নাচিয়ে থেকে নায়ক জাভেদ
ইলিয়াস জাভেদ
পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ, নাচিয়ে থেকে নায়ক—ইলিয়াস জাভেদের বর্ণাঢ্য এক অধ্যায় একুশে জানুয়ারি মৃত্যুর মধ্য দিয়ে থমকে গেল। তার প্রস্থানে শোকস্তব্ধ চলচ্চিত্রাঙ্গন। সহকর্মী, বন্ধু ও শুভানুধ্যায়ীদের চোখে তিনি শুধু একজন শিল্পী নন, বরং স্মৃতিময় একটি অধ্যায়, যাকে চোখের জলে শেষ বিদায় জানালেন।
১৯৪৪ সালে ব্রিটিশ ভারতের পেশাওয়ারের রক্ষণশীল একটি মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ইলিয়াস জাভেদ; পরবর্তীতে সপরিবারে পাঞ্জাবে চলে যান। তার বাবা রাজা মুহাম্মদ আফজন ধার্মিক মানুষ ছিলেন। তিনি চাইতেন তার পুত্র ব্যবসা বা চাকরি করুক। কিন্তু জাভেদ নৃত্যে এবং অভিনয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠেন।
১৯৬৩ সালে পাঞ্জাব থেকে পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকায় চলে আসেন জাভেদ। ষাটের দশকে ঢাকায় বাংলা চলচ্চিত্রের পাশাপাশি নিয়মিত উর্দু চলচ্চিত্র নির্মিত হতো। ১৯৬৩ সালের শুরুতে ঢাকাই সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগ না পেয়ে চলচ্চিত্রে নৃত্য পরিচালনার কাজ শুরু করেন জাভেদ। উর্দু ভাষার ‘মালান’ সিনেমায় প্রথমবার নৃত্য পরিচালনা করেন তিনি। কয়েক বছরের বিরতি নিয়ে পুনরায় উর্দু ভাষার ‘পুনম কি রাত’ সিনেমার নৃত্য পরিচালনা করেন এই শিল্পী। পরবর্তীতে শতাধিক চলচ্চিত্রের নৃত্য পরিচালনা করেছেন তিনি।
পর্দায় ইলিয়াস জাভেদ
১৯৬৪ সালে উর্দু ভাষার ‘নয়ি জিন্দেগি’ সিনেমার মাধ্যমে অভিনয় জীবন শুরু করেন জাভেদ। তবে ১৯৬৬ সালে ‘পায়েল’ সিনেমা মুক্তির পর দর্শকমহলে তার জনপ্রিয়তার পারদ বাড়তে থাকে। এই সিনেমায় তার নায়িকা ছিলেন শাবানা। সাবলীল অভিনয়, আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব ও নৃত্যদক্ষতার কারণে খুব দ্রুত সময়ে দর্শকের কাছে প্রিয় হয়ে ওঠেন এই তারকা। তার প্রকৃত নাম রাজা মোহাম্মদ ইলিয়াস। খ্যাতিমান পরিচালক মুস্তাফিজ পর্দায় তার নাম দেন—জাভেদ।
‘মালকা বানু’ সিনেমার পোস্টার
নায়ক হিসেবে প্রায় শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন জাভেদ। তার অসংখ্য সিনেমার মধ্যে ‘দোস্ত দুশমন’, ‘অন্ধ প্রেম’, ‘রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত’ এর জন্য বেশি পরিচিত এই তারকা। তবে তার অভিনয় জীবনের সেরা সাফল্য আসে ‘নিশান’ চলচ্চিত্রের ‘কালু’ চরিত্রের বদৌলতে। তৎকালীন অনেক নায়িকার সঙ্গে জুটি বেঁধে কাজ করেছেন জাভেদ। তার নায়িকাদের তালিকায় ছিলেন—শাবানা, ববিতা, কবরী, অলিভিয়া, অঞ্জু ঘোষ, রোজিনা, নূতন ও সুচরিতা। কিন্তু সেই সময়ে চিত্রনায়িকা অঞ্জু ঘোষের সঙ্গে তার জুটি ছিল সবচেয়ে জনপ্রিয়।
জাভেদ অভিনীত আলোচিত সিনেমার মধ্যে রয়েছে—মালকা বানু, অনেক দিন আগে, শাহজাদী, নিশান, রাজকুমারী চন্দ্রভান, কাজল রেখা, সাহেব বিবি গোলাম, নরম গরম, তিন বাহাদুর, চন্দন দ্বীপের রাজকন্যা, আজো ভুলিনি, চোরের রাজা, জালিম রাজকন্যা প্রভৃতি।
পর্দায় ইলিয়াস জাভেদ
১৯৮৪ সালে মুক্তি পায় ‘চন্দন দ্বীপের রাজকন্যা’ সিনেমা। এ সিনেমায় কাজ করতে গিয়ে চিত্রনায়িকা ডলি চৌধুরীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের জড়ান জাভেদ। ১৯৮৪ সালের ১২ জানুয়ারি প্রিয় মানুষের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। তবে দাম্পত্য জীবনে তাদের কোনো সন্তান নেই। প্রিয় মানুষকে হারিয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন ডলি চৌধুরী। শেষ বিদায়ের মঞ্চে জাভেদকে ‘শিশু ও ফুলের মতো পবিত্র’ বলে মন্তব্য করেন; যা তাদের ৪২ বছরের দাম্পত্য জীবনের শক্ত বন্ধনের কার্যকর সংজ্ঞা।
ঢাকা/শান্ত