ঢাকা, শনিবার, ২৭ আষাঢ় ১৪২৭, ১১ জুলাই ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

সেমাইয়ের সুলুকসন্ধান

ফরহাদ খান : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৫-২৬ ৯:৪৮:৫২ এএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৫-২৬ ৬:৫২:১২ পিএম

মুসলমানদের সামাজিক আনন্দ বা খুশি দুই ঈদকে ঘিরে। এক হলো ঈদ-উল-ফিতর আর অন্যটা ঈদুজ্জোহা বা ঈদ-উল-আজহা। আরবি ভাষায় দুই ঈদের নাম যাই হোক না কেন, সাধারণ বাঙালি মুসলমানদের মুখে দুই ঈদের ভিন্নরকম দুই নাম। একটা রোজার ঈদ বা সেমাইয়ের ঈদ। অন্যটা বকরির ঈদ–উচ্চারণের দ্রুততায় হয়ে যায়–বকরিদ। হাল আমলে অবশ্য এই ঈদকে বলা হয় কুরবানির ঈদ।

একটি আরবি শব্দের নানা অর্থ হয়। আমরা ঈদ বলতে এখন বুঝি আনন্দ বা উৎসব। আরবি ‘ঈদ’ শব্দের অর্থ কিন্তু এর কোনোটাই নয়। ঈদ মানে হলো মূলতঃ ‘ফিরে ফিরে আসা’। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের একটি গান বিটিভি’র কল্যাণে অসম্ভব জনপ্রিয় হয়েছে। এখন দেখি সব চ্যানেলেই গানটি গীত হয় রোজার ঈদের চাঁদ দেখা গেলেই। নজরুলের গানে আছে ‘…এলো খুশির ঈদ’। এ কথা সবাই জানেন, তিনি আরবি জানতেন, ফারসি জানতেন; উর্দু-হিন্দি তো কথাই নেই! তাই তাঁর কলমে এসেছিল— খুশির ঈদ। ঈদের বাংলা ‘খুশি’ হলে তিনি কি ‘খুশির ঈদ লিখেতেন?’

রোজার ঈদ বা বকরিদ দুই ঈদেই সেমাই চলে। এই বকরিদ সম্পর্কে একটা কথা বলে নিই। বাংলা ছাগলের আরবি হলো ‘বকর’। বাংলায় এই ‘বকর’ শব্দটাই হয়ে যায় বকরি। শুনতে কী রকম যেন লাগে বলে অনেকে আবার শব্দটাকে বলেন ‘বকরা’ এবং সেই সুবাদে একটু ভদ্র ভাষায় বলেন ‘বকরা ঈদ’। তবে, ব্যাপারটার মধ্যে খানিকটা রহস্য-রহস্য ভাব রয়েছে! লিঙ্গভেদে ছাগলের দুই শ্রেণি— পাঁঠা আর পাঁঠি। পাঁঠি বড়ো হয়ে বেশ কয়েকবার বাচ্চা দেওয়ার পর ধাড়ি ও বকরি দুই নামে পরিচিত হয়। বিত্তবান বাঙালি মুসলমান বকরি কখনো কুরবানি দেয় না। কুরবানি দেয় খাসি। পাঁঠা পাঁঠাই থেকে যায়, নইলে খাসি হতে হয়। তাকে বকরা নামে ডাকার কোনো অবকাশ তৈরি হয় না। ছিন্নমুষ্ক পাঁঠার ‘খাসি’ নামটা কিন্তু আরবি। বকরি কুরবানি দেওয়া হয় না- তবু ঈদটার নাম সাধারণ বাঙালি মুসলমানের মুখে কেন বকরি বা বকরা ঈদ হয়ে গেলো তার উত্তর পাওয়া মুশকিল।

