী জুবায়ের গবিসাস সদস্যদের দিকে বই ছুড়ে মারেন। একপর্যায়ে গবিসাস নেতৃত্ব তাদের জিজ্ঞেস করেন, এভাবে বন্ধ করতে পারেন কি না তারা। 

তখন তারা জবাবে বলেন, গকসু প্রশাসনেরই একটি অংশ, তারা এটি করতে পারেন। এ সময় মৌখিক নয়, লিখিত দিতে বললে তারা তা দিতে অস্বীকৃতি জানান। 

কয়েক দফায় গকসুর ক্রীড়া সম্পাদক শীতল ও দপ্তর সম্পাদক শারমিন আক্তারসহ বেশ কয়েকজন গবিসাস সাধারণ সম্পাদককে শারীরিকভাবে আক্রমণের চেষ্টা করেন। 

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গবিসাস সদস্যরা গকসুর সভাপতি উপাচার্যের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে ভিপি নিজেই তাকে ফোন করেন। তখন ভিসি জানান, আজকের মতো সবাইকে চলে যেতে। পরবর্তী দিনে তিনি বিষয়টি দেখবেন। এরপর প্রক্টরকে ফোন করলে তিনি এসে রবিবার বিষয়টি নিয়ে বসা হবে বলে জানান। প্রায় দেড় ঘণ্টা পর বিকেল ৪টার দিকে গকসুর প্রতিনিধিরা কক্ষ ত্যাগ করে।

অপকর্মে ভিপির নাম, হুমকিতে গবিসাস
সম্প্রতি গণবিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে গণধর্ষণ ও ব্ল্যাক মেইলের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের চার ছাত্রকে গ্রেপ্তার করে আশুলিয়া থানা পুলিশ। গ্রেপ্তারের মধ্যে একজন গকসুর ভিপি মৃদুল দেওয়ানের ভাই অন্তু দেওয়ান। 

গত সপ্তাহে ধর্ষণের শিকার সেই ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী আশুলিয়া থানা ও গবি প্রশাসনের কাছে দেওয়া অভিযোগে লেখেন, ভিপি মৃদুল দেওয়ান ও তার লোকজন তাকে নিয়মিত হয়রানি করছেন।

এ ঘটনায় গত সোমবার গবিসাসে সংবাদ সম্মেলন করতে আসেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী। তখন ভিপি মৃদুল দেওয়ানের স্ত্রী পরিচয় দেওয়া এক নারীসহ কয়েকজন গবিসাস কার্যালয়ে এসে সেই ভুক্তভোগীকে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করেন। সেদিন গবিসাস কার্যালয়েও ভাঙচুর করা হয়। তবে গকসু ভিপি পরদিন এসে দুঃখপ্রকাশ করেন। বিষয়টি একাধিক গণমাধ্যমে উঠে আসে।

সেদিন থেকেই গুঞ্জন ছিল, গবিসাস কার্যালয়ে পুনরায় হামলার। বৃহস্পতিবার বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস শেষে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাস ত্যাগ করার পর গকসুর নেতারা গবিসাসে এসে কার্যালয় বন্ধ করে দেন। 

তারা দাবি করেন, শিক্ষার্থীদের ম্যান্ডেট নিয়ে তারা গবিসাস কার্যালয়ে বন্ধ করতে এসেছেন।

গকসুর জিএস রায়হান খান বলেন, “গণবিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ শিক্ষার্থীদের ভোটে নির্বাচিত সংসদ। অবশ্যই শিক্ষার্থীদের সুরে সুর মিলিয়ে কথা বলার জন্য গণবিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে যতগুলো ক্লাব, যতগুলো সংগঠন বা সমিতি আছে, তাদের অবশ্যই শিক্ষার্থীবান্ধব হতে হবে। যদি কোনো সংসদ, সংগঠন, সমিতি তাদের রাইট ট্রাক থেকে সরে যায় বা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, সেই ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের মননের ওপর শ্রদ্ধা রেখে আমরা সেই সংগঠনকে আপাতত স্থগিত রাখতে পারি।”

তিনি আরো বলেন, “যেহেতু শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়, আমরা শিক্ষার্থীদের সংসদ। আমরা মনে করছি যে, গবিসাস তাদের রাইট ট্রাক থেকে সরে গেছে। সাংবাদিকতা একটি মহৎ পেশা, ওই জায়গাতে গবিসাস আর নেই। এর অনেক কারণ রয়েছে। আমার মনে হয়, এটা নিয়ে রবিবার আমাদের সামনা সামনি বসা উচিত। সাংবাদিক সমিতির সন্মানিত সদস্যরা থাকবেন, আমরাও থাকব।”

অরাজনৈতিক গকসু: গঠনতন্ত্র লঙ্ঘন করে রাজনৈতিক নেতৃত্ব
২০১৮ সালে সবশেষ গকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তারপর টানা সাত বছর নির্বাচন হয়নি। গকসু নির্বাচনের দাবিতে নিয়মিত বিরতিতে প্রায় সাত বছর ধরে টানা সংবাদ প্রকাশ করে এসেছে গবিসাস। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে গকসু নির্বাচন হয়।

নির্বাচন-পরবর্তী গকসুর জিএস রায়হান খান ও এজিএস সামিউল হাসানকে শিবির নেতারা নিজেদের প্যানেলের লোক বলে পোস্ট করেন। পরবর্তীতে এই দুই নেতা শিবিরের একাধিক কর্মসূচিতে যোগ দেন। এসব ঘটনায় সংবাদ প্রকাশ করলে এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা।

এছাড়া সম্প্রতি ভিপি মৃদুল দেওয়ান বিএনপি চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেখা করে ছাত্রদলে যোগ দিলে এ নিয়েও সংবাদ প্রকাশ করে গবিসাস। ওই ঘটনায় জিএস, এজিএস প্রতিবাদ জানিয়ে গকসুর প্যাডে বিবৃতি দিলে ‘রাজনীতি নিষিদ্ধ গকসু: ছাত্রদলে যোগ দেওয়া ভিপির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা চান শিবির সমর্থিত জিএস-এজিএস’ শিরোনামে প্রতিবেদন হয়। সেই প্রতিবেদনের জেরে গকসুর ভিপি, জিএস, এজিএসের রোষানলে পড়েন গবিসাস সদস্যরা।

গকসুর গঠনতন্ত্রের ১৭.১ (খ) ধারা অনুযায়ী, কোনো রাজনৈতিক সংগঠনে যোগ দিলে অথবা ওই সংগঠনের কোনো পদে নির্বাচিত বা মনোনীত হলে তার সদস্যপদ বাতিল হবে। ১১ ধারায় বলা হয়েছে, দলীয় রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছাত্র গণবিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের নির্বাহী কমিটির যেকোনো পদে নির্বাচনের অযোগ্য হবেন। আর গঠনতন্ত্রের ১ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, গকসু একটি অরাজনৈতিক ছাত্র সংসদ, যা কোনো দলীয় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত হবে না।

তবে এসব ঘটনায় গণবিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

গকসু নির্বাচনে ভোট ছিল ৪ হাজার ৭৬১ জনের। এর মধ্যে প্রায় এক সপ্তমাংশেরও কম ছয় শতাধিক ভোট পেয়ে ভিপি হন মৃদুল দেওয়ান। আর এক চতুর্থাংশের কম এগারোশ ভোট পেয়ে জিএস হন রায়হান খান।

এমন কাজের এখতিয়ার নেই গকসুর: ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য
গবিসাস বন্ধ করার বৈধতা গকসুর আছে কি না, এমন প্রশ্নে গণবিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, এ ধরনের কোনো এখতিয়ার তাদের নেই।

তবে ক্যাম্পাসে না থাকায় বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করেননি গণবিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আবুল হোসেন। তিনি বলেন, এ বিষয়ে তিনি জেনেছেন। ক্যাম্পাসে না থাকায় কোনো বিষয়ে মন্তব্য করবেন না বলে জানান তিনি।

গবিসাসের বক্তব্য

এদিকে সাংবাদিক সমিতি বন্ধের ঘটনাকে গণমাধ্যমের ওপর হামলা হিসেবে বর্ণনা করে বিচারহীনতার কারণেই ক্যাম্পাসে অস্থিতিশীলতার সৃষ্টি হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন গণবিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক তাহমিদ হাসান। 

তিনি বলেন, “গণবিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্নদ্রষ্টা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর তৈরি করা নিয়ম অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের স্বার্থে গবিসাস কাজ করে। সম্প্রতি বিভিন্ন নিউজের পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্ট হুমকির পর আজ অবৈধভাবে নিজেদের প্রশাসনের অংশ দাবি করে গবিসাস বন্ধের নির্দেশ দেন গকসু প্রতিনিধিরা। এটি গণমাধ্যমের ওপরও এক ধরনের হুমকি। ছাত্র প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতে গকসুর দাবিতে আমরা প্রতিবেদন করেছি। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের এমন আচরণ দুঃখজনক। ভাঙচুর এবং এমন বাকস্বাধীনতাবিরোধীদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানাই।”

২০১৩ সালে দেশের প্রথম বেসরকারি বিশ্বিবদ্যালয়ে সাংবাদিক সংগঠন হিসেবে যাত্রা শুরু করে গবিসাস।

ঢাকা/সাব্বির/রাসেল

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়