ঢাকা     সোমবার   ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ ||  মাঘ ৬ ১৪৩২

Risingbd Online Bangla News Portal

রাবিতে শিবিরের নবীনবরণে ডাকসুসহ ৩ ছাত্র সংসদের ভিপি

রাবি প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৮:১৯, ১৫ নভেম্বর ২০২৫  
রাবিতে শিবিরের নবীনবরণে ডাকসুসহ ৩ ছাত্র সংসদের ভিপি

৪২ বছর পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) নবীনবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে শাখা ছাত্রশিবির। 

প্রায় ৩ হাজার নবীন শিক্ষার্থী নিয়ে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সম্প্রতি নির্বাচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু), চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সহ-সভাপতি যথাক্রমে সাদিক কায়েম, ইব্রাহিম হোসেন রনি ও মোস্তাকুর রহমান জাহিদ। তবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জাকসু) কেউ যায়নি।

আরো পড়ুন:

শনিবার (১৫ নভেম্বর) সকাল ৯টায় কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের নবীন শিক্ষার্থীদের বরণ করে নেয় সংগঠনটি।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মাঈন উদ্দীন। প্রধাম আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুল ইসলাম। 

আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাবি শিবিরের সাবেক সভাপতি ও কেন্দ্রীয় সমাজসেবা সম্পাদক আব্দুল মোহাইমিন, কেন্দ্রীয় শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক ইব্রাহিম হোসেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদের ডিন ও হল প্রাধ্যক্ষবৃন্দ।

অনুষ্ঠানের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের নানা উপহার সামগ্রী প্রদান করে শিবির। পরে তাদের ক্যারিয়ার গাইডলাইন ও দিকনির্দেশনামূলক পরামর্শ দেওয়া হয়। এছাড়া ছাত্র সংসদগুলোর ভিপিরা ছাত্র রাজনীতির ইতিহাস, রাবির আন্দোলন-সংগ্রামের স্মৃতি এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, “খুনি হাসিনা ছাত্রশিবিরের উপর বর্বরোচিত নির্যাতন চালিয়েছিল। সর্বশেষ ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ পর্যন্ত করেছিল। কিন্তু শিবির থেকে গেছে মানুষের হৃদয়ে, আর হাসিনা পালিয়েছে দিল্লিতে। ছাত্রশিবির দেশের মানুষের ন্যায়ের পক্ষে, আজাদীর জন্য সবসময় লড়ে গেছে এবং যাবে। একইসঙ্গে শিবির যদি কোনো অন্যায় করে তাহলে আপনারা প্রতিবাদ করবেন। সব ছাত্র সংগঠনকে অনুরোধ করবো—ইসলামী ছাত্রশিবির যে নতুন ধারার রাজনীতি করছে, তা আপনারা অনুসরণ করেন।”

আওয়ামী লীগকে ‘সন্ত্রাসী গোষ্ঠী’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, “আজকের এই নবীন বরণ থেকে অন্তর্বর্তী সরকারকে অনুরোধ করবো—খুনি হাসিনাকে দেশে এনে বিচারের মুখোমুখি করে তার ফাঁসি নিশ্চিত করতে হবে। তার সঙ্গে যারা ছিল তাদেরও বিচার করতে হবে। দেশের বিচার বিভাগ, সচিবালয়, আইন বিভাগে ফ্যাসিবাদের দোসররা এখনো ষড়যন্ত্রে লিপ্ত আছে। যারা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চাইবে, তাদের আপনারারা প্রতিহত করবেন।”

“এ দেশে হাসিনা ও আওয়ামী লীগের রাজনীতি করার অধিকার নেই। আওয়ামী লীগ কোনো রাজনৈতিক দল নয়—এরা সন্ত্রাসী গোষ্ঠী, দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি। বাংলাদেশে রাজনীতি করবে তারা, যারা বাংলাদেশপন্থি। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি হয়নি; কারণ এটি ব্রিটিশ ও ভারতের প্রেসক্রিপশনে তৈরি,” যোগ করেন ডাকুস ভিপি।

