ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ০৭ মে ২০২৬ ||  বৈশাখ ২৪ ১৪৩৩ || ১৯ জিলকদ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

জ্বালানি সংকটে বাড়ছে সৌর সেচ পাম্পের চাহিদা, সাশ্রয় সাড়ে ৫ কোটি টাকা

মঈনুদ্দীন তালুকদার হিমেল, ঠাকুরগাঁও  || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৯:৫৬, ৭ মে ২০২৬   আপডেট: ০৯:৫৯, ৭ মে ২০২৬
জ্বালানি সংকটে বাড়ছে সৌর সেচ পাম্পের চাহিদা, সাশ্রয় সাড়ে ৫ কোটি টাকা

ঠাকুরগাঁও রায়পুর ইউনিয়নে সোলেমান আলির তৈরি সোলার প্যানেলের মাধ্যমে চলছে জমিতে সেচ কার্যক্রম।

জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়ছে কৃষিতে। তেলের দাম ও সংকটের কারণে ঠাকুরগাঁওয়ের কৃষকরা এখন ঝুঁকছেন বিকল্প শক্তির দিকে। সৌরচালিত সেচ পাম্প হয়ে উঠছে তাদের ভরসা। ফলে খরচ কমায় চলতি বোরো মৌসুমেই সাড়ে ৫ কোটি টাকার জ্বালানি তেল ও বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে এমনটি মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। 

ঠাকুরগাঁওয়ের বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন সৌর প্যানেলে চলছে সেচ কার্যক্রম। ডিজেলের বাড়তি দামে দিশেহারা কৃষকরা এখন খুঁজে পেয়েছেন সাশ্রয়ী সমাধান। এবার জেলায় ৬২ হাজার ২৮৫ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হচ্ছে। এর মধ্যে ২৯১টি সোলার পাম্প দিয়ে সেচ দেওয়া হচ্ছে ২ হাজার ৫ হেক্টর জমিতে।

আরো পড়ুন:

এই প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন ৩৫ হাজার কৃষক। ফলে এক মৌসুমেই সাশ্রয় হচ্ছে সাড়ে ৪ লাখ লিটার ডিজেল ও বিদ্যুৎ। যার আর্থিক মূল্য প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকা। এতে শুধু অর্থনৈতিক সুবিধাই নয়, কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে পরিবেশ সুরক্ষায়ও রাখছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। টেকসই কৃষির পথে এগিয়ে যাচ্ছে এই উদ্যোগ বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

সদর উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নের মোলানী গ্রামের মো. সলেমান আলী। সোলার সেচ পাম্প তৈরি করে এলাকায় সারা ফেলার পাশাপাশি অর্জন করেছেন সুনাম। তিনি ১৯৯৬ সাল থেকে শুরু করেন সোলার নিয়ে কাজ। দীর্ঘ কয়েক বছরের পরিশ্রম ও চেষ্টার ফলে ২০১৪ সালে তৈরি করেন ব্যাটারিবিহীন সোলার সেচ পাম্প। ২০১৫ সাল থেকে সোলার দিয়ে তিনি স্থানীয় কৃষকদের সেচ সুবিধা প্রদান করে আসছেন। 

সোলেমান আলি জানান, শুধু তার তৈরি করা ২৬টি সোলার সেচ পাম্প দিয়ে ৩০০ হেক্টর জমিতে সেচ দিচ্ছেন কৃষকরা। প্রায় ৫০০ কৃষক তার কাছে সেচ সেবা নিচ্ছেন প্রায় অর্ধেক মূল্যে। ফলে তিনি নিজেও আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন, কৃষকরাও স্বল্প মূল্যে জমি সেচ দিতে পেরে উপকৃত হচ্ছেন।

কৃষকরা বলছেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও মিলছে না তেল। এতে চাষাবাদে বাড়ছে খরচ ও ভোগান্তি। তাদের ভাষায়, ডিজেলচালিত সেচে এক বিঘা জমিতে খরচ হয় ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা, অন্যদিকে সৌর পাম্পে খরচ নেমে এসেছে মাত্র আড়াই থেকে ৩ হাজার টাকায়। খরচ কম, লাভ বেশি এবং কম পরিশ্রমে ফসলও ভালো হচ্ছে। তাই সহজ শর্তে ও স্বল্প মূল্যে সৌর পাম্প সরবরাহে সরকারকে অনুরোধ জানান তারা। 

ঠাকুরগাঁও ভেলাজান এলাকার কৃষক আব্দুস সোবহান বলেন, “আমি তিন বিঘা জমিতে বোরো আবাদ করেছি। বোরো ধানে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ বার পানি সেচ দিতে হয়। সেচের জন্যে আমি আগে বিদ্যুৎ চালিত পাম্পের ওপর নির্ভরশীল ছিলাম। এবার ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে সমস্যা হচ্ছিল। পরে সোলেমান ভাইয়ের সৌর পাম্পের সাহায্যে সেচ দেওয়া শুরু করি। আমার খরচ ও ভোগান্তি কমেছে।” 

একই এলাকার সাদেকুল ইসলাম বলেন, “ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাম্পে লাইনে দাড়িয়েও যথেষ্ট ডিজেল পাওয়া যাচ্ছিলো না। সোলার পাম্প আমার সেই সমস্যার সমাধান এনে দিয়েছে।”

বালিয়াডাঙ্গী এলাকার কৃষক জাহিদ মিলু বলেন, “আমি প্রতিবছর ১৫ বিঘা জমিতে বোরো আবাদ করি। শুধু নিজের জমিতে সেচ দেয়ার জন্যে এবার সোলার সিস্টেমের ব্যবস্থা করেছি। আমার ভোগান্তি ও খরচ বেশ কমেছে।”

জ্বালানি সংকটের প্রভাবে ঢাকাসহ দূর-দূরান্ত থেকেও অনেকে ছুটে আসছেন এই প্রযুক্তি নিতে। তাদের মতে, দেশজুড়ে এই উদ্ভাবন ছড়িয়ে দেওয়া গেলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে সরকারের ব্যয় কমবে, কমবে নির্ভরশীলতাও। কৃষিতে ঘটতে পারে এক নতুন বিপ্লব।

মুন্সিগঞ্জ থেকে আসা আবেদুল ইসলাম বলেন, “আমি নিজের জমির পাশাপাশি আশপাশের কৃষকদের এই সোলার প্রকল্পের আওতায় আনতে চাই। তাই এখানে সোলার ব্যবস্থার মাধ্যমে সেচ প্রকল্প দেখতে এসেছি। ফিরে গিয়ে নিজেই সোলার সিস্টেম চালু করব।”

ঠাকুরগাঁও জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মাজেদুল ইসলাম বলেন, “জ্বালানি সংকটের এই সময়ে সৌর শক্তি নির্ভর সেচ পাম্প হয়ে উঠেছে কৃষকদের আশার আলো। খরচ কমিয়ে, উৎপাদন বাড়িয়ে এটি বদলে দিচ্ছে কৃষির ভবিষ্যৎ। সৌর সেচ পাম্প ব্যবহারে কৃষকরা ইতোমধ্যে লাভবান হচ্ছেন। এই প্রযুক্তি সম্প্রসারণে কাজ করছে কৃষি বিভাগ।”

ঢাকা/মাসুদ

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়