ঢাকা, সোমবার, ১ পৌষ ১৪২৬, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

মুক্তিযুদ্ধে মওলানা ভাসানীর অবদান

রফিকুল ইসলাম জসিম : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১১-১৭ ৬:২৮:৫৫ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১১-১৭ ৮:২৬:৩৫ পিএম

মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ৪৩তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ১৯৭৬ সালের এই দিনে রাজধানীর পিজি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন তিনি।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসের দিকে যদি আমরা তাকাই তাহলে দেখতে পাই, বঙ্গবন্ধুর পাশাপাশি যিনি এক অনবদ্য অবদান রেখেছিলেন, তিনি হলেন মওলানা ভাসানী। তিনি ছিলেন এদেশের নির্যাতিত-নিপীড়িত, মেহনতি মানুষের মুক্তির দিশারী। স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য তিনি যে ভূমিকা রেখেছিলেন, তা আলোচনা ও স্মরণ করার মতো একটি উজ্জ্বল ভূমিকা।    

মওলানা ভাসানী ১৮৮০ সালে সিরাজগঞ্জের ধনগড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম হাজী শরাফত আলী খান। মক্তব থেকে শিক্ষাগ্রহণ করে কিছুদিন মক্তবেই শিক্ষকতা করেন। ১৮৯৭ সালে পীর সৈয়দ নাসীরুদ্দীনের সাথে আসাম যান। ইসালামিক শিক্ষার উদ্দেশ্যে ১৯০৭-এ দেওবন্দ যান। দুই বছর সেখানে অধ্যয়ন করে আসামে ফিরে আসেন। ১৯১৭ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস ময়মনসিংহ সফরে গেলে তার ভাষণ শুনে ভাসানী অনুপ্রাণিত হন। ১৯১৯ সালে ব্রিটিশ বিরোধী অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলনে যোগদানের মধ্য দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয়। কৃষক আন্দোলনের নেতা হিসেবে তার রাজনৈতিক জীবনের শুরু। তিনি সবসময় রাজনীতি করেছেন অধিকার বঞ্চিত মানুষের জন্য। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের পরে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। তিনি ৯ মার্চ, ১৯৭১ সালে পল্টনে এই ভাষণ দেন। দুই প্রধান নেতার একই সিদ্ধান্তে চলে আসার একটি উদাহরণ স্থাপিত হয়। তবে এ উদাহরণটি ইতিহাসের পাতায় অনেকটাই অনুপস্থিতই বলা যায়। যদিও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়ে যায় ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পরপরই, তবে যখন প্রধান দুই নেতা একসাথে একই সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে ঐকমত্য প্রকাশ করেন তখন স্বাধীনতার ক্ষেত্রে আর কোনো সন্দেহের অবকাশ থাকে না। ঠিক এমনটিই ঘটেছিল তখন বাঙালির জীবনে।

’৭১ এর জানুয়ারি থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত মওলানা ভাসানী সারাদেশে জনসভা করে জনগণকে সশস্ত্র যুদ্ধের জন্য উদ্বুদ্ধ করেন । যে কোনো আন্দোলনের জন্য তৃণমূল গঠন কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা বোধহয় রাজনীতিতে সক্রিয় নেতাকর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বোঝানোর জন্য আলাদা করে কোনো শব্দপ্রয়োগের প্রয়োজন হবে না।

যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ৪ এপ্রিল পাকসেনারা মওলানা ভাসানীকে হত্যা অথবা গ্রেপ্তারের উদ্দেশ্যে সন্তোষে এসে তাকে খুঁজতে থাকে এবং জিজ্ঞেস করে, ‘কাফের ভাসানী কোথায়?’ তাকে না পেয়ে তার বাড়িঘর আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয় । পাকবাহিনীর দৃষ্টি এড়িয়ে নানা কৌশলে মওলানা ভাসানী পাড়ি জমান ভারতে। সেখানে প্রবেশের পরদিন আনন্দবাজার পত্রিকার কলাম জুড়ে ছাপা হয়, ‘সীমান্তের এপার ভাসানী–সজল চোখে সাহায্য প্রার্থনা’।

সেখানে লেখা হয় ‘বাংলাদেশের জনগণের উপর পাকিস্তানি জঙ্গি ফৌজের নির্যাতন বন্ধের জন্য তিনি করজোড়ে ও সজল চোখে ভারত সরকারের কাছে নৈতিক সমর্থন ও সাহায্য প্রার্থনা করেন।’

