রাজনীতির কারণে গানে কোনো কমতি হচ্ছে না: মনির খান
আমিনুল ইসলাম শান্ত || রাইজিংবিডি.কম
বর্ণাঢ্য সংগীত জীবনে অসংখ্য শ্রোতাপ্রিয় গান উপহার দিয়েছেন মনির খান। নব্বই দশকে অডিও ক্যাসেটের যুগে শ্রোতাদের কাছে আবেগে রূপ নেন তিনি। পরবর্তীতে প্লেব্যাকে এসে নিজেকে উজার করে দেন এই শিল্পী। সংগীত, রাজনীতি ও ঈদস্মৃতি নিয়ে রাইজিংবিডির ঈদ আয়োজনে কথা বলেছেন মনির খান। কথোপকথনে ছিলেন আমিনুল ইসলাম শান্ত।
রাইজিংবিডি: জীবন থেমে নেই, সময় বয়ে চলে। শৈশব আর এ সময়ে ঈদের পার্থক্য কী বলে মনে করেন?
মনির খান: ছোটবেলায় ঈদে সালামি পেতাম এখন দিতে হয়— এটুকুই বড় পার্থক্য। তখন বাবা-চাচা, বড় ভাইয়ের আঙুল ধরে ঈদের মাঠে যেতাম। এখন আমার বাচ্চারা, ভাইয়ের ছেলে-মেয়েরা আমাদের আঙুল ধরে যায়। এই পরিবর্তন বয়সের সঙ্গে সঙ্গে হয়েছে, এটা সবার জীবনেই হয়। এখন ঈদের আনন্দ দায়িত্ববোধে পরিণত হয়েছে। মাংসের দাম বেড়েছে, যারা কিনে খেতে পারেন না, তারা এই ঈদের অপেক্ষা করেন; প্রত্যাশা করেন। মূলত, উদ্দেশ্যটা তাদের ঘিরেই।
রাইজিংবিডি: হাটে গিয়ে কোরবানির পশু কেনার অভিজ্ঞতা আছে কিনা?
মনির খান: হাট-বাজারে গিয়ে কোরবানির পশু কেনার অভিজ্ঞতা আমার খুব একটা নেই। যখন গ্রামে ছিলাম, তখন গ্রামে যারা বিক্রির উদ্দেশ্যে গরু-ছাগল পুষতেন, তাদের কাছ থেকেই কিনে রাখা হতো। ঈদের আগের দিন বাড়িতে পৌঁছে দিতেন। এখন ঢাকাতে থাকার কারণে খামার থেকে অনলাইনে কেনা হয়। এ কাজটি করে আমার ছেলে। যদিও ও বয়সে ছোট কিন্তু কাজটি করে খুব মজা পায়।
রাইজিংবিডি: আপনার প্রথম অ্যালবাম ‘তোমার কোনো দোষ নেই’ ১৯৯৬ সালে ঈদে মুক্তি পেয়েছিল। মুক্তির পর দারুণ সাড়া ফেলে! সেই আনন্দঘন দিনের কথা জানতে চাই।
মনির খান: ১৯৯৬ সালের ২৬ নভেম্বর, বিউটি কর্নারের ব্যানারে অ্যালবামটি প্রকাশিত হয়। নিজের অবস্থান থেকে চর্চা করা, গানগুলো শেখা। এই অ্যালবাম করার ক্ষেত্রে মিল্টন ভাই আমার জন্য যে দায়িত্ব পালন করেছেন, তা বর্ণনাতীত। আমি একেবারেই নতুন ছিলাম। নতুন অবস্থায় সবকিছু অগোছালো, না জানা, অচেনা, না বোঝা একটি ছেলেকে দীর্ঘ সময় নিয়ে ধৈর্যসহকারে আমাকে গড়ে একটি অ্যালবাম করার ক্ষেত্রে তিনি বড় ভূমিকা রেখেছিলেন। প্রায় চার বছরের পরিশ্রমের ফসল—‘তোমার কোনো দোষ নেই’। অ্যালবামটি বাজারে আসার পর প্রায়ই দোকানে দোকানে গিয়ে খবর নিতাম কেমন হয়েছে, তখন আমাকে কেউ চিনতো না। ক্যাসেটের কাভার দেখলে হয়তো মেলাতে পারতেন একই ব্যক্তি। দোকানে আমার পোস্টার দেখতাম, ভালো লাগত। ধীরে ধীরে আমার গান মানুষের কাছে ভালো লাগতে শুরু করল। বিভিন্ন জায়গায় গান বাজছে শুনতাম। এই অনুভূত সত্যি অন্যরকম! সেই ভালোলাগা এখনো কমেনি।
রাইজিংবিডি: আপনি চার শতাধিক চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক করেছেন। বর্তমান সময়ে চলচ্চিত্রের গানকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
মনির খান: বর্তমানে চলচ্চিত্রের গানগুলো ভালো হচ্ছে। এখন চলচ্চিত্রের যে গল্প, চিত্রনাট্য, যে চাহিদা, সেই অনুপাতে যেটা হচ্ছে, সেটাই দরকার। গত দিনে যেটা হয়ে গেছে, সেটা দরকার ছিল।
রাইজিংবিডি: আপনি রাজনীতিতে অধিক সময় ব্যয় করছেন—
মনির খান: আপনি কি আমাকে রাজনীতির কোনো মঞ্চে দেখেছেন?
রাইজিংবিডি: জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আপনাকে রাজনীতির মাঠে দেখেছি।
মনির খান: নির্বাচনের সময় সবাই দায়িত্ব পালন করেছেন। একটা রাষ্ট্রীয় নির্বাচন, জাতীয় নির্বাচন, এ নির্বাচনে আপনার আমার সকলের দায়িত্ব থাকে। সাংবাদিক হিসেবে আপনিও দায়িত্ব পালন করেছেন। যে যেখান থেকে পেরেছেন, সবাই সবার জায়গা থেকে দায়িত্ব পালন করেছেন। কারণ দীর্ঘদিন দেশ অশান্ত ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার ছিল, এভাবে তো দেশ চলতে পারে না। জনগণের রায়ে একটি রাষ্ট্র পরিচালিত হবে, এই আশা আপনি আমি সবাই করেছি। সেই নির্বাচন পরিচালনার জন্য যে যেখান থেকে পেরেছি, সবাই ভূমিকা রেখেছি। কেউ খাতা-কলমে দায়িত্ব পেয়েছেন, অনেকে নিজের দায়িত্ব বোধ থেকে করেছেন। আমি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছাত্রদল থেকে করেছি। জাসাস-এর জেনারেল সেক্রেটারি ছিলাম ৭ বছর। এখন তো বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে আছি, অস্বীকার করার কিছু নেই; সবাই জানেন।
রাইজিংবিডি: একদিকে রাজনীতি, অন্যদিকে গান—দুটো বিষয় কীভাবে সমন্বয় করছেন?
মনির খান: গানের কাজ নিয়মিতই চলছে। রাজনীতির কারণে গানে কোনো কমতি হচ্ছে না। একটা করে গান, বললাম না—এখন চাপ কমে গেছে, তবে সম্পৃক্ততা বেড়েছে। একটা করে গান তো সমস্যা হয় না। আমার দুইটা ইউটিউব চ্যানেলে প্রতিনিয়ত গান যাচ্ছে। নিয়মিত এসব গান তৈরি করছি। রেকর্ডিং করছি, মাস্টারিং করছি, শুটিং করছি—সবকিছু নিয়মমাফিক যেভাবে চলছিল, সেভাবেই চলছে।
রাইজিংবিডি: বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপির একজন কর্মী হিসেবে কেমন বাংলাদেশ দেখতে চান?
মনির খান: সবারই সুন্দর একটি বাংলাদেশের প্রত্যাশা, আমারও তাই। দীর্ঘ দিনের আবর্জনা পরিষ্কার করে সুস্থ পরিবেশে আসতে সময় লাগবে। আমাদের পিএম জনাব তারেক রহমানকে একটি প্রশ্ন করতে শুনেছিলাম। তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল—‘আমাদের বাংলাদেশ কবে নাগাদ ঠিক হবে?’ জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার এই শরীরে ঠান্ডা-জ্বর হয়েছে, ডক্টরের কাছে গিয়েছিলাম, ডক্টর ৭ দিনের এন্টিবায়োটিক দিয়েছেন। আমার এইটুকু শরীর সুস্থ হতে যদি ৭ দিন লাগে, এত বড় বাংলাদেশের একটা শরীর ঠিক হতে কত দিন লাগতে পারে, আপনারাই বলেন!
আমরা গল্প-কথায়, স্বপ্ন দ্রুত দেখে ফেলি। আমি আপনি এখানে বসে আমেরিকার স্বপ্ন দেখতে পারি, কিন্তু বাস্তবে প্রতিফলন ঘটানো সহজ ব্যাপার নয়। কারণ সবাই আপনাকে সহযোগিতা করছে না। সবকিছু মোকাবিলা করে সন্তুষ্টিমূলক একটা জায়গায় আসা খুব সহজ নয়। আমাদের পিএম যথেষ্ট সচেষ্ট, যথেষ্ট চেষ্টা করছেন। বাংলাদেশে ইতিপূর্বে যা ঘটে গেছে, যেগুলো মানুষের কল্যাণকর হয় নাই, সামাজিকভাবে করা যে কর্মকাণ্ডগুলো মানুষের পছন্দ হয় নাই, মানুষ এর চেয়ে ভালো কিছু চেয়েছিল, সেই জায়গা থেকে মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি, স্বাধীনভাবে চলাফেরা—সবকিছুতে সুস্থ-সুন্দর জীবনযাপন, সুন্দর বাংলাদেশ তৈরির আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে আমার-আপনার সবাইকে সহযোগিতা করতে হবে।
ঢাকা/তারা//
জিয়াউর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকী আজ