Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     সোমবার   ১৪ জুন ২০২১ ||  জ্যৈষ্ঠ ৩১ ১৪২৮ ||  ০২ জিলক্বদ ১৪৪২

আম সমাচার

সালাউদ্দিন আহমেদ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২২:৪৬, ২৫ এপ্রিল ২০২১   আপডেট: ২২:৫৬, ২৫ এপ্রিল ২০২১
আম সমাচার

‘ফাল্গুনে বিকশিত কাঞ্চন ফুল
ডালে ডালে পুঞ্জিত আম্রমুকুল’

এমন মানুষ পাওয়া দুষ্কর যার আম পছন্দ না। মৌসুমি ফল আম, অনেকেরই পছন্দের তালিকার শীর্ষে।  ফলের রাজা আম রাজকীয় ফল।  আম নিয়ে ‘আম’ জনতার আগ্রহের শেষ নেই। আম এমন একটি ফল যা গুটি থেকে শুরু করে পাকা আমের আমসস্ত্ব পর্যন্ত সব অবস্থায় খাওয়া যায়।  এছাড়াও জ্যাম, জেলি, আঁচার, আমসত্ব, জুস, আম-দুধ ইত্যাদি তৈরি করেও আম খাওয়া যায়।

আমাদের শৈশব কেটেছে আম নিয়েই।  আমের গুটি শুরু হওয়া থেকে আম পাকা পর্যন্ত, প্যান্টের পকেটে সবসময়ই চাকু বা ঝিনুক এবং মরিচ, লবন আর মশলা থাকতো।  ঝড়ের দিনে আম কুড়ানো অথবা চুপিচুপি গাছে থেকে আম পারা ছিল নির্মল আনন্দ।  আমের আঁটি থেকে বানানো ভেঁপু ছিল শৈশবের প্রিয় খেলনা।

বসন্তের শেষে গাছে আমের মুকুল আসে। অপূর্ব ঘ্রান আর গাছে মুকুলের সৌন্দর্য অসাধারণ।  দেখতে দেখতে মুকুল থেকে গুটি হয়, বড় হয়, পাক ধরে আশ্বিন মাস পর্যন্ত। আমের মতো আকর্ষণীয় ফল পৃথিবীতে নেই। আম সবাইকে কাছে টানে।  গাছে ঝুলে থাকা কাঁচা কিংবা পাকা আম সবাইকে আকৃষ্ট করে।

আমের জনপ্রিয়তা সবসময়ই তুঙ্গে। বাংলাদেশের প্রায় সর্বত্রই আমের ফলন হলেও রাজশাহীর আমের সুনাম অনেক। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের আমের সুনাম ছড়িয়ে পড়ছে।  রপ্তানি তালিকায় নতুন যুক্ত হওয়া বাংলাদেশের কৃষিজ পণ্য আম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে নতুন আশার পথ উন্মোচন করেছে। বাংলাদেশ বিশ্বের সপ্তম আম উৎপাদনকারী দেশ। 

ভারত, পাকিস্তান ও ফিলিপাইনের জাতীয় ফল এটি। বাংলাদেশে ধান ও পাটের পর আম চাষকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।  বিজ্ঞানীদের মধ্যে আমের জন্মস্থান নিয়ে মতবিরোধ আছে।  একদল বিশেষজ্ঞের মতে আমের জন্মভূমি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় হিমালয়সংলগ্ন এলাকা, মিয়ানমার, বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম ও মালয়ে।  অন্যদলের মতে, ফলটি এসেছে চায়না থেকে।  অর্থাৎ ভিয়েতনাম, চীন, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, লাওস ও ইন্দোনেশিয়া অঞ্চল।

