ঢাকা, রবিবার, ২৮ আষাঢ় ১৪২৭, ১২ জুলাই ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:
জীবনের গল্প

ভালোবাসার পোস্টমর্টেম

ডা. এজাজ বারী চৌধুরী : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৬-০২ ৩:২০:০৬ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৬-০২ ৩:২০:০৬ পিএম

নাটক-সিনেমার কল্যাণে ছোটবেলা থেকেই ধারণা জন্মেছিল ‘ভালোবেসে’ বিয়ে করতে পারলেই বোধ হয় সুখী হওয়া যায়৷ তাই ঠিক করেছিলাম, ভালোবেসেই বিয়ে করবো এবং তারপর সারাটা জীবন সুখের সাগরে ভেসে বেড়াবো৷

যাইহোক, সৃষ্টিকর্তা আমার মনের ইচ্ছা একসময় পূরণ করেছিলেন। তবে আমার ইচ্ছে অনুযায়ী নয়, তাঁর ইচ্ছে অনুযায়ী!

আমার ভালো লেগেছিল অপূর্ব সুন্দরী স্নিগ্ধাকে, যে দেখতে ছিল, আমার সবচেয়ে প্রিয় টিভি সিরিয়াল ‘The X Files’ এর নায়িকার মতো, কিন্তু তার চেয়েও অনেক বেশি সুন্দর৷

মেয়েদের সঙ্গে কখনো মিশিনি, তাদের সাথে কীভাবে কথা বলতে হয় তা জানি না, এমনকি তাদের মনও বুঝি না, তেমন সময়কার কথা এটা৷ তার উপর আমার যেই unsmart স্বভাব, সব কিছু সরাসরি বলা। তাই প্রথম যেদিন কথা বললাম, সেদিনই তাকে আমার ভালো লাগার কথা বলেছিলাম৷

ঢাকার সুন্দরী, স্মার্ট, অনেক ছেলে বন্ধুওয়ালা মেয়েটি খুব মজা পেয়েছিল, প্রথম দেখাতেই আমার এমন আনস্মার্ট ব্যক্তিত্ব শুনে! শুরুতেই সে আমাকে বোল্ড আউট করে দিলো, আমি তার সমবয়সী বলে৷ তার দর্শন ছিল, সমবয়সীরা কেবলই বন্ধু হতে পারে, জীবনসঙ্গী না৷

এরপরও সে নিজের থেকে মাঝে মধ্যে আমার সঙ্গে কথা বলতো। এক কোচিং থেকে আরেক কোচিং পর্যন্ত আমরা কথা বলতে বলতে যেতাম৷ আমার অনেক কথাতেই সে খুব মজা পেতো, আর প্রাণ খুলে হাসতো! মনে হওয়া শুরু হলো, আমাকে বোধ হয় তার অল্প অল্প ভালো লাগা শুরু হয়েছে৷

তাই আশায় আশায় আরেক দিন কথাটা বললাম৷ সে বললো, তুমি বন্ধু হিসেবে খুবই ভালো আর অসাধারণ একজন। তোমার বন্ধুত্ব আমি হারাতে চাই না! বিরক্ত হয়ে আমি বললাম, আমি শুধু একজন মেয়েরই বন্ধু হবো, যার সঙ্গে সারাটা জীবন কাটাবো৷ আর অন্য কোনো মেয়ের বন্ধু হতে আমি interested নই!

আমি ওই কোচিংয়ে যাওয়া বন্ধ করে দিলাম৷ মেস ছেড়ে দিয়ে এক আত্মীয়ের বাসায় উঠলাম, যেটুকু পিছিয়ে পড়েছি এই ভালোবাসা জোটানোর মরীচিকায়, সেটুকু কাভার করার জন্য সিরিয়াস পড়াশোনা শুরু করলাম৷ স্নিগ্ধাকে প্রায় ভুলে গেলাম৷

কিন্তু সে ঠিকই দু’এক মাসের মধ্যেই আমার এক বন্ধুর সাহায্য নিয়ে আমাকে খুঁজে বের করলো এবং আমার ওই আত্মীয়ের বাসায় ফোন করে, আমাকে বিস্ময়ে হতবাক করে দিলো৷ আমাকে তার বাসার ফোন নম্বর এবং কখন কখন ফোন করা যাবে সেটাও বলে দিলো৷ এদিকে ভর্তি পরীক্ষার বেশি বাকি নেই, তাই ফোন নিয়মিত করা হতো না৷ তবে যখন করতাম, এক-দেড় ঘণ্টার আগে সে ফোন রাখতো না৷ আমি ধরেই নিলাম, আমি জিততে চলেছি৷

