ঢাকা     শুক্রবার   ০৬ মার্চ ২০২৬ ||  ফাল্গুন ২১ ১৪৩২ || ১৬ রমজান ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

সংকট আতঙ্কে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাম্পে তেল কেনার হিড়িক

নিউজ ডেস্ক || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১১:৪৬, ৬ মার্চ ২০২৬  
সংকট আতঙ্কে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাম্পে তেল কেনার হিড়িক

বগুড়া শহরের পেট্রোল পাম্পের সামনে জ্বালানি নিতে দাঁড়িয়ে থাকা মোটরসাইকেল

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যার প্রভাব বাংলাদেশে পড়তে পারে এমন আশঙ্কা করছেন অনেকেই। এ কারণে আগেভাগে চালকরা পাম্পগুলোতে গিয়ে মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকারে ও সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তেল (অকটেন, পেট্রোল ও ডিজেল) এবং গ্যাস ফুল ট্যাঙ্ক করে রাখছেন। শুধু রাজধানী নয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে এ চিত্র দেখা গেছে। কিছু পাম্পে জ্বালানি তেল বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছে।

ঢাকা: বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) নিউমার্কেট, মালিবাগ, তেঁজগাও ও মিরপুর এলাকার পাম্পগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। ক্রেতারা ট্যাঙ্ক ভরে জ্বালানি নিচ্ছিলেন পাম্পগুলো থেকে।

আরো পড়ুন:

মালিবাগ চৌধুরীপাড়ার চৌধুরী ফিলিং স্টেশনে রাইড শেয়ারিং চালক আব্দুল্লাহ বলেন, ‍“তেলের সংকট হতে পারে, এজন্য গাড়িতে ফুল ট্যাঙ্ক লোড করে রাখছি, যেন তেল না পাওয়া গেলেও গাড়ি চালানো যায়।”

মিরপুরে সনি সিনেমা হলের পাশের একটি পেট্রোল পাম্পে মোটরসাইকেল চালকদের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। সেখানে কথা হয় প্রিন্স নামে এক মোটরসাইকেল চালকের সঙ্গে। তিনি বলেন, “একটি কাজে উত্তরায় যাব। গাড়িতে কম তেল রয়েছে, তাই পাম্পে এসেছি। আশপাশের সবার কথা শুনে মনে হচ্ছে, আগামীতে জ্বালানি সংকট দেখা দিতে পারে। তাই ফুল ট্যাঙ্ক তেল নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।” 

নাটোর: বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) রাতে নাটোর জেলার বিভিন্ন পাম্পে চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ না করার অভিযোগ উঠেছে। ফলে বিপাকে পড়েন পরিবহন চালক, মোটরসাইকেল আরোহী ও কৃষিকাজে ব্যবহৃত যন্ত্রের মালিকরা। সীমিত তেল সরবরাহের কারণে অনেক চালককে এক পাম্প থেকে আরেক পাম্পে ঘুরতে হয়েছে। ফলে তাদের সময় ও অর্থ দুটি নষ্ট হয়।

সূত্র জানায়, কোথাও কোথাও পাম্প কর্তৃপক্ষ নিজেরাই সীমিত লিটার নির্ধারণ করে দিচ্ছেন। ফলে দূরপাল্লার বাস-ট্রাক চালকরা সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন।

নাটোর শহরের সেন্ট পাম্পে তেল নিতে আসা ট্রাকচালক আব্দুল জলিল বলেন, “গাড়ির ট্যাঙ্ক ভরার জন্য তেল নিতে গেলে পাম্প থেকে বলা হচ্ছে, সীমিত তেল দেওয়া হবে। পাম্প কর্তৃপক্ষ বলছে, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে সরবরাহ কমে যেতে পারে। কিন্তু আমাদের তো নিয়মিত গাড়ি চালাতে হয়। মাঝপথে তেল শেষ হয়ে গেলে তখন বড় সমস্যায় পড়তে হয়।”

দূরপাল্লার বাসের চালক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, “আমরা ২০০–৩০০ লিটার ডিজেল নিতে চাইলে পাম্প থেকে ৫০ বা ১০০ লিটারের বেশি দিচ্ছে না। তারা বলছে, ইরানে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে তেল মজুত রাখতে হবে। ফলে আমাদের সময় নষ্ট হচ্ছে, আবার অন্য পাম্পে গিয়ে লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে।”

মোটরসাইকেল চালক রাশেদ হোসেন বলেন, “৫০০ বা ১০০০ টাকার তেল নিতে গেলেও অনেক সময় অজুহাত দেখানো হয়। বলা হয়, তেল সীমিত আছে। এতে সাধারণ মানুষ অযথা ভোগান্তিতে পড়ছে। অফিস-ব্যবসার কাজে বের হয়ে বারবার পাম্পে ঘুরতে হচ্ছে।”

জেলা পরিবহন শ্রমিক সভাপতি শরিফুল ইসলাম বুলবুল বলেন, “কোনো সরকারি ঘোষণা ছাড়াই যদি পাম্পগুলো নিজেরা তেল সীমিত করে দেয়, তাহলে তা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। পরিবহন খাতে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে। পরিবহন চালকদের সময় নষ্ট হচ্ছে, আবার অনেক সময় গাড়ি চলাচলও ব্যাহত হচ্ছে।”