উত্তর পাওয়া যায় না সেমাইয়ের ঈদের বেলাতেও। সেমাই কি আরবি শব্দ? মোটেও না। সেমাই কি বিশুদ্ধ মুসলমানি খাবার? তাও না। তারপর কিন্তু সেমাই ছাড়া বাঙালি মুসলমানের ঈদ কল্পনা করা যায় না। সেমাইয়ের সঙ্গে এই সম্পর্ক কীভাবে স্থাপিত হলো তার হদিস পাওয়া দুষ্কর। ইতিহাস বইতে বাঙালির সামাজিক-সাংস্কৃতিক যে ছিটেফোঁটা বর্ণনা পাওয়া যায় তাতে অনেক খাদ্যের উল্লেখ থাকলেও সেমাইয়ের কোনো কথা নেই। খিচুড়ির কথা বরং সবিস্তারে আছে। নবাব আলিবর্দ্দী খাঁর নিজেদের খাদ্য পরিকল্পনায় খিচুড়ির গুরত্বপূর্ণ ও উপভোগ্য অবস্থান ছিলো।

মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যেও বেশ কিছু খাবারের নাম পাওয়া যায়। কিন্তু সেমাইয়ের কথা কোথাও নেই। হিন্দু কবিদের রচনাতে তো নেই-ই, মুসলমান কবির রচনাতেও নেই। সেমাইয়ের দেখা পাওয়া যায় না মোগলদের রন্ধনশালাতেও। অর্থাৎ সেমাই মোগলাই খানার মধ্যে পড়ে না। অথচ, সম্রাট বাবর এসেছিলেন যে আফগানিস্তান থেকে সেই আফগানিস্তানে এখনো সেমাই চলে, তবে ভিন্ন নামে। আগেও নিশ্চয় চলতো। সেখানে সেমাইকে বলে ‘সেমিরা’।

বাঙালি হিন্দুর রসুইঘরে সেমাইয়ের ঠাঁই নেই। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে সেমাই শুধুই মুসলমানদের মিষ্টান্ন। এটা সাংঘাতিক রহস্যময় ঘটনা।

কিছু শব্দ নিয়ে বাঙালি হিন্দু ও মুসলমানের বেশ একটা মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা রয়েছে। ভারতবর্ষের তামাম হিন্দু ‘পানি’ বললেও বাঙালি হিন্দু পানিকে বলে ‘জল’। তেমনি বাঙালি মুসলমান পানিকে কোনোদিন ‘জল’ বলবে না। অথচ, জল ও পানি দুটোই সংস্কৃত ভাষাগত শব্দ। এই সংকট রয়েছে ‘বাবা’ শব্দের বেলাতেও। বাবা তুর্কি শব্দ। অথচ বাঙালি হিন্দুর মুখে বাবা শব্দটিই চলে। বাঙালি মুসলমান শব্দটি এড়িয়ে চলে। গ্রামের মানুষের মুখে বেশি চলা বাপজান শব্দটার বাপ—সংস্কৃতজাত আর জান শব্দটা আরবি।

এ ধরনের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতার কারণে হয়তো সেমাই বাঙালি হিন্দুর হেঁশেল ঘরে ঠাঁই পায়নি। মুসলমানের সুজির হালুয়া, প্রচুর ঘি সহযোগে হিন্দু বাড়িতে হয়ে যায় সুজির মোহনভোগ। সেমাইয়ের ব্যাপারে এমন ঘটনা অবশ্য ঘটেনি। তবে ভারতের অন্যান্য জায়গায় চিত্রটা ভিন্নরকম। উত্তর ভারতে হিন্দুদের দেওয়ালি উৎসবে সেমাইয়ের একটা বড়ো জায়গা রয়েছে খাদ্য তালিকায়। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে সেমাইয়ের ভিন্ন ভিন্ন নাম। হিন্দি-উর্দু সেমিয়াঁ। পাঞ্চাবিতে সেভিয়া। মারাঠিতে বলে সেভাইয়া। গুজরাটিতে সেই। তামিল-তেলেগুতে সেমিয়া।