রাবি শিক্ষার্থীদের ত্যাগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “ছোটবেলা থেকে রাবি শিক্ষার্থীদের ত্যাগ- কোরবানির গল্প শুনে বড় হয়েছি। রাবি শাখার উপর ইতিহাসের বর্বরোচিত মিডিয়া ট্রায়াল হয়েছিল। বিগত ফ্যাসিবাদী সময়ে এই সুন্দর ক্যাম্পাস ছিল না। গণরুম, গেস্ট রুমের মাধ্যমে সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপর নির্যাতন চলত। সাধারণ শিক্ষার্থীদের মৌলিক অধিকার হরণ করা হত, কেউ ইসলাম চর্চা করতে পারতো না। যারা করতো তাদের ট্যাগিং করে নির্যাতন করা হত।”

প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে ‍তিনি বলেন, “তোমরা ঐক্যবদ্ধ থাকলে দেশে আর কোনো নব্য ফ্যাসিস্ট জন্মাতে পারবে না। তোমাদের বিশ্বে নেতৃত্ব দেওয়ার উপযোগী হয়ে গড়ে উঠতে হবে।”

ছাত্রশিবিরের পূর্ব ইতিহাসকে স্মরণ করে চাকসু ভিপি ইব্রাহিম রনি বলেন, “১৯৮২ সালের ১১ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের নবীন বরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। সেই প্রোগ্রাম ভণ্ডুল করতে যারা সম্মিলিত আক্রমণ চালিয়েছিল, তাদের অপতৎপরতার কারণে শহীদ হয় আমাদের শহীদ ছাব্বির ভাই।”

“এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা গভীর। আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করলেও আমি এখানকারই ছেলে। কলেজ পর্যায় থেকেই এ ক্যাম্পাসে আসা-যাওয়া করার কারণে খুব পরিচিত হয়ে গেছিল সবকিছু। এ ক্যাম্পাসে তখন পড়ার সুযোগ হয়নি। ছাত্রলীগ রাজশাহী কলেজে ছাত্রশিবিরের যাদের চিনত, তার মধ্যে আমিঅন্যতম।”

ছাত্র সংসদ নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতি উল্লেখ করে তিনি বলেন, “হয়ত ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা একটা পরিস্থিতিতে এসেছি। তবে রাষ্ট্র, ক্যাম্পাস নিয়ে আমাদের যে প্রত্যাশা ছিল, তা এখনো আমরা বিনির্মাণ করতে পারিনি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যারা সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, আমরা দেখেছি মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে তারাই পরে বিভিন্ন দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।”

তিনি আরো বলেন, “আমরা প্রত্যেকটা ক্যাম্পাসে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে চেয়েছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আমাদের সহযোগিতা করবে। কিন্তু তারাই আমাদের কাজে আরো বাধা সৃষ্টি করছে। শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনগুলো না, রাষ্ট্রই আমাদের শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।”

নবীনদের উদ্দেশে প্রধাম আলোচক হিসেবে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুল ইসলাম বলেন, “শুধু স্বপ্ন দেখলে হবে না। আপনার মাঝে পরিশ্রম থাকতে হবে। আপনি ক্যাম্পাসে স্বপ্ন নিয়ে এসেছেন। এটা পরিশ্রম এবং সময়ের সর্বোচ্চ ব্যবহারের মধ্যে ইউটিলাইজেশনের মধ্য দিয়ে আপনাকে সেটা অর্জন করতে হবে। আমাদের সময়গুলো কিন্তু বরফের মতো গলে গলে পড়ে যাচ্ছে। আপনার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে সময় নির্ধারিত, এক সেকেন্ড বেশিও পাবেন না, কমও পাবেন না। এজন্য সময়ের গুরুত্ব আমরা সর্বোচ্চ দেব। পাশাপাশি আল্লাহর সাহায্য চাইব।”

তিনি আরো বলেন, “আপনি শুধু এই দুনিয়াতে ভালো ক্যারিয়ার, ভালো কর্মস্থলে যাবেন- এটা আপনার জীবনের মূল লক্ষ্য নয়। মানে আপনার জীবনের অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে, আপনি সমাজের কাছে দায়বদ্ধ থাকবেন।”

