ঢাকা     শনিবার   ২৩ মে ২০২৬ ||  জ্যৈষ্ঠ ৯ ১৪৩৩ || ৬ জিলহজ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

নরসিংদীতে সালিশে ধর্ষণের বিচার, তরুণীর আত্মহত্যার চেষ্টা

নরসিংদী প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১১:৪২, ২৩ মে ২০২৬   আপডেট: ১১:৪৮, ২৩ মে ২০২৬
নরসিংদীতে সালিশে ধর্ষণের বিচার, তরুণীর আত্মহত্যার চেষ্টা

নরসিংদীর সদর উপজেলায় ধর্ষণের অভিযোগে স্থানীয় সালিশ বৈঠকে বিয়ের পরিবর্তে টাকার বিনিময়ে মীমাংসার প্রস্তাব ওঠায় ক্ষোভে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন এক তরুণী (১৮)। অভিযোগ উঠেছে, বৈঠকে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের পাশাপাশি একজন পুলিশ সদস্যও উপস্থিত ছিলেন। 

শুক্রবার (২২ মে) বিকেলে সদর উপজেলার চিনিশপুর ইউনিয়নের সোনাতলা চকপাড়া এলাকায় ঘটনাটি ঘটে। 

আরো পড়ুন:

বর্তমানে ভুক্তভোগী রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) চিকিৎসাধীন।

ভুক্তভোগীর পরিবারের অভিযোগ, নরসিংদীর পাশের শিবপুর উপজেলায় বিয়ে হয়েছিল ওই তরুণীর। বিয়ের পর থেকেই প্রতিবেশী প্রাইভেটকার চালক নাইম তাকে নানাভাবে উত্ত্যক্ত ও বিয়ের প্রলোভন দেখাতে শুরু করেন। একপর্যায়ে তরুণীকে তার স্বামীর সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন করে নিয়ে আসেন নাইম। এরপর বিয়ের আশ্বাস দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তাকে একাধিকবার ধর্ষণ করেন তিনি। 

এলাকাবাসী জানান, ধর্ষণের বিষয়টি নিয়ে শুক্রবার বিকেলে সোনাতলা চকপাড়া এলাকায় সালিশ বৈঠক বসে। সেখানে উপস্থিত ছিলেন- জেলা বিএনপির ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক ও চিনিশপুর ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক আউলাদ হোসেন মোল্লা, জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মাজহারুল হক টিটু, বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক মোয়াজ্জেম হোসেন খোকা, ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আমজাদ হোসেন ও যুবদল নেতা জাহাঙ্গীরসহ স্থানীয় নেতারা। সেখানে এসআই মো. ইউনুস নামে এক পুলিশ সদস্য উপস্থিত ছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, সালিশে উপস্থিত বিএনপি নেতারা ও স্থানীয় মাতব্বররা অভিযুক্তের সঙ্গে ভুক্তভোগীকে বিয়ের সিদ্ধান্ত না দিয়ে, উল্টো ধর্ষণের ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে প্রথমে ২০ হাজার, পরে ৩০ হাজার এবং সর্বশেষ ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে মীমাংসার প্রস্তাব তোলেন। 

টাকার বিনিময়ে ঘটনাটি রফাদফা করার এই চরম অপমান সহ্য করতে না পেরে বৈঠক চলাকালীন নিজ ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয় ওই তরুণী। ঘরের ভেতর ফ্যানের সঙ্গে ওড়না পেঁচিয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন তিনি। বিষয়টি টের পেয়ে পরিবারের সদস্যরা দ্রুত দরজা ভেঙে অচেতন অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে নরসিংদী সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে তাকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং পরবর্তীতে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত নাইম পলাতক রয়েছেন। 

ভুক্তভোগীর মা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “নাইম আমার মেয়ের ভালো সংসারটা ভেঙেছে। এক বছর ধরে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে আমার মেয়ের সর্বনাশ করেছে। আর দরবারে (সালিশে) আমার মেয়ের ইজ্জতের দাম ধরা হলো ৫০ হাজার টাকা। এই অপমান সইতে না পেরেই আমার মেয়ে মরতে গিয়েছিল।” 

তিনি অভিযোগ করেন, এর আগে থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েও তারা কোনো বিচার পাননি।

ধর্ষণের মতো ফৌজদারি অপরাধ সালিশযোগ্য কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে সালিশে উপস্থিত থাকা চিনিশপুর ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক আউলাদ হোসেন মোল্লা বলেন, “উভয় পক্ষের অনুরোধে আমি অল্প সময়ের জন্য সেখানে গিয়েছিলাম। পরে শুনেছি, সালিশ বোর্ডের অধিকাংশ সদস্য বিয়ের পক্ষে মত দিয়েছিলেন। কিন্তু, কেউ একজন টাকা দিয়ে সমাধানের কথা বলায় মেয়েটি আত্মহত্যার চেষ্টা করে।”

চিনিশপুর ইউনিয়নের বিট অফিসার মো. ইসহাক মিয়া জানান, তিনি নিজে সালিশে ছিলেন না, তবে এসআই মো. ইউনুস সেখানে উপস্থিত ছিলেন বলে শুনেছেন। যদিও অভিযুক্ত এসআই ইউনুস সালিশে থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।

হাসপাতাল ও পুলিশ প্রশাসনের বক্তব্য
নরসিংদী সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. খায়রুল ইসলাম জানান, গলায় ফাঁস লাগানো অচেতন অবস্থায় ওই তরুণীকে হাসপাতালে আনা হয়েছিল। তার শ্বাসনালী ক্ষতিগ্রস্ত এবং অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক হওয়ায় প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে দ্রুত ঢাকায় রেফার্ড করা হয়।

ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে নরসিংদী মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) এমআর আল মামুন বলেন, “সালিশে পুলিশের কোনো সদস্য উপস্থিত থাকার তথ্য সঠিক নয়। আমরা এর আগে একটি মৌখিক তথ্য পেয়েছিলাম, তবে কোনো লিখিত অভিযোগ পাইনি।”

ঢাকা/হৃদয়/মাসুদ

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়