অঞ্চলভেদে ভারতের সেমাই রান্নার প্রকরণ দুই রকম। এক হলো নামকিন সেমিয়া অর্থাৎ তা নোনতা স্বাদের। অন্যটা হলো সেভিয়া ক্ষির বা দুধ সেমাই। নামকিন সেমিয়া নিয়ে আমার কোনো কথা নেই। কথা বলতে গেলে নুডল্‌স, স্প্যাগেটি, চাওমিন ইত্যাদি খাদ্য চলে আসবে। আমার কথার বিষয় খাওয়া শেষে মুখ মিষ্টি করার মিষ্টান্ন নিয়ে। মিষ্টান্ন হিসেবে সেমাইয়ের ব্যাপারটা কিন্তু বহুজাতিক। মিষ্টি স্বাদ ও চেহারার সেমাই পাওয়া যাবে গ্রিসে; নাম কাতাইফি। বাংলাদেশে ঘি দিয়ে ভেজে যে দমের সেমাই তৈরি হয়, প্রায় সেরকমই সেমাইয়ের দেখা পাওয়া যাবে আফ্রিকার সোমালিয়াতে; নাম কাদ্রিয়াদ।

সুশীল পাঠক, জনান্তিকে একটা কথা বলে রাখি। ওপরের দেশ-বিদেশে প্রচলিত সেমাইয়ের যে সব নামের উল্লেখ করেছি— তা সবটাই পরের ধনে পোদ্দারি। ভুলচুক কিছু ধরা পড়লে— উপেক্ষা করে যাবেন। তো, পোদ্দারি শেষ হয়নি এখনো। এবার আসছি আরব বিশ্বে। সৌদি আরবে সেমাইয়ের মতো ময়দার তার দিয়ে অনেক রকম মিষ্টি পদ তৈরি হয়। কোনোটা চৌকো। কোনোটা ত্রিভুজাকৃতির। অর্থাৎ আলগা সেমাই নয়, প্রায় সবগুলোই নানা ছাঁচের জমাট বাঁধা। পেস্তা, বাদাম, আখরোট ইত্যাদিসহ প্রচুর ক্রিমে ভরা পুরু সে সব টুকরো। আরবিতে এর নাম কানাফা। আমাদের দেশের দুধ-সেমাইয়ের মতো কানাফাও তৈরি হয়। তবে তা বেশ পাতলা।

লিবিয়া, মরোক্কো, তিউনিসিয়ার কানাফা দেখতে আমাদের শন পাপড়ির মতো জমাট— চৌকো ছাঁচে কাটা। শুনেছি, সব রকমের কানাফাই নাকি খেতে ভালো। বেশ মজাদার। এ লেখা যেহেতু কোনো গবেষণা প্রবন্ধ নয়, তাই বাংলাদেশের বাইরের সেমাই জাতীয় মিষ্টান্নের নিখুঁত কোনো বর্ণনা খুঁজতে গেলে নিরাশ হবেন— সে কথা আগেই বলে রাখছি। সেমাই জাতীয় মিষ্টান্ন পাওয়া যাবে ইরান ও তুরস্কেও।

প্রচলিত বাংলা অভিধানে সেমাই শব্দটাকে কোথাও বলা হয়েছে হিন্দি, কোথাও দেশি। তবে ভাষাতত্ত্বের পণ্ডিত সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় বলেছেন গ্রিক শব্দ সেমিদালিস থেকে বাংলা সেমাই শব্দের উৎপত্তি। আমরা যে সেমাই খাই তার রন্ধন-প্রণালী ও স্বাদ গ্রিস না অন্য কোনো দেশের— তার সুলুকসন্ধান কেউ দিতে পারেননি। তাই অনেক পণ্ডিত আবার সেমাই শব্দের উৎস সন্ধানে অন্য পথ ধরেছেন।

তাঁদের মতে সেমিদালিস থেকে সেমাই হওয়ার ব্যাপারটা সরাসরি ঘটেনি। তাঁদের মতে, সেমিদালিস শব্দের মূল অর্থ ময়দা। ময়দা অবশ্য ফরাসি শব্দ। ময়দার সংস্কৃত প্রতিশব্দ সমিদা। সেমিদালিস শব্দ সংস্কৃত ভাষায় প্রবেশ করে সমিদা রূপ ধারণ করে। বলাবহুল্য, এই সমিদা থেকেই তৈরি হয় বাংলা সেমাইসহ অন্যান্য শব্দ।

আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণের মধ্য দিয়ে গ্রিসের সঙ্গে ভারতের সরাসরি পরিচয়। আগে অবশ্য পরিচয় ছিল। সেই সময়ে খাদ্যদ্রব্য হিসেবে সেমিদালিস বা ময়দার সঙ্গে ভারতীয়দের পরিচয় ঘটা বিচিত্র কোনো ঘটনা নয়। আর সেমিদালিসের সমিদা হওয়া এবং সমিদা থেকে সেমাই হওয়া ভাষাতত্ত্বে নতুন কোনও ঘটনাও নয়।

বাঙালি মুসলমান ঈদের দিনে অবশ্যই সেমাই খায়। ভারতের অন্যান্য রাজ্যের মুসলমানরাও সেমাই মুখে দেয় ঈদের দিনে। পাকিস্তানেও সেমাই বাদ যায় না রোজার ঈদে। মজার ব্যাপার, ভারতের অনেক রাজ্যে হিন্দুদের পালা পার্বণেও সেমাই খাওয়ার রেওয়াজ রয়েছে— এক পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া। সেমাই কি তবে উৎসবের মিষ্টান্ন হিসেবে চালু হয়েছিল এই ভারতবর্ষে? এর উত্তর আমার জানা নেই। তাছাড়া সেমাই নিয়ে আমি তো আর গবেষণায় নামিনি। তাই জানার দায়ও আমার নেই। সেমাই নিয়ে আমার শুধু কথা, সেমাইকে ভালোবেসে।

এই উপমহাদেশে সেমাইয়ের ইংরেজি নাম দেয়া যায়— ভারমিসেলি। শব্দটা ইতালীয় ‘ভারমিচেল্লি’ শব্দের ইংরেজি রূপ। রন্ধনপ্রণালী ও স্বাদের দিক থেকে সেমাইয়ের সঙ্গে ভারমিচেল্লি বা ভারমিসেলির কোনো সম্পর্ক নেই। মিল যেটুকু তা শুধু চেহারায়।

বাংলাদেশে এখন প্যাকেটজাত সেমাইয়ের ছড়াছড়ি। মেশিনে বানানো এই সেমাই বাহারি সব প্যাকেটে পাওয়া যায়। মজার এক কথা বলি, এই যে প্যাকেটজাত কিংবা বোতলজাত ইত্যাদি শব্দের যে ‘জাত’— তার অর্থ হলো রক্ষিত, সঞ্চিত ইত্যাদি। প্যাকেটজাত মানে প্যাকেটে রক্ষিত। শব্দটা আরবি থেকে আসা। শব্দের জাত চেনা সত্যিই মুশকিল। কারণ, এই জাত শব্দটার আবার বাংলা অর্থ সম্পূর্ণ আলাদা।

৭০-৭৫ বছর আগে সুদূর মফঃস্বল বা গ্রামে প্যাকেটজাত রেডিমডে সেমাই পাওয়া যেতো না। শহরে পাওয়া যেতো কিনা জানি না। ঈদের বেশ ক’দিন আগে থেকেই গ্রামের মহিলাদের হাতে তখন তৈরি হতো আদি অকৃত্রিম ঈদের সেমাই। বাড়িতে বাড়িতে সেমাই তৈরির ধুম পড়ে যেতো। মা-খালা-চাচি-ফুপিরা মাটির কলসি উপুড় করে হাতের অপূর্ব সৃজন ক্ষমতা ও দক্ষতায় আটা-ময়দার লেই ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নতুন কেনা কুলোয় নামাতেন নরম সুতো। ক্রমাগত সুতো নেমে তৈরি হতো সেমাইয়ের স্তূপ। মায়ের মুখ থেকে শুনেছি, ময়দার সঙ্গে খানিকটা আটা না মেশালে সেমাইয়ের সুতো নাকি নামানো যেতো না। সুতোর ছোট ছোট স্তূপ। পাশাপাশি একটার পর একটা। দেখতে দেখতে কুলো ভরে যেতো। মাকে দেখতাম উঠোনের মাঝখানে হাই টুলে সেই কুলো শুকোতে দিয়েছেন। গ্রামের মানুষ উঁচু টুলকে বলতেন ‘হাইটুল’।