“আপনারা বিশ্বিবদ্যালয়ে পড়েন খুব অল্প খরচে। কিন্তু আপনাদের পিছনে বৃহৎ একটা অর্থ ব্যায় হয়, যেটা আসে সমাজের শ্রমিক শ্রেণির কাছ থেকে। তাই সমাজের মানুষের কাছে আপনাকে অবশ্যই দায়বদ্ধ থাকতে হবে,” যোগ করেন শিবির সভাপতি।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মাঈন উদ্দীন বলেন, “অতীতে আমার ছাত্ররা ৮-১০ হাজার টাকা দিয়ে হলে উঠত। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটি কোটি টাকার সিট বাণিজ্য হত। আমরা হলগুলোতে মেধার ভিত্তিতে সিট বন্টন চালু করেছি। ফলে সিট বাণিজ্য বন্ধ হয়ে গেছে। অতীতে তুচ্ছ কারণে আমাদের ছাত্রদের জীবন দিতে হয়েছে। এই ক্যাম্পাসে পদ্মা সেতুর জন্য টাকা উঠানো হয়েছিল, সেই টাকা ভাগাভাগি নিয়ে মানুষ মেরে ফেলেছে। আগস্ট বিপ্লবের ফলে ক্যাম্পাসের এসব সংস্কৃতি পরিবর্তন হয়েছে।”

তিনি আরো বলেন, “গত সপ্তাহে ১০ জনকে গাঁজাসহ আটক করেছে প্রক্টোরিয়াল বডি। এই ক্যাম্পাস মাদকের আখড়া। নতুন শিক্ষার্থীদের আমি এসব থেকে ১০০ হাত দূরে থাকার অনুরোধ জানাচ্ছি। আজ যারা নবীনবরণ করছে, তারা রাকসুতে বেশি আসনে জয়ী হয়েছে। ভোটে জয়ী হওয়ার একটা দায়বদ্ধতা আছে। শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা অনুযায়ী ক্যাম্পাস গঠনে রাকসু প্রতিনিধিদের দায়বদ্ধতা রয়েছে।”

রাকসুর ভিপি ও রাবি শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন। তিনি বলেন, “১৯৮২ সালের ১১ মার্চ ছাত্রশিবির রাবি শাখা নবীনবরণ আয়োজন করতে চেয়েছিল। সেই অনুষ্ঠানকে অন্যান্য মতাদর্শের ভাইয়েরা বুমেরাং হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন। নবীনবরণ আয়োজনের পর আমাদের সাব্বির ভাই, হামিদ ভাই, আইয়ুব ভাই ও জব্বার ভাই আর ঘরে ফিরে যেতে পারেনি। তাদের আঘাতে এই চার ভাই শহীদ হয়েছিলেন। তারা ইসলামি ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে সারা বাংলাদেশের প্রথম শহীদ হিসেবে বিবেচিত। এ ঘটনার পর থেকেই প্রতি বছর ১১ মার্চ ছাত্রশিবির ‘শহীদ দিবস’ হিসেবে পালন করে। এটি ছিল রাবি ছাত্রশিবিরের প্রতি জুলুমের ইতিহাস।”

তিনি বলেন, “সেই দিন পাল্টে গেছে। এই নবীনবরণ করতে গিয়ে আমার ভাইয়েরা শহীদ হয়েছিল, আর আজ আমরা সেই অনুষ্ঠান সুষ্ঠুভাবে আয়োজন করতে পারছি। ১৯৮২ সালের পর আজই প্রথম আমাদের ক্যাম্পাসের ভেতরে এত বড় নবীনবরণের আয়োজন করেছি। এর আগে ক্যাম্পাসের বাইরে আয়োজন করলেও সেখানে আমরা আমাদের বোনদের রাখতে পারিনি। কিন্তু এবার আমরা তা করতে পেরেছি, আলহামদুলিল্লাহ।”

এর আগে, সংগঠনটির ক্যাম্পাসে সর্বশেষ নবীনবরণ অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৮২ সালে। সেদিন শাখা ছাত্রমৈত্রী, জাসদ, ছাত্রলীগের বাধা এবং পরবর্তী সংঘর্ষে ছাত্রশিবিরের চারজন নিহত হন। এরপর থেকেই নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে শিবির তাদের নবীনবরণ অনুষ্ঠান ক্যাম্পাসের বাইরে আয়োজন করে আসছিল।

ঢাকা/ফাহিম/মেহেদী

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়