মহিলাটার সঙ্গে মেয়েটার যে কথা হয়েছে
রণজিৎ সরকার || রাইজিংবিডি.কম
রণজিৎ সরকার : মিরপুর এক নম্বর থেকে নিউ ভিশন গাড়িতে উঠেছি। সিটে বসে আছি। আমার সামনের সিটে একটা মহিলা বসে আছেন। আনসার ক্যাম্প থেকে একটা মেয়ে উঠল। মেয়েটা বসল মহিলাটার পাশে।
মেয়েটা বসার কিছুক্ষণ পর মহিলাকে বলল, ‘আপা, আপনি কি জব করেন?’
মহিলাটা বললেন, ‘হ্যাঁ, জব করি। জব না করেল কি এত সকালে বের হতাম?’
মেয়েটা বলল, ‘ও, আচ্ছা বুঝতে পেরেছি।’
মহিলাটা বললেন, ‘তোমাকে, তুমি করে বলি?’
‘হ্যাঁ, বলেন। আমি তো আপনার চেয়ে বয়সে ছোট।’
‘তুমি, কি করো?’
‘আমি পড়ালেখা করি। ভার্সিটিতে যাচ্ছি।’
‘কোন ভার্সিটিতে পড়?’
‘নর্দান ইউনিভার্সিটিতে।’
‘কোন ক্যাম্পাসে?’
‘ফার্মগেট।’
‘তাহলে তো তুমি ফার্মগেট নামবে।’
‘হ্যাঁ।’
পেছনের সিটে বসে মহিলা আর মেয়েটার কথাগুলো আমি খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছি। এর মধ্যে মেয়েটার মোবাইল ফোনে কল এল। মেয়েটা কল রিসিভ করে বলল, ‘আমি গাড়িতে, পরে কথা বলি। একটু থেমে আবার বলল, ভার্সিটিতে এসে তোমার সব কথা শুনব।’ এই বলে মেয়েটা মোবাইল ফোন রেখে দিল। তারপর বলল, ‘আপা, কিছু ব্যক্তিগত প্রশ্ন করি।’
মহিলাটা মাথা নড়াতে নড়াতে বললেন, ‘করো?’
‘অনুমতি দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ আপনাকে?’
‘ধন্যবাদ দেওয়ার কি আছে। তুমি কি জানতে চাও? বলো?’
‘আপা, আপনার স্বামী কি করেন?’
‘জব করে।’
‘কী জব করেন, পদবি কি?’
‘করপোরেট হাউজে ভালো একটা পদে আছে।’
‘ও, আচ্ছা, আপনার স্বামীর নাম কি?’
‘নাম শুনে কি করবে?’
‘বলেন না, শুনি।’
‘নাম সজল’
‘দেশের বাড়ি কোথায়?’
‘নেয়াখালী।’
‘আপনার?’
‘বাগেরহাট।’
‘আপনার স্বামীর ভাই বোন কজন?’
‘পাঁচজন। তিন ভাই, দুই বোন।’
‘ভাইয়েরা কী করেন? বোনদের কি বিয়ে হয়েছে?’
‘হ্যাঁ, হয়েছে।’
‘বোনদের কজন সন্তান। সে সন্তানেরা কী করে?’
‘দেশের বাইরে থাকেন। পড়ালেখা করে।’
‘আচ্ছা, আপনার স্বামীর পদন্নতির সম্ভবনা আছে কি না?’
‘কেন?’
‘আপনার ভবিষ্যতের জন্য।’
‘ও।’
‘আপনার স্বামীর স্বাস্থ্য ভালো না খারাপ?’
‘ খুব ভালো।’
‘আপনার স্বামী কী পছন্দ করেন?’
মহিলাটা শেষ প্রশ্ন শোনার পর চুপ করলেন। জানালার দিকে তাকাল। বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো দেখেছে অপলক দৃষ্টিতে। কিন্তু প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে না। মেয়েটা একটু অবাক হয়ে বলল, ‘আপা, ও আপা, কি হলো আপনার?’
মেয়েটার প্রশ্নগুলো শুনে আমি অবাক হচ্ছি। কারণ সে শুধু মহিলার স্বামী সম্পর্কে জানতে চাচ্ছে। বিষয় কী? এই মহিলার স্বামীর প্রতি তার এত কৌতূহল কেন?
