ঢাকা     সোমবার   ২৭ এপ্রিল ২০২৬ ||  বৈশাখ ১৪ ১৪৩৩ || ৯ জিলকদ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

তদন্তে মিলেছে অবহেলার প্রমাণ, প্রতিবেদনে উঠে এসেছে লিজার মৃত্যুর কারণ

মো. সাহাব উদ্দিন, ফেনী || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৮:৫৫, ২৭ এপ্রিল ২০২৬   আপডেট: ০৯:০৪, ২৭ এপ্রিল ২০২৬
তদন্তে মিলেছে অবহেলার প্রমাণ, প্রতিবেদনে উঠে এসেছে লিজার মৃত্যুর কারণ

মারা যাওয়া নাঈমা আক্তার লিজা।

ফেনীর ‘ওয়ান স্টপস মেটারনিটি ক্লিনিকে’ ভুল অস্ত্রোপচারের অভিযোগে এক প্রসূতির মৃত্যুর ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের একাধিক অবহেলা ও চিকিৎসাগত ত্রুটির প্রমাণ পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে প্রতিবেদনে প্রসূতির মৃত্যুর নির্দিষ্ট কারণও উঠে এসেছে। গাফিলতির প্রমাণ মিললেও তদন্ত কমিটির পক্ষ থেকে সরাসরি শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সুপারিশ করা হয়নি।

জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের গঠিত তদন্ত কমিটি তাদের প্রাথমিক ও চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণে ঘটনাটিকে গুরুতর চিকিৎসাগত গাফিলতি হিসেবে চিহ্নিত করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

আরো পড়ুন:

আরো পড়ুন: ভুল অস্ত্রোপচারে প্রসূতির মৃত্যু: তদন্তে নেমেছে দুই কমিটি

তদন্তে দেখা গেছে, অস্ত্রোপচারের সময় নির্ধারিত চিকিৎসা প্রটোকল অনুসরণ করা হয়নি এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও পরবর্তী চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি ছিল। অস্ত্রোপচারের পর রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলেও সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

তদন্তে আরো উঠে আসে, ছনুয়া ও মোটবী ইউনিয়নের দুই পরিবার পরিকল্পনা কর্মী- গীতা রানী দাসসহ অপর একজন রোগীকে সরকারি হাসপাতালে না পাঠিয়ে সরাসরি ওই ক্লিনিকে নিয়ে আসেন, যা তাদের দায়িত্বের পরিপন্থি। তাদের বিরুদ্ধে রোগীদের আল্ট্রাসাউন্ড ও অ্যান্টিবায়োটিক পরামর্শ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

তদন্ত কমিটির প্রধান ফেনী জেনারেল হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটেন্ট (অ্যানেস্থিসিয়া) ডা. মো. আবদুল্যাহ আব্বাসী বলেন, “অভিযুক্ত গাইনী চিকিৎসক নাসরীন আক্তার মুক্তার গাফিলতির কারণেই প্রসূতি সংকটাপন্ন অবস্থায় পড়েন। তিনি যথাসময়ে রোগীকে ফলোআপ করলে হয়তো তাকে বাঁচানো যেত।”

আরো পড়ুন: ফেনীতে ভুল অস্ত্রোপচারে প্রসূতির মৃত্যু, ক্লিনিক সিলগালা

প্রসূতির মৃত্যুর কারণ হিসেবে তদন্ত কমিটির প্রধান বলেন, “সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের পর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ অর্থাৎ পোস্টপার্টাম হেমোরেজ হয়েই তার মৃত্যু হয়েছে। অস্ত্রোপচারের পর রক্তক্ষরণ শুরু হলে নার্সরা চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্ব দেননি। এতে রোগীর অবস্থা দ্রুত অবনতি ঘটে।”

তিনি আরো বলেন, “ক্লিনিকটিতে প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্তই চিকিৎসক উপস্থিত থাকতেন; বাকি সময় প্রতিষ্ঠানটি চালাতেন সেকমোরা (সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার)। চিকিৎসকের অনুপস্থিতিতে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় এটি বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে।”

“এছাড়া, রোগীর শারীরিক জটিলতা দেখা দেওয়ার পর তাকে অন্য ক্লিনিকে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও তা ছিল বিলম্বিত, যা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তোলে। একই সঙ্গে ক্লিনিকটির লাইসেন্স, অপারেশন থিয়েটারের মান এবং চিকিৎসা সরঞ্জামের যথাযথতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে”, যোগ করেন তিনি।

শাস্তির সুপারিশ প্রসঙ্গে তদন্ত কমিটির প্রধান ডা. মো. আবদুল্যাহ আব্বাসী বলেন, “আমরা সরাসরি শাস্তির সুপারিশ করিনি; বরং পুরো ব্যবস্থার সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছি। বিশেষ করে মাঠপর্যায়ে দালালের মাধ্যমে রোগী আনা, পরিবার পরিকল্পনা কর্মীদের অনিয়ন্ত্রিত চিকিৎসা পরামর্শ এসব বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে প্রতিবেদনে।”

ফেনীর সিভিল সার্জন ডা. রুবাইয়াত বিন করিম বলেন, “তদন্ত প্রতিবেদনে গাফিলতি ও অব্যবস্থাপনার প্রমাণ পাওয়া গেছে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে শাস্তির সুপারিশসহ প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।”

জেলা প্রশাসনের গঠিত পৃথক তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন এখনো জমা পড়েনি বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) এ.কে.এম. ফয়সাল। তিনি বলেন, “শুনানি শেষ হয়েছে, শিগগিরই প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।”

গত ১১ এপ্রিল ‘ওয়ান স্টপস মেটারনিটি ক্লিনিকে’ সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের পর গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন নাঈমা আক্তার লিজা। তাকে ফেনীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখান থেকে চট্টগ্রামে রেফার্ড করা হয়। পথে তিনি মারা যান।

ঢাকা/মাসুদ

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়