জাবিতে বেড়েছে মশার উপদ্রব, স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে শিক্ষার্থীরা
জাবি প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) ক্যাম্পাসে মশার উপদ্রব ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। আবাসিক হল, ক্লাসরুম থেকে শুরু করে লাইব্রেরি, সবখানেই এখন মশার একচ্ছত্র আধিপত্য। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন শিক্ষার্থীরা। ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক পড়াশোনা ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রা। মশার কামড়ে অতিষ্ঠ শিক্ষার্থীরা এখন ম্যালেরিয়া ও ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত নানা রোগের ঝুঁকিতে রয়েছেন।
শিক্ষার্থীরা জানান, বিশেষ করে সন্ধ্যার পর থেকে মশার উপদ্রব এতটাই বেড়ে যায় যে, কোথাও দুই মিনিট দাঁড়িয়ে কথা বলার উপায় থাকে না। আবাসিক হলগুলোতে দিনের বেলাতেও মশারি টাঙিয়ে বিছানায় বসে থাকতে হচ্ছে।
শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ হলের আবাসিক শিক্ষার্থী তৌহিদুর রহমান বলেন, “সন্ধ্যা হওয়ার সাথে সাথে যদি পাঁচ মিনিটের জন্য রুমের দরজা-জানালা খোলা থাকে, তবে মশার কারণে রুমে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে। আমাদের প্রতিদিনের পড়াশোনা ও অন্যান্য কাজে চরম ব্যাঘাত ঘটছে। মশারি ছাড়া এক মুহূর্তও টেকা যাচ্ছে না।”
একই চিত্র দেখা গেছে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক হলেও। ওই হলের শিক্ষার্থী মাহফুজুল হক বলেন, “রমজান মাস চলায় সেহরি বা ইফতারের সময় ডাইনিং ও ক্যান্টিনে বসতে হয়, কিন্তু মশার কারণে সেখানে টেকা দায়। প্রশাসন বা হল সংসদ থেকে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। হলের পাশের লেক এবং ড্রেনগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করা হলে এই প্রকোপ কিছুটা কমতো।”
ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানের ড্রেন, ডোবা ও ঝোপঝাড় দীর্ঘ সময় ধরে পরিষ্কার করা হয়নি। যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনার স্তূপ জমে থাকায় সেগুলো মশার প্রজনন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এছাড়া, প্রতিবছর শীতের শুরুতে মশা নিধন অভিযান জোরদার থাকলেও এ বছর প্রশাসনের তেমন কোনো জোরালো পদক্ষেপ চোখে পড়েনি বলে অভিযোগ সাধারণ শিক্ষার্থীদের।
দেশের খ্যাতনামা কীটতত্ত্ববিদ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার জানান, বর্তমানে ক্যাম্পাসে মশার ঘনত্ব প্রতি ঘণ্টায় জনপ্রতি ৮০০ ছাড়িয়েছে। এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
তিনি বলেন, “দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হওয়ায় জলাশয়ের ওপরের জলজ উদ্ভিদ পচে ড্রেন ও নর্দমা আটকে গেছে। নাগরিকদের ফেলা ময়লায় পানির প্রবাহ বন্ধ হয়ে মশার উপযুক্ত প্রজনন ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। তাপমাত্রা মশার অনুকূলে আসায় মশার ঘনত্ব অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে।”
প্রচলিত ‘ফগিং’ বা ধোঁয়া দেওয়ার পদ্ধতিকে অকার্যকর ও ব্যয়বহুল উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, “ধোঁয়া দিয়ে মশা তাড়ানো কোনো স্থায়ী সমাধান নয়, এতে স্বাস্থ্যঝুঁকিও আছে। মশা নিয়ন্ত্রণে লার্ভিসাইড (যেমন: টেমিফস ৫০) প্রয়োগ করতে হবে এবং ড্রেন ও জলাশয়ের পানি প্রবাহমান রাখতে হবে। প্রাকৃতিক উপায়ে মশা দমনে ডোবাগুলোতে মাছ ছাড়া যেতে পারে।”
মশা নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের ধীরগতি নিয়ে ক্ষোভ থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে তারা কাজ শুরু করেছে। এস্টেট অফিসের ডেপুটি রেজিস্ট্রার মো. আবুল কাশেম জানান, মশার লার্ভা নিধনের জন্য অধ্যাপক ড. গোলাম মোস্তফার নেতৃত্বে একটি উপ-কমিটি গঠন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “কমিটির সদস্যরা ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্পট থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছেন এবং কোথাও কোথাও মশার লার্ভার ঘনত্ব অনেক বেশি পাওয়া গেছে। এই রিপোর্ট প্রোভোস্ট কমিটিতে পেশ করা হবে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে ওষুধ ছিটানোর কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জাকসু প্রতিনিধি ও প্রশাসন এ ব্যাপারে সমন্বিতভাবে কাজ করছে।”
শিক্ষার্থীদের দাবি, কেবল কাগজে-কলমে কমিটি বা দায়সারা ফগিং নয়, অনতিবিলম্বে আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে লার্ভা ধ্বংস করা এখন সময়ের দাবি।
ঢাকা/আহসান/জান্নাত