আম ছিল পাহাড়ি ও বুনো ফল। সেখান থেকে সুমিষ্ট জাতগুলো সংগ্রহ করে বাড়ির আঙিনায় রোপণ শুরু করে মানুষ। এভাবেই এটির চাষাবাদের সূচনা ও উৎপাদন ৬ হাজার বছর আগে থেকে হচ্ছে।  তবে আমের উৎপত্তি নিয়ে কিছু লোককথা আছে। যেমন ভারতীয় প্রাচীন উপাখ্যান মতে, এটি এসেছে স্বর্গ থেকে।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, দেশে বর্তমানে আম চাষ হয় প্রায় এক লাখ হেক্টর জমিতে। আমের উৎপাদন কমবেশি ১৪ লাখ টন। উৎপাদিত আমের বাজারমূল্য প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা। রাজশাহীকে আমের রাজধানী বলা হয়। আম উৎপাদনকারী জেলাগুলোর মধ্যে শীর্ষে অবস্থানকারী চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রায় ২৫ হাজার হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়। পরের অবস্থানটি রাজশাহীতে ১৬ হাজার ৫১৯ হেক্টর।  এই কারণে দুই জেলাকে দেশের বাণিজ্যিক আম চাষের আদি ভূমি বলা হয়। তবে আশির দশক থেকে চুয়াডাঙ্গা, সাতক্ষীরা, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, নড়াইলেও বাণিজ্যিকভাবে আম চাষ বিস্তার লাভ করে।  গত কয়েক বছরে পার্বত্য চট্টগ্রামেও আম চাষ দ্রুত বিকশিত হচ্ছে।

উৎপাদনের দিক থেকে রাজশাহী প্রথম কিন্তু স্বাদের দিক থেকে মেহেরপুর জেলার আম প্রথম।  এই অঞ্চলের আমের স্বাদ অন্যান্য অঞ্চলের থেকে কয়েকগুণ বেশি হওয়ার কারণে মেহেরপুরের আম সেরা।  কথায় আছে, ‘এই জেলার আম যে খেয়েছে তার মুখে লেগে থাকবে’।  মেহেরপুর মাটির গুনগত মান অনেক ভালো হওয়ার কারণেই আম অনেক সুমিষ্ট ও মজাদার হয়।

বাংলাদেশের ইতিহাস ও স্বাধীনতার অনুভূতির সঙ্গেও আম ও আমগাছ জড়িয়ে আছে। ১৭৫৭ সালে পলাশীর আম্রকাননে ব্রিটিশদের হাতে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের বেদনাময় ইতিহাস।  ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় মেহেরপুরের মুজিবনগরে তৎকালীন বৈদ্যনাথ তলার আম্রকাননে বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সরকারের শপথ। বাংলাদেশের প্রথম রাজধানী মেহেরপুর জেলার মুজিবনগর আম্রকাননের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সার্বভৌমত্ব জড়িয়ে আছে।

আমাদের জাতীয় সংগীতেও আমের কথা উল্লেখ আছে-
‘ও মা ফাগুনে তোর আমের বনে, ঘ্রাণে পাগল করে...’।

এখানে আমগাছের উপস্থিতি দেশপ্রেমের অনুষঙ্গ হিসেবে ধরা হয়েছে।

প্রতিবছরই মধু মাসে মৌসুমি ফলের বাজারে আম রাজত্ব করে। আম, জাম, লিচু ও কাঁঠালের মধ্যে উৎপাদন, বাজারমূল্য ও জনপ্রিয়তার দিক দিয়ে এগিয়ে আছে আম। জাতীয় ফল কাঁঠাল হলেও আম-ই বেশি জনপ্রিয়। রাজকীয় ফল আম পুষ্টিগুণের পাশাপাশি লাভজনক অর্থকরী ফসল হিসেবেও জাতীয় অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের হিসাবে, বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ৮০০ জাতের আম চাষের সন্ধান পাওয়া গেছে। এর বাইরে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা ১১টি ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা ২১টি আমের জাত উদ্ভাবন করেছেন। আমের আদি প্রজাতি ছাড়াও বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত বেশ কিছু জাতের আম ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

লেখক : স্বত্বাধিকারী, বিডিম্যানগ্রোভ ডটকম

ঢাকা/সিনথিয়া

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়