রমজানে আল্লাহ-ভীতি অর্জনের উপায়
মুফতি আতাউর রহমান || রাইজিংবিডি.কম
তাকওয়া বা আল্লাহ-ভীতি মুমিনের জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। কেননা তা মানুষকে যাবতীয় পাপাচার থেকে দূরে রাখে এবং জান্নাতের পথে পরিচালিত করে। তাকওয়া মুমিনকে উভয় জগতে সাফল্যমণ্ডিত করে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করে, আল্লাহকে ভয় করে ও তাঁর অবাধ্যতা থেকে সাবধান থাকে তারাই সফলকাম।’ (সুরা নুর, আয়াত: ৫২)
পবিত্র রমজান তাকওয়া অর্জনের মোক্ষম সময়। কেননা পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘হে মুমিনরা! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে যেভাবে ফরজ করা হয়েছিল তোমাদরে পূর্ববর্তীদের ওপর যেন তোমরা আল্লাহ-ভীরু হতে পারো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৩)
তাফসিরবিদরা বলেন, আয়াত দ্বারা প্রমাণ হয় তাকওয়া রোজা ফরজ হওয়ার অন্যতম উদ্দেশ্য অথবা তা সিয়াম সাধনার সুফল। ড. ওমর বিন সুলাইমান আশকার (রহ.) তাকওয়ার সুফল সম্পর্কে লেখেন, ‘তাকওয়া এমন মহান গুণ, যাতে দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ নিহিত। তাকওয়া দ্বিনের জন্য মুমিনের অন্তরকে প্রশস্ত করে। তাকওয়ার কারণে আল্লাহ আমাদের ভালোবাসেন, আমাদের আমল কবুল করেন। তাকওয়ার মাধ্যমে আমরা চিরঞ্জীব অবিনশ্বর আল্লাহর আশ্রয় লাভ করি। এর মাধ্যমে আল্লাহর দরবারে আমাদের মর্যাদা বাড়ে। ফলে আমরা দুনিয়া ও আখেরাতে সুসংবাদ লাভ করি।’ (আত-তাকওয়া, পৃষ্ঠা ৬)
বিখ্যাত তাবেয়ি তাল্ক ইবনে হাবিব (রহ.) তাকওয়া পরিচয় তুলে ধরে বলেছেন, ‘তাকওয়া বা আল্লাহ-ভীতি হলো, সওয়াবের আশায় আল্লাহর আনুগত্য করা এবং তাঁর শাস্তির ভয়ে গুনাহ পরিহার করা।’ (জামিউল উলুম ওয়াল হিকাম, পৃষ্ঠা ২০০)
উল্লিখিত সংজ্ঞা থেকে জানা গেল, তাকওয়ার দিক দুটি: ক. আল্লাহর আনুগত্য করা, খ. পাপ পরিহার করা। সুতরাং রমজানে মুমিন পাপ পরিহার ও ইবাদতের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জনের চেষ্টা করবে। ড. ওমর বিন সুলাইমান আশকার (রহ.) আল্লাহ-ভীতি অর্জনের বেশ কয়েকটি উপায় বর্ণনা করেছেন। নিম্নে তা সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
১. কোরআন পাঠ : মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনকে তাকওয়া অর্জনের মাধ্যম বানিয়েছেন। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি এই কোরআনে মানুষের জন্য সর্বপ্রকার দৃষ্টান্ত উপস্থিত করেছি, যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে, আরবি ভাষায় এই কোরআন বক্রতামুক্ত, যাতে মানুষ তাকওয়া অবলম্বন করে।’ (সুরা ঝুমার, আয়াত : ২৭-২৮)
২. আল্লাহর ইবাদত : বান্দা যখন নিষ্ঠার সঙ্গে আল্লাহর ইবাদত করে, তখন আল্লাহ তাঁকে তাকওয়া দান করেন। আল্লাহ বলেন, ‘হে মানুষ! তোমরা তোমাদের সেই প্রতিপালকের ইবাদত কোরো যিনি তোমাদের ও তোমাদের পূর্ববর্তীদের সৃষ্টি করেছেন যাতে তোমরা মুত্তাকি হতে পারো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২১)
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন, আল্লাহ রোজা ফরজ করেছেন তাকওয়া অর্জনের জন্য। এজন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও কাজ ত্যাগ করতে পারল না, তার পানাহার পরিত্যাগের কোনো প্রয়োজন আল্লাহর নেই।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৯০৩)
৩. আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা : আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করলেও বান্দার অন্তরে আল্লাহর ভয় জাগ্রত হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তিনিই সূর্যকে তেজস্কর ও চন্দ্রকে জ্যোতির্ময় করেছেন এবং তার মনজিল নির্দিষ্ট করেছেন যাতে তোমরা বছর গণনা ও সময়ের হিসাব জানতে পারো। আল্লাহ এটা নিরর্থক সৃষ্টি করেননি। জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য তিনি এসব নিদর্শন বিশদভাবে বিবৃত করেন। নিশ্চয়ই দিবস ও রাতের পরিবর্তনে এবং আল্লাহ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যা সৃষ্টি করেছেন তাতে নিদর্শন রয়েছে মুত্তাকি সম্প্রদায়ের জন্য।’ (সুরা ইউনুস, আয়াত: ৫-৬)
একজন মুমিন কিছু নিদর্শনের মাধ্যমে বুঝতে পারে তাঁর ভেতর তাকওয়া তথা আল্লাহ-ভীতি জাগ্রত হয়েছে। যার ভেতর সবচেয়ে বড় নিদর্শন হলো প্রকাশ্য ও গোপনে আল্লাহকে ভয় করা। কোনো কাজ সামনে এলে এটা যাচাই করে নেওয়া যে, এতে মহান আল্লাহ খুশি হবেন, নাকি নাখোশ হবেন। অতঃপর তা করা অথবা ত্যাগ করা।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা তাকওয়ার অধিকারী হয় তাদেরকে শয়তান যখন কুমন্ত্রণা দেয় তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে এবং তাৎক্ষণাৎ তাদের চোখ খুলে যায়।’ (সুরা আরাফ, আয়াত : ২০১)
আল্লাহ সবাইকে দ্বিনের সঠিক বুঝ দান করুন। আমিন।
ঢাকা/শাহেদ