আবার একদিন ওই প্রসঙ্গ তুললাম এবং সেও একই উত্তর দিলো৷ শেষ চেষ্টা হিসেবে একটা চ্যালেঞ্জে ওকে রাজি করালাম৷ চুক্তি হলো, আমি যদি DMC-তে (ঢাকা মেডিকেল কলেজ) চান্স পাই, তবে আমিই জিতবো। আর ওর Year mate theory হেরে যাবে৷চ্যালেঞ্জে জিতলাম, কিন্তু সে তার কথা রাখলো না৷

DMC-তে প্রথম দিনই এমন কাণ্ড ঘটিয়ে ফেললাম যে, পুরো মেডিকেল কলেজ তো বটেই এমনকি বুয়েটেও আমার নাম ছড়িয়ে পড়লো৷ সামান্য একটা পায়ের dissection (ব্যবচ্ছেদ) দেখতে গিয়ে, মাথা ঘুরে পড়ে গেলাম৷ মাথার পেছনে তিনটি সেলাই দেওয়া লাগলো! প্রথম দিন থেকেই গায়ের Apron এর পাশাপাশি, মাথায় ও ব্যান্ডেজের Apron জুটলো আমার!

সাত দিন পর সেলাই কেটে ব্যান্ডেজ মুক্ত হওয়ার পর, আমাদের ব্যাচের একটি মেয়ে এসে আমার সাথে পরিচিত হলো এবং আমার সঙ্গে তার পড়াশুনা করার ইচ্ছের কথা জানালো৷ কয়েক দিন পর থেকে, আমরা একসঙ্গে পড়া শুরু করলাম৷

তারও কয়েক দিন পর স্নিগ্ধা আসলো DMC-তে, আবারও আমাকে অকল্পনীয় surprise দিয়ে! সেদিন ছিলো আমার জন্মদিন। আমাকে নিয়ে সে একটা ফাস্ট ফুডের দোকানে গেলো এবং কেক কেটে আমাকে উইশ করলো৷ ঐদিন স্নিগ্ধা এত সুন্দর ড্রেস পরে আর সেজে এসেছিল যে, আমার মনে হচ্ছিল এই পুরো পৃথিবীতেই ওর থেকে সুন্দরী বোধ হয় আর কেউ নেই।

স্নিগ্ধার ভেতর একটু ঈর্ষা আনার জন্য সোমার কথা বললাম৷ এছাড়া ওকে যে ভুলেই গিয়েছিলাম, সেটাও বললাম৷ জবাবে ও বললো, এভাবে হা করে আমাকে দেখছো কেন, গলায় মাছি ঢুকবে।

আমি অনুভব করলাম, এই মেয়ের মন পড়তে বা বুঝতে পারার চেষ্টার চেয়ে গলায় মাছি আটকে মরে যাওয়াও সহজ।

পড়ার ফাঁকে ফাঁকে সোমার সাথে স্নিগ্ধাকে নিয়ে গবেষণা করতাম৷ সে কেন এটা করলো, কেন ওটা বললো, এসবের ব্যাখা জানতে চাইতাম৷ কিন্তু আরেক নারী হৃদয়ের কাছেও তার এসব কাজের বেশির ভাগই The X-Files এর রহস্যই হয়ে থাকতো৷

এরমধ্যে স্নিগ্ধার কাছে শেষবারের মতো জানতে চাইলাম, সে তার Year mate theory নিয়েই থাকবে কি না? যদি তাই থাকে, তাহলে আমি তার সঙ্গে কোনো যোগাযোগই আর রাখবো না৷ সে দেখা করে জবাব দিতে চাইলো৷ আমি ভাবলাম, ‘অবশেষে উনাকে পাইলাম!’

দেখা করার দিন, সোমার কাছ থেকে অনেক Tips নিয়ে বের হলাম৷ কোন ড্রেস এ আমাকে সবচেয়ে হ্যান্ডসাম লাগবে, সেটাও সোমা ঠিক করে দিয়েছিল!

আমার দুরুদুরু মন, আনন্দে ঝলমল করে উঠলো স্নিগ্ধার কথা শুনে! বললো, সে জীবনে যত চিঠি পেয়েছে, তার সবই ফেলে দিয়েছে, শুধু আমারগুলো ছাড়া৷ আমার চিঠিগুলো তার এতই ভালো লাগে যে, সে বারবার পড়ে৷ সারাজীবন সেগুলো সে রেখে দেবে, এমনকি তার নাতি নাতনীদেরকেও পড়াবে! আমাকে সে খুব পছন্দ করে, কোনো দিনও হারাতে চায় না, তবে তা কেবল বন্ধু হিসেবে! ওই দিন স্নিগ্ধার কথাগুলো শুনে হয়তো বিধাতাও অট্টহাসি দিয়েছিলেন৷

স্নিগ্ধার বিরক্তিকর কর্মকাণ্ড আর আমার reading partner সোমার মনের সৌন্দর্য সুন্দর চেহারার প্রতি আমার মোহকে আস্তে আস্তে কাটিয়ে দিতে লাগলো৷

এরই মধ্যে একদিন, আমাদের ব্যাচের অন্য একটি ছেলে, যে ছিল অনেক বেশি সুদর্শন, সে সোমাকে propose করলো৷ ছেলেটি আমাকেই তার পোস্টম্যান বানালো, তার চিঠিটি সোমাকে পৌঁছে দেওয়ার জন্য। আমি খুব স্বাভাবিকভাবেই মজা করতে করতে চিঠিটি সোমাকে দিলাম এবং অভিনন্দনও জানালাম। ধরেই নিলাম, এরপর থেকে আমাকে একা একাই পড়তে হবে৷

হোস্টেলে ফেরার পর বুকের ভেতরটা কেমন যেন করতে লাগলো! আমার প্রতি সোমার কেয়ারিং আর আমাকে ঘিরে ওর সুন্দর সুন্দর স্বপ্নগুলো বারবার মনের পর্দায় ভেসে উঠতে লাগলো৷

এরপর থেকে কেউ আর আমার রেজাল্ট খারাপ হলে, মন খারাপ করে বসে থাকবে না। আমার পড়া শেষ হলো কি না সেই টেনশনে থাকবে না। কোন ড্রেসটাতে আমাকে মানায় না সেটা নিয়ে মাথা ঘামাবে না। চুল বড় হলে ঠেলে ঠেলে আমায় চুল কাটতে পাঠাবে না।

আমি সময়মতো খেলাম কি না, আজ মাছ/মাংস না খেয়ে টাকা বাঁচালাম কেন, ২ কাপ চা না খেয়ে ১ প্যাকেট দুধ খেতে পারতাম ইত্যাদি বলে আমার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করবে না।

সোমাকে তো আমি ভালোবাসার কথা কল্পনাতেও আনিনি তখনও৷ ওর চেহারা তখনো আমায় মুগ্ধ করেনি৷ সে রিডিংরুমে বসে আছে জেনেও, আমার ঘুম থেকে উঠতে ইচ্ছে হতো না। অনেক সময় ২/৩ ঘণ্টা পর যেতাম৷ এমনকি কোনো অকেশনে ওকে সামান্য কিছু উপহার দেওয়ার কথাও কখনো মাথায় আসেনি আমার।

কিন্তু আমার এত উদাসীনতাও আমার প্রতি তার মমত্বকে একটুও কমাতে পারেনি। আমাদের সবচেয়ে বড় শুভাকাঙ্ক্ষীও যে অনেক সময় মনের আড়ালেই রয়ে যায় এবং শুধু তাকে হারানোর সময়ই আমরা সেটা বুঝতে পারি। এই সত্যটাও হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করলাম।

নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম, সবকিছু সবার ভাগ্যে থাকে না৷ যাকে পেতে চাইতাম, সে আমাকে চায়নি৷ আর যে আমার জীবনটাকে সত্যিকারভাবে সাজিয়ে দিতে পারতো, তাকে পাবার কথা মাথায়ও আনিনি।

এর পরের ঘটনাগুলো ছিল আমার জন্য খুবই অপ্রত্যাশিত৷আমাদের ব্যাচের সেই সুন্দর, হ্যান্ডসাম ছেলেটিকে সোমা ‘না’ করে দিলো৷ আমাকে বললো, কারো সাথে প্রেম করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছেও ওর নেই, এমনকি সে বিয়েও করতে চায় না। সুতরাং আবার শুরু হলো আমাদের একসঙ্গে পড়া।

কিন্তু আমি উপলব্ধি করছিলাম, এমন একজনকে নিয়েই জীবনের পথ পাড়ি দিতে হবে, যে চলার পথে তার পুরোটা খেয়াল আমার দিকেই রাখবে৷ আমি পাথরে হোঁচট খেলে, আমাকে সাথে সাথে আঁকড়ে ধরবে। কিংবা পড়ে গেলেও সে সবকিছু ভুলে আমাকেই প্রথম উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করবে, আমার পড়ে যাওয়া নিয়ে উপহাস করবে না৷

তাই এবার আমি সোমাকে রিডিং পার্টনার থেকে ভবিষ্যত জীবনসঙ্গী হওয়ার প্রস্তাব দিলাম। ১৯ বছর আগের আমার সেই রিডিং পার্টনার একসময় তার বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত চেঞ্জ করলো এবং অবশেষে বিয়ে করলো এই অপদার্থ আমাকে।

নিতান্ত গোবেচারা বলেই হয়তো, এখনো আমাকে নিয়েই সে হাসে—সুখের হাসি, প্রশান্তির হাসি!

লেখক: ডা. এজাজ বারী চৌধুরী।

 

ঢাকা/মুছা/হাকিম মাহি