ফেনীতে ভুল অস্ত্রোপচারে প্রসূতির মৃত্যু, ক্লিনিক সিলগালা
ফেনী প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম
ফেনী শহরের ‘ওয়ান স্টোপস মেটারনিটি ক্লিনিক’ সিলগালা করেছে ফেনীর স্বাস্থ্য বিভাগ।
ফেনীতে চিকিৎসকের ভুল অস্ত্রোপচারে নাঈমা আক্তার লিজা (২১) নামে এক প্রসূতির মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। শনিবার (১১ এপ্রিল) সংকটাপন্ন অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় ফেনী শহরের ‘ওয়ান স্টোপস মেটারনিটি ক্লিনিক’ সিলগালা করেছে ফেনীর স্বাস্থ্য বিভাগ।
শুক্রবার (১০ এপ্রিল) রাত ১০টার দিকে ফেনী শহরের শহীদ শহিদুল্লাহ কায়সার সড়কের ওই ক্লিনিকে লিজার সিজার অপারেশন করেন ডা. নাসরীন আক্তার মুক্তা। অপারেশনের পরপরই তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ শুরু হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যু হয়।
নিহত লিজা ফেনী সদর উপজেলার ফাজিলপুর ইউনিয়নের সৌদি প্রবাসী মুজিবুল হকের স্ত্রী।
স্বজনদের অভিযোগ, প্রসবব্যথা শুরু হলে প্রথমে লিজাকে লস্করহাটের একটি প্রাইভেট ক্লিনিকে নেওয়া হয়। সেখানকার এক নার্সের মাধ্যমে তাকে ওয়ান স্টোপস মেটারনিটি ক্লিনিকে নেওয়া হয়। সেখানে নেওয়ার পরপরই দ্রুত সিজার অপারেশনের জন্য চাপ দেওয়া হয় এবং ২২ হাজার টাকায় চুক্তি করে অপারেশন করা হয়।
স্বজনরা জানান, অপারেশনের পর থেকেই লিজার অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ শুরু হলেও ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ তা গুরুত্ব দেয়নি। একাধিকবার জানানো হলেও বিষয়টি স্বাভাবিক বলে এড়িয়ে যাওয়া হয়। পরদিন তাকে কয়েক দফা রক্ত দেওয়া হলেও অবস্থার উন্নতি হয়নি। পরে স্বজনদের চাপে তাকে ফেনীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানকার চিকিৎসক দ্রুত চট্টগ্রামে নেওয়ার পরামর্শ দেন।
নিহতের খালা আক্তার বানু অভিযোগ করেন, ‘‘ভুল চিকিৎসা ও গাফেলতির কারণে আমার ভাগনির মৃত্যু হয়েছে। অপারেশনের পর থেকে তার রক্তক্ষরণ হচ্ছিল, কিন্তু চিকিৎসকরা কার্যকর ব্যবস্থা নেননি। এমনকি অবস্থার অবনতি হলে অনেক চিকিৎসক-নার্স ক্লিনিক ছেড়ে চলে যান।’’
নিহতের খালাতো ভাই এমরান হোসেন বলেন, ‘‘এটি কোনো হাসপাতাল নয়, এটি মানুষের জীবন নিয়ে ব্যবসা। আমাদের ধারণা অপারেশনের সময় তার জরায়ু বা কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার ফলে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়েছে।’’
অভিযোগ রয়েছে, ক্লিনিকটিতে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও মানসম্মত চিকিৎসা ব্যবস্থা না থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে সিজারসহ বিভিন্ন অপারেশন করা হচ্ছিল। দালালের মাধ্যমে রোগী এনে মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে চিকিৎসা দেওয়া হতো বলেও অভিযোগ স্বজনদের।
ফেনী জেলা প্রাইভেট হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবদুল হাই হুমায়ুন বলেন, এ ধরনের ঘটনা খুবই দুঃখজনক। তাদের জন্য প্রকৃতপক্ষ যারা হাসপাতাল ব্যবসায় জড়িত, তাদের বদনাম হয়। ঘটনা জানতে পেরে হাসপাতালটির মালিককে কয়েকবার কল করা হলেও তাদের সাড়া পায়নি। আমরা চাই, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।’’
ফেনী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি গাজী মুহাম্মদ ফৌজুল আজিম বলেন, ‘‘প্রসূতির মৃত্যুর খবর পেয়ে আমরা ওই ক্লিনিক পরিদর্শন করেছি। এখন পর্যন্ত আমরা কোনো অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সতর্ক রয়েছে।’’
জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মজিবুর রহমান বলেন, অনৈতিক ও বেআইনিভাবে তারা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। যার কারণে ফেনী সিভিল সার্জনের উপস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানটি সিলগাল করা হয়েছে। ভবিষ্যতে আইন অমান্য করে প্রতিষ্ঠানটি চালু করার চেষ্টা করলে আরো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে ফেনীর সিভিল সার্জন ডা. রুবাইয়াত বিন করিম বলেন, ঘটনাটি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে অব্যবস্থাপনা ও গাফেলতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রমাণ মিললে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি জানান, ক্লিনিকটি আগেও সিলগালা করা হয়েছিল এবং শর্তসাপেক্ষে পুনরায় চালুর অনুমতি পেয়েছিল।
ঢাকা/সাহাব/বকুল
কুষ্টিয়ায় আস্তানায় হামলা-আগুন, কথিত পীর নিহত