খাদ্য নিরাপত্তায় মৌমাছির গুরুত্ব, মৌচাষে সম্ভাবনা ও সংকট
মো. লিখন ইসলাম, বাকৃবি প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম
অধ্যাপক মো. শফিকুল ইসলাম
মৌমাছি শুধু মধু উৎপাদনই করে না, খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক মো. শফিকুল ইসলাম। বিশ্ব মৌমাছি দিবস উপলক্ষে তিনি বাংলাদেশের মৌচাষ শিল্পের সম্ভাবনা, সংকট ও করণীয় নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন।
অধ্যাপক মো. শফিকুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে মধু, মৌমাছির রোগব্যাধি, পরাগায়ন ও মৌচাষ ব্যবস্থাপনা নিয়ে গবেষণা করছেন। বিশ্ব মৌমাছি দিবস উপলক্ষে তিনি বলেন, বাংলাদেশের মধুচাষের ইতিহাস মূলত একটি স্বপ্নের ইতিহাস।
তিনি জানান, একসময় সুন্দরবনসহ বিভিন্ন বনাঞ্চলে মৌয়ালেরা বন্য মৌচাক থেকে ধোঁয়া ব্যবহার করে মধু সংগ্রহ করতেন। তবে আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মৌচাষের সূচনা হয় ১৯৬১ সালে, যখন আকতার হামিদ খান তৎকালীন কুমিল্লা পল্লী উন্নয়ন একাডেমিতে কাঠের বাক্সে মৌমাছি পালন শুরু করেন। সেই উদ্যোগই এখন দেশের সম্ভাবনাময় কৃষিশিল্পে রূপ নিয়েছে।
বিশ্ব মৌমাছি দিবস প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “জাতিসংঘ ২০১৭ সালে ২০ মে তারিখকে বিশ্ব মৌমাছি দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। আধুনিক মৌচাষের পথিকৃৎ আন্তন জানশার জন্মদিন উপলক্ষে দিনটি নির্ধারণ করা হয়। দিবসটির লক্ষ্য মৌমাছি ও অন্যান্য পরাগবাহীর গুরুত্ব সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা তৈরি করা।”
গবেষক জানান, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৮ হাজার মৌচাষি ৭০ হাজারের বেশি মৌবাক্সে বাণিজ্যিকভাবে মধু উৎপাদন করছেন। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) এখন পর্যন্ত ২৫ হাজারের বেশি মৌচাষিকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। বিসিকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ২০২২ সালে ১০ হাজার ৬৫৫ মেট্রিক টন মধু উৎপাদন হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৩০ শতাংশ বেশি। বর্তমানে দেশের মধুর বাজারের আকার প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা।
ড. শফিকুল ইসলাম বলেন, “মৌমাছির গুরুত্ব কেবল মধু উৎপাদনে সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বের প্রায় ৭৫ শতাংশ খাদ্যশস্য এবং ৯০ শতাংশ সপুষ্পক উদ্ভিদের পরাগায়ন মৌমাছি ও অন্যান্য পরাগবাহীর ওপর নির্ভরশীল। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্যমতে, পৃথিবীর খাদ্য উৎপাদনের এক-তৃতীয়াংশ মৌমাছির পরাগায়নের মাধ্যমে সম্ভব হয়।”
বাংলাদেশের কৃষিতেও মৌমাছির অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন তিনি। সরিষা, লিচু, আম, সূর্যমুখীসহ বিভিন্ন ফল ও সবজির ফলন বৃদ্ধিতে মৌমাছি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গবেষণায় দেখা গেছে, সরিষা ক্ষেতে মৌবাক্স স্থাপন করলে ফলন ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ে।
তিনি জানান, বাংলাদেশে বর্তমানে পাঁচটি প্রধান মৌমাছির প্রজাতি দেখা যায়—Apis cerana indica, Apis dorsata, Apis florea, Apis mellifera এবং Trigona spp। এর মধ্যে দেশীয় Apis cerana indica বাংলাদেশের আবহাওয়ার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি উপযোগী। অন্যদিকে Apis mellifera বেশি মধু উৎপাদন করলেও এটি বিদেশি প্রজাতি হওয়ায় ব্যবস্থাপনায় বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
তবে, সম্ভাবনার পাশাপাশি উদ্বেগজনক বাস্তবতাও তুলে ধরেন এই গবেষক। তার মতে, বিশ্বজুড়ে বর্তমানে প্রায় ৩৫ শতাংশ পরাগায়নকারী অমেরুদণ্ডী প্রাণী বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। বাংলাদেশেও অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার, জলবায়ু পরিবর্তন, আবাসস্থল ধ্বংস এবং রোগবালাই মৌমাছির অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলছে।
তিনি জানান, বর্তমানে দেশে ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক’ ধরনের বহু কীটনাশক ব্যবহার হচ্ছে, যা মৌমাছির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। কীটনাশকের কারণে মৌমাছির ঘুমের ব্যাঘাত, আকার ছোট হয়ে যাওয়া এবং পরাগায়নের দক্ষতা কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিচ্ছে। এছাড়া তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও খাদ্যসংকটের ফলে ফুল ও মৌমাছির জীবনচক্রের মধ্যে অসামঞ্জস্য তৈরি হচ্ছে।
মৌমাছির রোগ ও পরজীবী সম্পর্কেও বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন তিনি। তার মতে, ভ্যারোয়া মাইট বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষতিকর মৌমাছির পরজীবী। এটি মৌমাছির শরীর থেকে রস শোষণ করে এবং ভাইরাস সংক্রমণ ঘটায়। এছাড়া আমেরিকান ফাউলব্রুড, ইউরোপীয় ফাউলব্রুড, নোজিমোসিস ও চাকব্রুড রোগ মৌচাষ শিল্পের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে।
ড. শফিকুল ইসলাম বলেন, “বর্তমানে আন্তর্জাতিকভাবে অ্যান্টিবায়োটিকের পরিবর্তে জৈব নিরাপত্তা, জৈব অ্যাসিড ও প্রোবায়োটিকভিত্তিক চিকিৎসা পদ্ধতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশ্বের প্রথম মৌমাছির টিকাও ইতোমধ্যে উদ্ভাবিত হয়েছে।” বাংলাদেশেও সমন্বিত রোগ ব্যবস্থাপনা (আইডিএম) পদ্ধতি চালুর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
মধুর পুষ্টিগুণ ও ভেজাল প্রসঙ্গেও কথা বলেন তিনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মধুতে ৪৫টির বেশি খাদ্য উপাদান রয়েছে। এতে ফ্রুক্টোজ, গ্লুকোজ, ভিটামিন, খনিজ, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও বিভিন্ন এনজাইম থাকায় এটি রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধি, ক্ষত নিরাময়, হজমশক্তি উন্নয়ন এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে।
তবে বাজারে ভেজাল মধুর বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, খাঁটি মধু শনাক্তে উন্নত ল্যাবরেটরি পরীক্ষা জরুরি। আইসোটোপ রেশিও ম্যাস স্পেকট্রোমেট্রি (আইআরএমএস), নিউক্লিয়ার ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স (এনএমআর), গ্যাস ক্রোমাটোগ্রাফি (জিসি) ও ম্যাস স্পেকট্রোমেট্রি (এমএস)-এর মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে মধুর বিশুদ্ধতা নির্ণয় করা হয়। বাংলাদেশে বিএসটিআই এ ধরনের মান নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালন করছে।
“মৌমাছিকে রক্ষা করা মানে শুধু একটি পতঙ্গকে রক্ষা করা নয়; বরং খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি অর্থনীতি এবং মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎকে রক্ষা করা। মৌমাছি বাঁচলে কৃষি বাঁচবে, আর কৃষি বাঁচলে বাঁচবে মানুষ”, এমন মন্তব্যও করেছেন তিনি।
গবেষকের মতে, বাংলাদেশে বছরে এক লাখ টন পর্যন্ত মধু উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। এজন্য মৌমাছিবান্ধব কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, কীটনাশকের ব্যবহার কমানো, ফুল ও গাছের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ এবং গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।
ঢাকা/জান্নাত
এনইসিতে তিন লাখ কোটি টাকার এডিপি অনুমোদন