নাটোর রেলস্টেশন বাজার এলাকার একটি পাম্পের মালিক বাবুল বাবু বলেন, “আমরা কোনো সংকট তৈরি করতে চাই না। তবে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি ও সরবরাহ নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা থাকায় অনেক সময় সবাইকে সীমিতভাবে তেল দিতে হচ্ছে। যাতে বেশি মানুষ তেল নিতে পারেন।”

নাটোরের ব্যবসায়ী ও সচেতন নাগরিক শামীম আহমেদ বলেন, “যদি প্রকৃতপক্ষে কোনো সংকট না থাকে, তাহলে পাম্পগুলো কেন সীমিত তেল দিচ্ছে- এটা তদন্ত করা উচিত। অনেক সময় এমন পরিস্থিতিতে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মুনাফা বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়। প্রশাসনকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার।”

নাটোর জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আব্দুল হায়াত বলেন, “যদি কোথাও কৃত্রিমভাবে জ্বালানি সংকট তৈরি করা হয় বা চাহিদা অনুযায়ী তেল না দেওয়া হয়- তাহলে অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

যশোর: বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) বিকেলে শহরের মনিহার চত্বরে অবস্থিত একটি পাম্পে গিয়ে দেখা যায়, মোটরসাইকেল চালকরা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে তেল নিচ্ছেন। প্রায় ৬ থেকে ৭ মিনিট অপেক্ষা করে অনেককে তেল নিতে দেখা গেছে। তারা গাড়ির ট্যাঙ্ক ফুল করে তেল নিচ্ছিলেন বলে জানান পাম্প সংশ্লিষ্টরা।

পাম্পে তেল নিতে আসা জুবায়ের নামে এক যুবক জানান, তেলের দাম বাড়তে পারে- এমন আশঙ্কা থেকেই তেল কিনছেন। ফুল ট্যাঙ্ক তেলে কতদিন চলবে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি মৃদু হেসে বলেন, “সবাই কিনছে, তাই আমিও নিচ্ছি।”

পাম্পের এক কর্মী কিছুটা আক্ষেপের সুরে জানান, অনেকে ফুল ট্যাঙ্ক করে তেল নিচ্ছেন। মনে হচ্ছে, তেল শেষ হলে মোটরসাইকেল ধুয়ে-মুছে তারা ঘরে তুলে রাখবেন।

বগুড়া: শহরের বেশিরভাগ ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি তেল না পেয়ে ফিরে গেছেন মোটরসাইকেল চালকরা। ক্ষুব্ধ এসব চালকরা একে কৃত্রিম সংকট বলে দাবি করছেন।  ফিলিং স্টেশন কর্তৃপক্ষ বলছে, বাঘাবাড়ি ডিপো থেকে নিয়মিত তেল সরবরাহ না থাকায় সংকট তৈরি হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে  শহরের কয়েকটি ফিলিং স্টেশন ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।

বগুড়া ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, তেল নেওয়ার জন্য অন্তত ৫০ জন মোটরসাইকেল চালক লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। পাম্প থেকে সীমিত পরিমাণে পেট্রোল সরবরাহ করা হলেও অকটেন বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছিল।

তেল নিতে আসা মোটরসাইকেল চালক কমল বলেন, এভাবে হঠাৎ তেল সরবরাহ বন্ধ করে দিলে সাধারণ মানুষই বিপদে পড়ে। ইরান-আমেরিকা যুদ্ধের খবর শুনছি, আর এই সুযোগে এখানে সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

শাহজাহানপুর উপজেলা থেকে কয়েকটি পাম্প ঘুরে বগুড়া ফিলিং স্টেশনে এসেছিলেন তৌফিকুল আলম। তিনি বলেন, ‍“এক ঘণ্টা ধরে তেলের জন্য ঘুরছি। মাঝিরা টিএমএসএস পাম্পে অনেক ভিড়। তাই এখানে এসেছি। এখান থেকে তেল না পেলে আজ মোটরসাইকেল চালানোই মুশকিল হবে।”

বগুড়া ফিলিং স্টেশনের কর্মচারী হাফিজার জানান, সকালে বাঘাবাড়ি থেকে তেল আনতে গাড়ি পাঠানো হয়েছিল। রাত ৯টার দিকে সেটি ফিরে এসেছে। তিনি বলেন, দুইদিন পর মাত্র এক গাড়ি তেল পেয়েছি। এই তেল শেষ হলে আবার কী হবে, তা বলতে পারছি না।

শহরের হক পাম্প অ্যান্ড কোং, নরিমেক্স ফিলিং স্টেশনসহ অন্তত পাঁচটি ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা গেছে, অনেক জায়গায় তেল সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। এই পাম্পের ক্যাশিয়ার রিমন বলেন, বাঘাবাড়ি থেকে তেল আনার গাড়ি ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেখান থেকে জানানো হয়েছে, রবিবার বা সোমবারের আগে তেল দেওয়া হবে না। ডিপো থেকে হিসাব করে তেল সরবরাহ করা হচ্ছে।

ঢাকা/মাসুদ

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়