মহিলাটা জানালার দিকে থেকে মুখ সরিয়ে নিলেন। তারপর মন ভার করে মেয়েটার দিকে তাকালেন। কথা বলছেন না। মেয়েটা বলল, ‘আপা, হঠাৎ আপনার মন খারাপ হয়ে গেল কেন?’
মহিলাটা বললেন, ‘তোমাকে একটা কথা বলতে চাই আমি।’
‘বলেন।’
‘তুমি কি বিবাহিত?’
‘কেন আপা?’
‘জানতে চাচ্ছি, দরকার আছে।’
‘আমি অবিবাহিত।’
মহিলাটা মাথায় হাত রাখল। চুলগুলো নাড়তে নাড়তে বলল, ‘না, থাক। তোমাকে কথাটা বলা যাবে না।’
‘আপা, কী এমন কথা, লুকাচ্ছেন কেন? আমাকে বলবেন না? কারণ কী?’
আমিও অবাক হচ্ছি। হঠাৎ মহিলাটার মন খারাপ হলো কেন? আবার অবিবাহিত মেয়েটা অবিবাহিত হওয়ায় তিনি তার কাছে কী কথা লুকাচ্ছেন। যদি বলতেন, তাহলে আমিও শুনতে পারতাম কথাগুলো। গাড়ি শ্যামলীতে এল। শ্যামলী থেকে বেশ কিছু ছাত্রী দৌড়ে উঠল। আমার পাশে এক লোক এসে বসল।
মেয়েটা আবার বলল, ‘আপা, আমার কোন কথায় আপনি মন খারাপ হয়েছে?’
মহিলাটা এবার বললেন, ‘তোমার শেষ প্রশ্নটা শোনার পর আমার মন খারাপ হয়েছে।’
‘কেন, কেন আপা?’
‘কারণ তো অবশ্যই আছে।’
‘কী কারণ আপা? আমাকে বললেন?’
‘তোমাকে কথাটা বলব কি বলব না, সে কথাটাই ভাবছি।’
আমিও ভাবছি, মহিলাটা কথাটা বলুক। কথাগুলো যদি গুরুত্বপূর্ণ হয়। বাস্তবজীবনে কোনো কাজে লাগে আমার। অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছি আমি।
মেয়েটা বলল, ‘আপা, কথাটা কি বলবেন না?’
মহিলাটা বললেন, ‘কথাটা বলতে পারি। তবে, বলার পর আর কোনো প্রশ্ন করতে পারবে না আমাকে।’
মেয়েটা বলল, ‘ঠিক আছে আপা, প্রশ্ন করব না, তবু বলেন।’
মহিলাটা ধীরে ধীরে বললেন, ‘আমার স্বামী ছিল, সে বউ পরিবর্তন করতে পছন্দ করে।’
মেয়েটা অবাক হলো। হা করে ফেলে কিছু বলতে চাইল। কিন্তু বলতে পারল না। মহিলাটার দিকে তাকাল। আমি অবাক হলাম। ভাবছি, মহিলাটার স্বামী কতগুলো যে বিয়ে করেছেন! মহিলার কাছে থেকে তার স্বামী সম্পর্কে জানতে ইচ্ছা করল আমার। যদি মহিলাটার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়, তাহলে তার স্বামী সম্পর্কে জানতে চাইব।
একটু পর মহিলাটা মেয়েটাকে বললেন, ‘আচ্ছা, তুমি আমাকে এত প্রশ্ন করলে কেন? তোমার কোনো উদ্দেশ্য আছে?’
মেয়েটা হাসে। কিছু বলে না।
মহিলাটা বললেন, ‘সামনে কি তোমার শুভদিন।’
মেয়েটা মুচকি হাসল। তারপর বলল, ‘হ্যাঁ, আপনার অভিজ্ঞতা জানার জন্যই এত প্রশ্ন করেছিলাম।’
গাড়ি ফার্মগেটে এলো। গাড়ি থেকে নেমে গেল মেয়েটা।
রাইজিংবিডি/ঢাকা/২ সেপ্টেম্বর ২০১৫/সনি
রাইজিংবিডি.কম
আরব আমিরাতে স্প্লিন্টারের আঘাতে বাংলাদেশি নিহত