যুদ্ধকালীন সময়ে ভারতে অবস্থান করে মওলানা ভাসানী মুক্তিযুদ্ধকে সুদৃঢ় এবং মুক্তিযুদ্ধের গতিবেগ সঞ্চার করার জন্য জাতিসংঘের মহাসচিব, মুসলিম বিশ্বের কাছে, গণতান্ত্রিক সকল রাষ্ট্রসহ বিশ্ববাসীর কাছে চিঠি পাঠান।  আর ’৭১ এ চীন ও আমেরিকা বাংলাদেশের বিরোধিতা ও পাকিস্তানকে সমর্থন করায় মওলানা ভাসানী তাদের কৃত অন্যায়ের প্রতিবাদ করে একের পর এক বিবৃতি প্রদান করে চিঠিপত্র ও টেলিগ্রাম পাঠান এসব দেশে। মওলানা ভাসানী সাহসিকতা ও বিচক্ষণতার সাথে এ ষড়যন্ত্রকে প্রতিহত করে স্বাধীনতা সংগ্রামকে আরও শক্তিশালী ও গতিশীল করে বিজয়ের পথে নিয়ে যান।

১৯৭১ সালের ২৫ এপ্রিল মওলানা ভাসানী সোভিয়েত রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের কাছে বাংলাদেশের জনগণের ওপর পাকিস্তান যে বর্বরোচিত অত্যাচার চালাচ্ছে তার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করেন। ৩১ মে মওলানা ভাসানী এক বিবৃতিতে বলেন, ‘বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ দখলদার বাহিনীর সঙ্গে জীবনমরণ সংগ্রামে লিপ্ত। তারা মাতৃভূমি রক্ষার জন্য বদ্ধপরিকর। তারা এই সংগ্রামে জয়লাভ করবেই।’ ৭ জুন মওলানা ভাসানী এক বিবৃতিতে বলেন, ‘বাংলাদেশের সব অঞ্চল আজ দশ লাখ বাঙালির রক্তে স্নাত এবং এই রক্তস্নানের মধ্য দিয়েই বাংলার স্বাধীনতা আসবে।’

১৯৭১ সালের ৮ সেপ্টেম্বর কলকাতায় মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগ, ন্যাপ সহ ৫ রাজনৈতিক দলের নেতাদের বৈঠকে ‘জাতীয় উপদেষ্টা কমিটি’ গঠিত হয়, যা ‘সর্বদলীয় উপদেষ্টা পরিষদ’ নামে পরিচিতি লাভ করে। ৮ সদস্য বিশিষ্ট এ পরামর্শক কমিটির সভাপতি ছিলেন মওলানা ভাসানী এবং সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ। আন্তর্জাতিক শক্তিকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার অনুকূলে আনতে এ কমিটি সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

যুদ্ধের পুরো সময় মওলানা ভাসানী ভারতের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছিলেন। এ সময় তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে সহায়ক ভূমিকা রাখতে জাতিসংঘ, চীন, রাশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে তারবার্তা প্রেরণের পাশাপাশি তাঁর আন্তর্জাতিক প্রভাবের সর্বাত্মক ব্যবহার করেছিলেন।

সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশের মহানায়ক যদি ভাসানী হন তবে স্বার্থহানী হবে ভারতের। কারণ ভাসানী হক কথা বলতে দ্বিধাবোধ করতেন না এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থের ব্যাপারে তিনি ছিলেন আপোষহীন। সেজন্যই ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হওয়া স্বত্বেও মওলানা ভাসানী স্বাধীন দেশে পা রাখেন পাকিস্তানে কারাবন্দী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেশে ফেরার ১২ দিন পর। ১৯৭২ সালের ২২ জানুয়ারি ঢাকায় ফিরে তিনি সর্বপ্রথম যে দাবিটি তোলেন তা হলো, বাংলাদেশ ভূখণ্ড থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অপসারণ।

১৯৭৬ সালের ১৭ নভেম্বর ঢাকার পিজিতে মওলানা ভাসানীর সংগ্রামী জীবনের অবসান ঘটিয়ে চিরবিশ্রামে চলে যান পরোপারে। তাঁর মৃত্যুর সংবাদ প্রচারিত হলে প্রিয় নেতাকে শেষবারের মতো দেখার জন্য অসংখ্য মানুষ ছুটে যান হাসপাতালে।

তাঁর মৃত্যুতে সরকারিভাবে ৭ দিনের জাতীয় শোক ঘোষণা করা হয়। পরদিন ১৮ নভেম্বর অপরাহ্নে পরিপূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় টাঙ্গাইলের সন্তোষে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে তাঁকে সমাহিত করা হয়।

মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী বড় মাপের একজন মানুষ ছিলেন। তাঁর মুক্তিযুদ্ধে অবদান সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়ুক। শুধু মৃত্যুবার্ষিকী কেন্দ্রিক স্মরণ না করে তাঁর চেতনাকে আমরা নিজেদের কাজের মধ্যে লালন করে সুখী সমৃদ্ধশালী দেশ গড়ি এই হোক প্রত্যয়।

তথ্য সূত্র:

১. মওলানা ভাসানী: রাজনৈতিক জীবন ও সংগ্রাম, লেখক: শাহরিয়ার কবির।

২. মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী, লেখক: শাহজাহান মিন্টু ও রবিউল দুলাল।

৩. বাংলা পিডিয়া।

লেখক: শিক্ষার্থী, শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজ।  

 

জসিম/হাকিম মাহি

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন