বাসচালক থেকে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট: মাদুরোর বিস্ময়কর উত্থান-পতন
প্রয়াত বিপ্লবী নেতা হুগো শাভেজের মনোনীতি উত্তরসূচি হিসেবে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট পদে আসীন হয়েছিলেন নিকোলাস মাদুরো।
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো দেশটির সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী ও একই সঙ্গে সবচেয়ে বিতর্কিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। বিপ্লবী নেতা হুগো শাভেজ প্রয়াণের পর ভেনেজুয়েলায় ক্ষমতার ভার কাধে তুলে নেওয়া এই নেতা একদিকে নিজেকে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের উত্তরসূরি হিসেবে তুলে ধরেছেন, অন্যদিকে অর্থনৈতিক বিপর্যয়, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের অভিযোগে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছেন।
নিকোলাস মাদুরোর জন্ম ১৯৬২ সালের ২৩ নভেম্বর, ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে। তার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে মধ্যবিত্ত এক পরিবারে। রাজনীতিতে আসার আগে তিনি বাসচালক হিসেবে কাজ করতেন এবং সেই সময় থেকেই শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। এই শ্রমিক রাজনীতিই তাকে ধীরে ধীরে বামপন্থি রাজনীতির দিকে টেনে আনে।
মাদুরোর রাজনৈতিক উত্থান মূলত হুগো শাভেজের হাত ধরেই। ১৯৯০-এর দশকে শাভেজের নেতৃত্বাধীন বলিভারিয়ান বিপ্লবী আন্দোলনে যুক্ত হয়ে তিনি দ্রুত আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন। শাভেজ ক্ষমতায় আসার পর মাদুরো জাতীয় পরিষদের সদস্য হন এবং পরে স্পিকার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৬ সালে তাকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করা হয়- এই পদে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শাভেজ সরকারের অন্যতম মুখ হয়ে ওঠেন।
২০১৩ সালে হুগো শাভেজের মৃত্যুর পর তার মনোনীত উত্তরসূরি হিসেবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন নিকোলাস মাদুরো। অল্প দিনের ব্যবধানে অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে তিনি বিরোধী প্রার্থী এনরিক ক্যাপ্রিলেসকে সামান্য ব্যবধানে পরাজিত করেন। তবে সেই নির্বাচন থেকেই তার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
ক্ষমতায় আসার পর মাদুরোর শাসনামলেই যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের নিষ্ঠুর নিষেধাজ্ঞায় ভেনেজুয়েলা ইতিহাসের ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে।
পশ্চিমা বিশ্লেষকদের চোখে, তেলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা, দুর্নীতি, ভুল অর্থনৈতিক নীতি ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটিতে চরম মুদ্রাস্ফীতি, খাদ্য ও ওষুধ সংকট দেখা দেয়। লাখ লাখ মানুষ দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়, যা লাতিন আমেরিকার ইতিহাসে অন্যতম বড় শরণার্থী সংকটে রূপ নেয়।
মাদুরোর বিরুদ্ধে কর্তৃত্ববাদী শাসন কায়েমের অভিযোগও দীর্ঘদিনের। বিরোধী দল দমন, গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা খর্ব এবং বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর ভূমিকা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সমালোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।
২০১৮ ও ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়েও ব্যাপক বিতর্ক হয়; যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বহু দেশ এসব নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু বলে স্বীকৃতি দেয়নি। তারা একের পর এক কঠোর নিষেধাজ্ঞায় ভেনেজুয়েলার অর্থনীতিতে পঙ্গু করে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক পাচার ও দুর্নীতির অভিযোগ এনে তার মাথার দামও ঘোষণা করে। একই সঙ্গে তার সরকারকে অবৈধ ঘোষণা করে বিরোধী নেতা হুয়ান গুয়াইদোকে একসময় অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দেয় ওয়াশিংটন।
তবে সব বিতর্ক ও চাপের মধ্যেও নিকোলাস মাদুরো ক্ষমতায় টিকে ছিলেন। সেনাবাহিনী ও রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর দৃঢ় নিয়ন্ত্রণ এবং চীন, রাশিয়া ও ইরানের মতো মিত্রদের সমর্থন তার শাসনের প্রধান ভিত্তি বলে মনে করা হয়। শেষপর্যন্ত সেই সমর্থনের খুঁটিগুলো নাড়িয়ে দিয়ে ভেনেজুয়েলায় ঢুকে মার্কিন বাহিনী মাদুরোকে তুলে নিয়ে যাওয়ার দাবি করেছে। এমন ঘটনার নজির বিশ্বে বিরল।
বিশ্লেষকরা বলছেন, একটি সার্বভৌম দেশের মধ্যে আকস্মিক অভিযান চালিয়ে প্রেসিডেন্টকে তুলে নিয়ে যাওয়ার এই ঘটনা পরাশক্তির দেশগুলোকে একই ধরনের কাজ করতে উস্কানি দিতে পারে। তারা বলছেন, এখন চীন যদি তাইওয়ানে এই মডেল অনুসরণ করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র তাতে বাধা দিতে পারবে না হয়তো।
ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে নিকোলাস মাদুরোর কর্তৃত্ব আপাতত শেষ। মাদুরোর বাকি জীবনটা হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের কোনো কারগারে কাটবে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
ঢাকা/রাসেল