জিয়াউর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকী আজ
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান
আজ ৩০ মে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী। ১৯৮১ সালের এই দিনে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে একদল বিপথগামী সেনা সদস্যের হাতে নিহত হন তিনি। মাত্র ৪৫ বছর বয়সে তার জীবনাবসান হলেও কর্মময় জীবন, রাষ্ট্রনায়কোচিত নেতৃত্ব ও দেশগঠনের নানা উদ্যোগের মধ্যে দিয়ে তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে স্থায়ী স্থান করে নিয়েছেন।
জিয়াউর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপি দেশব্যাপী আট দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে— কালো পতাকা উত্তোলন, দোয়া মাহফিল, আলোচনা সভা, আলোকচিত্র প্রদর্শনী, দুস্থদের মাঝে খাদ্য ও বস্ত্র বিতরণ প্রভৃতি। দলটির নেতাকর্মীরা দিনটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করবেন বলে জানিয়েছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকের মতে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জিয়াউর রহমান একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের নাম। সততা, কর্মনিষ্ঠা, দেশপ্রেম, দূরদর্শিতা এবং দৃঢ় নেতৃত্বের গুণাবলি তাকে সাধারণ মানুষের কাছে বিশেষভাবে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিল। তিনি গণমানুষের আস্থা অর্জন করেছিলেন।
১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়িতে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন জিয়াউর রহমান। তার বাবা মনসুর রহমান ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা। শৈশবের কিছু সময় গ্রামে কাটলেও পরবর্তী সময়ে বাবার চাকরির সূত্রে কলকাতা এবং দেশ বিভাগের পর করাচিতে চলে যান তিনি। শিক্ষাজীবন শেষে ১৯৫৩ সালে পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমি কাকুলে অফিসার ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেন এবং ১৯৫৫ সালে কমিশনপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে সেনাবাহিনীতে কর্মজীবন শুরু করেন।
সামরিক জীবনে তিনি দক্ষতা, শৃঙ্খলা ও সাহসিকতার পরিচয় দেন। ১৯৬৫ সালের পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধে খেমকারান সেক্টরে একটি কোম্পানির অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে বিশেষ কৃতিত্ব অর্জন করেন। তার নেতৃত্বাধীন ইউনিট ওই যুদ্ধে উল্লেখযোগ্য সাফল্য লাভ করে।
তবে, জিয়াউর রহমানের নাম সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয় ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে। পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা শুরু হলে তিনি বিদ্রোহ ঘোষণা করে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করে তিনি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধের সময় পর্যায়ক্রমে ১ এবং ১১ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত হন।
স্বাধীনতার পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নাটকীয় পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে জিয়াউর রহমানের উত্থান ঘটে। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এক বিশেষ পরিস্থিতিতে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেই সময় দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে বিরাজমান অস্থিরতা কাটিয়ে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেন তিনি।
রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে তিনি জাতীয় জীবনে নতুন দিকনির্দেশনা দেওয়ার চেষ্টা করেন। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করেন। কৃষি, শিল্প, উৎপাদন ও গ্রামীণ উন্নয়নকে গুরুত্ব দিয়ে তিনি আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গড়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তার উদ্যোগে খাল খনন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নতুন গতি সঞ্চার হয়।
রাজনীতিতে তিনি জাতীয়তাবাদের স্বতন্ত্র ধারা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। তার প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বিভিন্ন মত ও আদর্শের মানুষকে একই রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসে। রাজনৈতিক বিভাজনের পরিবর্তে জাতীয় ঐক্যের ওপর গুরুত্ব আরোপ ছিল তার অন্যতম রাজনৈতিক দর্শন। একইসঙ্গে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং নাগরিক অধিকারের প্রসারে তার ভূমিকার কথা বিএনপি নেতারা বিশেষভাবে উল্লেখ করে থাকেন।
মাত্র সাড়ে পাঁচ বছরের রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। দলীয় নেতাকর্মীদের মতে, ব্যক্তিগত সততা, কর্মনিষ্ঠা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় দৃঢ়তার কারণে তিনি সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করেছিলেন। দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা, উৎপাদনমুখী কর্মসূচি এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের মর্যাদা বৃদ্ধিতে তার অবদান স্মরণীয় হয়ে রয়েছে।
জিয়াউর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে দেওয়া এক বাণীতে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, “শহীদ জিয়ার আদর্শ, দেশপ্রেম, সততা ও কর্মনিষ্ঠা আজও জাতীয়তাবাদী শক্তির অনুপ্রেরণার উৎস। জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা এবং অর্থনৈতিক ভিত্তি সুদৃঢ় করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।”
চার দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশের রাজনীতি, রাষ্ট্রচিন্তা ও জাতীয়তাবাদী দর্শনের আলোচনায় জিয়াউর রহমান একটি প্রাসঙ্গিক নাম। তার শাহাদাতবার্ষিকীতে বিএনপি এবং তার অনুসারীরা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছেন সেই রাষ্ট্রনায়ককে, যিনি স্বল্পায়ু জীবনেও বাংলাদেশের ইতিহাসে রেখে গেছেন এক অনন্য ছাপ।
ঢাকা/নজরুল/রফিক
জিয়াউর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকী আজ