আমাদের পাড়ার এক বাড়িতে একটা সেমাই কলও ছিল। পিতলের তৈরি। তার নামানোর তিনটা ছাঁচ ছিল সেই কলে— মোটা, মাঝারি, মিহি। সেমাইয়ের হাতল ঘোরানোর ব্যাপারটা বেশ শ্রমসাধ্য ছিল। দায়িত্বটা পড়তো বালকদের ওপর। যতোদূর মনে পড়ে— বিষয়টা তাদের কাছে নিরানন্দের ছিল না।

সেমাই দুই প্রকারের। তার সেমাই আর লাচ্ছা সেমাই। লাচ্ছা সেমাই ছোটবেলায় দেখিনি। দেখেছি বড় হয়ে; তা-ও বেশ বড় হওয়ার পর। মিষ্টি হলেও এ সেমাইয়ের আকৃতি, রন্ধনপ্রণালী ও স্বাদ সবই আলাদা। তবু এটার নাম সেমাই হলো কেন— মাথায় ঢোকে না। লাচ্ছা সেমাই আগে পাওয়া যেতো ঘিয়ে ভাজা। এখন পাওয়া যায় ঘি নামের এক রাসায়নিকে ভাজা অবস্থায়। কার লেখায় যেন লাখনৌ শহরের লাচ্ছা পরোটার সুনাম শুনেছি। লেখকের নাম মনে পড়ে না। লাচ্ছা সেমাইটাও কি ওই শহরের? কে জানে? কোনো সদুত্তর খুঁজে পাইনি।  লাচ্ছা পরোটা এখন ঢাকাতেও পাওয়া যায়। খেয়ে তেমন আহ্লাদিত হতে পারিনি। মনে হয়েছে, এর চেয়ে ঢাকাইয়া পরোটা ঢের ভালো।

লাচ্ছা শব্দটা হিন্দি। অর্থ হলো সুতোর গুছি। অনেকের মতে সুতোর গুছি পড়ে থাকলে যে রকম দেখায়, লাচ্ছা সেমাইও দেখায় সে-রকম। তাই এই নাম। হতেও পারে। অনেকে আবার বলেন, আরবি ‘লজ্জতদার’ ঢাকাইয়া ভাষায় হয়ে যায় ‘লচ্ছেদার’। আর সেই লচ্ছেদার থেকেই লাচ্ছা সেমাই-এর উদ্ভব। এরকম যদি হয়, তা হলে তো বলতে হয়— লাচ্ছা সেমাই-এর ঢাকা শহরেই প্রথম আবির্ভাব। এ সব কথা শুনে মাথার মধ্যে কেমন জট পাকিয়ে যায়। আর হ্যাঁ! আরবি লজ্জতদার শব্দের অর্থ হলো— সুস্বাদু। আরেকটা কথা, বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় সেমাইয়ের ভিন্ন ভিন্ন নাম— সেমুই, সিমুই, সিউঁই, সেঁই। আরও নাম হয়তো থাকতে পারে। আমার জানা নেই। সত্যজিৎ রায়ের ‘হীরক রাজার দেশে’র একটা কথা— ‘জানার কোনো শেষ নাই, জানার চেষ্টা বৃথা তাই।’ উদ্ধৃতিতে ভুলও হতে পারে। বয়স তো পঁচাত্তর পেরিয়েছে!

বার্ধক্য নাকি দ্বিতীয় শৈশব। গ্রামের মানুষ আমি। এখনো ফিরে যাই প্রথম শৈশবে। দেখি উঠোনে হাইটুলের ওপর মা কী পরম আদরে তাঁর হাতে তৈরি সেমাই শুকাচ্ছেন। মাথার ওপর রোদ। খেয়াল নেই। এই দ্বিতীয় শৈশবেও তাঁর হাতের সেমাই খেতে ইচ্ছে করে। কতোদিন যাইনি গ্রামের বাড়িতে। চোখে তেমন দেখি না, তবু দেখতে পাই— মা দাঁড়িয়ে আছেন উঠোনে। চোখে অন্ধকার নেমে আসে।

সেমাই নিয়ে আমার কথাটি ফুরোলো।

 

ঢাকা/তারা