খুলনা অঞ্চলে তরমুজের বাম্পার ফলন, ৭২৩ কোটি টাকা বিক্রির লক্ষ্য
নিজস্ব প্রতিবেদক, খুলনা || রাইজিংবিডি.কম
খুলনা অঞ্চলে এবার তরমুজের বাম্পার ফলন হয়েছে। তরমুজ চাষের লক্ষ্যমাত্রা শতভাগ পূরণ না হলেও এ মৌসুমে প্রায় ৪১৩ কোটি ৪৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা লাভের আশা করা হচ্ছে। খুলনা বিভাগের চার জেলায় এবার তরমুজ বিক্রির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৭২৩ কোটি ৫৬ লাখ ২০ হাজার টাকা। বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে এই লক্ষ্য পূরণ হবে বলে কৃষি বিভাগ ও কৃষকরা আশা করছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, চলতি ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের রবি মৌসুমে খুলনা বিভাগের খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও নড়াইল জেলায় ১৮ হাজার ৫৫ হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে, চাষ হয়েছে ১৩ হাজার ৮১০ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে খুলনা জেলায় ১৭ হাজার ২৯১ হেক্টর লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ১৩ হাজার ১৫৬ হেক্টর জমিতে, বাগেরহাট জেলায় ১৩৩ হেক্টর লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ১৬৪ হেক্টর জমিতে, সাতক্ষীরা জেলায় ৬১৮ হেক্টর লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৪৭১ হেক্টর জমিতে এবং নড়াইল জেলায় ১৩ হেক্টর লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ১৯ হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ হয়েছে।
কৃষকরা জানিয়েছেন, প্রতি বিঘা জমিতে ৭০০-৮০০টি তরমুজ উৎপাদন হয়েছে। বিঘা প্রতি উৎপাদন খরচ হয়েছে ৩০ হাজার টাকা করে। প্রতি বিঘা জমির তরমুজ বিক্রির লক্ষ্য ৭০ হাজার টাকা। এতে বিঘা প্রতি তরমুজ উৎপাদনে লাভ হবে ৪০ হাজার টাকা।
প্রতি বিঘায় ৭০০টি হলে খুলনা বিভাগের ১৩ হাজার ৮১০ হেক্টর জমিতে মোট তরমুজ উৎপাদন হবে ৭ কোটি ২৩ লাখ ৫৬ হাজার ২০০টি। প্রতি বিঘায় ৮০০ টি হলে তরমুজ হবে ৮ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ৮০০টি। ১৩ হাজার ৮১০ হেক্টর জমিতে মোট উৎপাদন খরচ ৩১০ কোটি ৯ লাখ ৮০ হাজার টাকা। ১৩ হাজার ৮১০ হেক্টর জমির তরমুজের সম্ভাব্য বিক্রয় মূল্য ৭২৩ কোটি ৫৬ লাখ ২০ হাজার টাকা। লাভ হবে ৪১৩ কোটি ৪৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা।
প্রাকৃতিক দুর্যোগে পড়ে এই অঞ্চলের প্রান্তিক চাষিরা গত বছরে তরমুজ চাষে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এর পাশাপাশি প্রান্তিক পর্যায়ে কাঙ্ক্ষিত মূল্য পাননি। তাই, এ বছর তরমুজ চাষে আগ্রহ হারিয়েছেন তারা। ফলে, এ বছর এই অঞ্চলে তরমুজ চাষের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। চলতি বছরে এই অঞ্চলে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৪ হাজার ২৪৫ হেক্টর কম জমিতে তরমুজ চাষ হয়েছে।
খুলনা অঞ্চলে তরমুজ চাষের লক্ষ্য পূরণে খুলনা জেলার বাজুয়া, দাকোপ, বটিয়াঘাটা, মোংলার বানিয়াশান্তাসহ অন্যান্য উপজেলা গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখছে। স্বল্প খরচে অধিক লাভের কারণে এই অঞ্চলের কৃষকরা দিন দিন তরমুজ চাষে অধিক আগ্রহী হয়ে উঠছেন।
সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে এই অঞ্চলের কৃষকরা তরমুজ চাষে দারুণ সফলতা ও লাভের মুখ দেখবেন। এই অঞ্চলের উৎপাদিত তরমুজ দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
দাকোপ উপজেলার কৈল্লাশগঞ্জ ইউনিয়নের হরিণটানা ব্লকের কৃষক ইন্দ্রজিৎ বলেছেন, “আমি এবার কয়েক বিঘা জমিতে তরমুজের চাষাবাদ করেছি। বিঘা প্রতি খরচ পড়েছে ২৮ থেকে ৩০ হাজার টাকা। এবার ফলন বেশ ভালো হয়েছে। প্রতি বিঘাতে ৮০০ থেকে ৯০০ পিস তরমুজ উৎপাদন হয়েছে। আশা করি, কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা না দিলে ভালো লাভ হবে।”
বটিয়াঘাটা উপজেলার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা (হালিয়া ব্লক) মোহাম্মাদ তারিকুল ইসলাম বলেছেন, “আমার ব্লকে প্রায় ১০ হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ হয়েছে। ক্ষেতে কৃষকরা এখন পরিচর্যা, কীটনাশক প্রয়োগ ও সেক্সফেরোমন ফাঁদ স্থাপন করছেন। বড় ধরনের কোনো দুর্যোগ দেখা না দিলে কৃষকরা তরমুজ চাষাবাদে দারুণ লাভবান হবেন।”
দাকোপ উপজেলার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা করুণা কান্ত সরকার জানিয়েছেন, চুনকুড়ি ব্লকে ৪০০ হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ করা হয়েছে। পানির সাথে সার মিশিয়ে সেচের সঙ্গে দেওয়া হচ্ছে এবং মাতৃপোকা (ফলের মাছি) দমনের জন্য সেক্সফেরোমন ফাঁদ স্থাপন ও হলুদ আঠালো ফাঁদ স্থাপন করা হচ্ছে। বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা না দিলে এই এলাকার কৃষকেরা এবার তরমুজ চাষে লাভবান হবে। ১৫-২০ দিন পর থেকে তরমুজ কর্তন শুরু হবে।
খুলনার দাকোপ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, ২৮টি ব্লক নিয়ে দাকোপ উপজেলা। খুলনা অঞ্চলের মধ্যে দাকোপ উপজেলাতে সবচেয়ে বেশি তরমুজের আবাদ হয়ে থাকে। চলতি অর্থবছরে এই উপজেলায় তরমুজ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮ হাজার ১০০ হেক্টর জমি। এর বিপরীতে চাষ হয়েছে ৬ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে। গত বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগে পড়ে কৃষকের ক্ষেতের তরমুজের ব্যাপক ক্ষতি হয় এবং কৃষক দামও কম পেয়েছে। এসব কারণে এবার অনেক কৃষক তরমুজ চাষ করেননি।
আশা করা যাচ্ছে বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা না দিলে এই এলাকার কৃষকেরা তরমুজ চাষে সফলতার মুখ দেখবে। তরমুজ চাষিদের চাহিদা অনুসারে সার, বীজ ও কীটনাশক দেওয়া হয়েছে। আগামী ১৫/২০ দিন পর থেকে তরমুজ কর্তন শুরু হবে।
ঢাকা/নূরুজ্জামান/রফিক
অনলাইনেও ক্লাস নেওয়ার কথা ভাবছে সরকার: শিক্ষামন্ত্রী