ঢাকা     শনিবার   ০৮ আগস্ট ২০২০ ||  শ্রাবণ ২৪ ১৪২৭ ||  ১৮ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

আলথুসার ও আদর্শিক রাষ্ট্রযন্ত্র

|| রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৭:১০, ৯ জুলাই ২০২০  

প্রখ্যাত ফরাসি দার্শনিক লুই আলথুসারের তত্ত্বকে কেন্দ্র করে অনুবাদক ও কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিনের অনবদ্য লেখনী 'আলথুসার'। লেখক যুগপৎভাবে বর্ণনা করেছেন ব্রিটিশ পরিবেশবাদী আন্দোলন ‘এক্সটিংকশন রেবেলিয়ন’-এর আখ্যান ও আলথুসার তত্ত্ব। গল্পের গাঁথুনির ভাঁজে তত্ত্বসমৃদ্ধ এমন লেখনী উপন্যাসের জগতে নতুন ধারা সৃষ্টি করেছে। চলতি বছরের গোড়ার দিকে প্রকাশিত হয় গ্রন্থটি । যেতে চাই মূল গল্পে।

গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র একজন বাংলাদেশি ব্যাংকার। যিনি একবছর যাবত আলথুসার পড়ে আপাদমস্তক আলথুসার গবেষক হয়ে উঠেছেন। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষানবিশ হওয়ার দরুন পাড়ি জমাতে হয় লন্ডনে। হোক তা ক্ষণকালের জন্য। তিনি ওঠেন তার শ্যালিকা ফারজানা এবং তার ব্রিটিশ-বাংলাদেশি বর জোসেফের বাড়িতে। তার আলথুসার প্রেমে আগ্রহী হয়ে ওঠেন জোসেফ।

সুতরাং জোসেফের সাথেই আলাপ জমানো যাবে। ফরাসি কাঠামোবাদী মার্কসবাদী দার্শনিক লুই আলথুসার। তার সমসাময়িকদের মধ্যে ইতালীয় দার্শনিক আন্তোনিও গ্রামসি প্রণিধানযোগ্য। তার শিক্ষার্থীর ফর্দ করতে গেলে উঠে আসবে অনেক বিখ্যাতজনের নাম। যার মধ্যে মিশেল ফুকো, জাক দেরিদা এবং চে গুয়েভারার সাথে বলিভিয়ার প্রান্তরে লড়াই করা রেজি দেব্রের নাম সর্বাগ্রে উল্লেখযোগ্য।

এই দার্শনিকের প্রধানতম তত্ত্ব হলো আদর্শিক রাষ্ট্রযন্ত্রের ধারণা। তার মতে, রাষ্ট্রযন্ত্রের কাজ রাষ্ট্রের নাগরিকদের নিয়ন্ত্রণ করা। অন্যান্য মার্কসবাদীরা রাষ্ট্রযন্ত্র বলতে কেবলই দমন-পীড়ন মূলক এক সত্তাকে বুঝিয়েছেন। তিনি এখানে বিরোধ পোষণ করেছেন। তিনি বলছেন, রাষ্ট্রযন্ত্র শুধু দমনমূলক-ই হয় না আদর্শিকও হয়। সুতরাং রাষ্ট্রযন্ত্রকে তিনি দুইভাগে ভাগ করছেন;

(১) দমনমূলক রাষ্ট্রযন্ত্র বা রিপ্রেসিভ স্টেট অ্যাপারেটাস

(২)আদর্শিক রাষ্ট্রযন্ত্র বা ইডিয়োলজিক্যাল স্টেট অ্যাপারেটাস।

দমনমূলক রাষ্ট্রযন্ত্রকে সংক্ষেপে আরএসএ (RSA) এবং আদর্শিক রাষ্ট্রযন্ত্রকে আইএসএ (ISA) বলা যেতে পারে। দমনমূলক রাষ্ট্রযন্ত্রের- যেমন আদালত, পুলিশ, আর্মি- এদের কাজ হলো সহিংস পথে সব ঠিক রাখা। তবে সহিংস না হয়ে চাপ প্রয়োগ করে কিংবা ভীতি প্রদর্শন করেও কার্যসিদ্ধি করা যায়। এই আরএসএ- এর আবার তিনটি ভাগ রয়েছে- পুলিশি চাপ, জেলে পোরা এবং সামরিক বাহিনী মাঠে নামানো।

অন্যদিকে রাষ্ট্রের আইএসএ- এর কাজ হচ্ছে সহিংসত দমন-পীড়নের দিকে না যেয়ে বরং ক্ষমতায় যারা আছে তারা যা যা বিশ্বাস করে, সেসব কিছুকে রাষ্ট্রীয় আদর্শরুপে প্রচার করা। আলথুসার বলছেন, আইএসএ গুলো সিভিল সোসাইটির অংশ। এদেরকে দেখতে মনে হয় অরাজনৈতিক তবে এরা ভয়াবহ সব রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান যেমন স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়সহ যাবতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, নাটক-সিনেমা, সংবাদপত্র-টিভির মতো সব মিডিয়া প্রতিষ্ঠান, সাহিত্য নামের আপাত-অদৃশ্য প্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মন্দির-চার্চ-মাদ্রাসাসহ সকল ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, মোহামেডান ক্লাব-আবাহনী ক্লাবের মতো সব সোশ্যাল ও স্পোর্টস ক্লাব আর ফ্যামিলি-পরিবার। এরা হলো রাষ্ট্রের ইডিয়োলজিক্যাল স্টেট অ্যাপারেটাস বা শাসকের আইডিয়োলজি প্রতিষ্ঠা করার রাষ্ট্রযন্ত্র।

আলথুসার বলেছেন, রাষ্ট্রের দেখতে নিরীহ। কিন্তু ‘কন্টিনিউয়াস সাইকোসোশ্যাল’ প্রক্রিয়া আমাদের মাথা নষ্ট করতে থাকা আইএসএ গুলোর মাধ্যমে সরকার যদি আইএসএ গুলোকে বশ না করে রাখে আর আইএসএ গুলো দিয়ে আমাদের বশীভূত করে না রাখে তবে কোনো রাজনৈতিক দল বা কোনো সামাজিক গোষ্ঠী-ই  তাদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দীর্ঘদিন ধরে রাখতে পারবেনা।

আইএসএ গুলো ব্যার্থ হলে সরকার স্রেফ পুলিশ, গোয়েন্দা, আর্মির আরএসএ দিয়ে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে পারেনা। কথকের এসব আলোচনায় জোসেফ ক্রমাগতভাবে আগ্রহী হয়ে উঠলেও শ্যালিকা ফারজানা সঙ্কা বোধ করছেন। কেননা এমন সময় এসব আলোচনা করছেন যখন লন্ডনের অক্সফোর্ড স্ট্রিটে পরিবেশবাদী ‘এক্সটিংকশন রেবেলিয়ন’ চলছে পুরোদস্তুর। সমবেত হয়েছে আন্দোলনকারী হাজার হাজার ইকো-ওয়ারিয়র (পরিবেশযোদ্ধা)। যার সমর্থন জানিয়েছেন হালের অন্যতম দার্শনিক নোয়াম চমস্কি। তবে রাষ্ট্র এটিকে নিয়েছে সরকার বিরোধী আন্দোলন হিসেবে।

‘এক্সটিংকশন রেবেলিয়নের’ বঙ্গানুবাদ করলে অর্থ দাড়ায় 'বিলুপ্তি আন্দোলন'। প্রকৃতপক্ষে, বিলুপ্তি রোধের অন্দোলন। এ আন্দোলনের নেত্রী গেইল ব্রাডরুকের ভাষ্যমতে, তৃতীয় বিশ্বে এখন মানুষ খেতে পায় না। কিছুদিন পরে তাবৎ মানবজাতি-ই খেতে পাবেনা। ফুড সিকিউরিটি থাকছেনা। কারণ প্রতি এক ডিগ্রি পৃথিবী উষ্ণ হলে এক পার্সেন্ট ইকোনমিক গ্রোথ পড়ে যায় সুতরাং ইকোনোমিক গ্রোথ-ই হয় বছরে মোট চার পার্সেন্ট হারে অতএব চার ডিগ্রি পৃথিবীর উষ্ণতা বাড়লে সবশেষ! হায়! এ আন্দোলন প্রায় অচল করে দিচ্ছিল লন্ডন শহরকে। তাই রাষ্ট্রও ধরপাকড় শুরু করেছে। সন্দেহবশত গ্রেফতার হয়েছিলেন এ আলথুসারপ্রেমীও। কথক, ফারজানা এবং জোসেফের চলাচল অক্সফোর্ড স্ট্রিট কেন্দ্রিক। কেননা কথক মরিয়া হয়ে খুজছেন অক্সফোর্ড স্ট্রিটের নিকটে হার্লি স্ট্রিটের রহস্যময় একটি বাড়ি। যেখানে ১৯৭৮ সালে এসে উঠেছিলেন তার পীর লুই আলথুসার। এখানে থাকতেন তার বন্ধু ডগলাস  জনসন। যিনি তার জীবনী গ্রন্থ  ‘দ্য ফিউচার লাস্টস ফর এভার’ এর সুন্দর একটি মুখবন্ধ লিখেছেন। জনসন আবিস্কার করেছিলেন এই বিখ্যাত পশ্চিমা দার্শনিকের অদ্ভুত স্বপ্নচারণের রোগ।

যাইহোক, জোসেফ বিস্মিত হন এই প্রথিতযশা দার্শনিকের স্ত্রী হত্যার গল্প শুনে। আলথুসার ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে তার স্ত্রী সমাজতত্ত্ববিদ হেলেন রাইটমানকে গলা টিপে হত্যা করেন। ঠিক কি কারণে আলথুসার হেলেনকে মেরেছিলেন, তা এখনো অজানা। এমনকি এবিষয়ে আলথুসারের লেখা সাড়ে তিনশ’ পৃষ্ঠার আত্মজীবনীমূলক স্মৃতিচারণা গ্রন্থ দ্য ফিউচার লাস্টস ফর এভারেও নেই বোধগম্য কোনো বিশ্লেষণ।

ঠিক এ কারণেই আলথুসারের স্ত্রী হত্যা প্রসঙ্গ হালের দিনগুলিতেও ভাবায় মানবসভ্যতাকে। বিশেষত রেজি দেব্রে কিংবা জাঁ গিতঁর মতো দার্শনিকেরা যখন বলেন, এ হত্যা ছিলো আলথুসারের তার স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ! তাহলে এ এক নজিরবিহীন প্রণয়! তবে তার বন্ধু ডগলাস জনসনের দাবি, আলথুসারের স্লিপওয়াকিং রোগের কারণেই ঘুমের ঘোরে হত্যা করেছেন স্ত্রীকে। আমরা হেলেনের হত্যা রহস্য উদঘাটনে যাব না। কোনো অপরাধবিজ্ঞানী এ বিষয়ে আগ্রহী হলে তিনি তা করবেন। লোকোক্তি রয়েছে ‘দুধের স্বাদ ঘোলে মেটে না’ তেমনি এ পর্যালোচনা দ্বারা মূলগ্রন্থ কিংবা আলথুসারের তত্ত্বের স্বাদ আস্বাদন দু:সাধ্য ব্যাপার বইকি।

লেখক: শিক্ষার্থী, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

 

ঢাবি/মাহফুজ

রাইজিংবিডি.কম

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়