ঢাকা     সোমবার   ০৫ জানুয়ারি ২০২৬ ||  পৌষ ২১ ১৪৩২

Risingbd Online Bangla News Portal

মাদুরো ছিনতাই: বিশ্ববিশৃঙ্খলা ও সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের চূড়ান্ত নজির

রাসেল পারভেজ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০২:২৯, ৪ জানুয়ারি ২০২৬   আপডেট: ০২:৩৪, ৪ জানুয়ারি ২০২৬
মাদুরো ছিনতাই: বিশ্ববিশৃঙ্খলা ও সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের চূড়ান্ত নজির

ভেনেজুয়েলার কারাকাস থেকে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ধরে যুদ্ধজাহাজে করে নিউ ইয়র্কে নেওয়া হচ্ছে। জাহাজে তোলার পর মাদুরোর এই ছবি পোস্ট করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে রাজধানী কারাকাসে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে ধরে নিয়ে গেছে হানাদার মার্কিন বাহিনী। তাকে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজে করে নিউ ইয়র্কে নেওয়া হচ্ছে, সেখানে তাকে বিচারের মুখোমুখি করা হবে। মাদুরোর সঙ্গে রয়েছেন তার স্ত্রী। এই ঘটনা কেবল একটি সরকারের পতনের ঘটনা নয়- এটি আধুনিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভিত্তিতে এক ভয়ংকর লঙ্ঘনের নজির। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থার যে মূল স্তম্ভগুলোর ওপর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক দাঁড়িয়ে আছে, তার অন্যতম হলো রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব। মাদুরোকে ‘ছিনতাই’-এর এই ঘটনা সেই স্তম্ভেই সরাসরি আঘাত হেনেছে।

আন্তর্জাতিক আইনের ভাষায়, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব মানে একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বাইরের কোনো শক্তির হস্তক্ষেপ না করার নীতি। ১৯৪৫ সালের জাতিসংঘ সনদের ২(১) ও ২(৭) অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, সব রাষ্ট্র সার্বভৌম সমতার অধিকারী এবং কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অন্য রাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। 

আরো পড়ুন:

জাতিসংঘ সনদের এই নীতির ব্যতিক্রম কেবল দুটি ক্ষেত্রে স্বীকৃত হয়। এক. জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদিত সামরিক পদক্ষেপ। দুই. আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ।

ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে এই দুই ব্যতিক্রমের কোনোটিই স্পষ্টভাবে প্রযোজ্য নয়। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানের পক্ষে জাতিসংঘের কোনো অনুমোদন ছিল না এবং সরাসরি আত্মরক্ষার যুক্তিও আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্নবিদ্ধ। ফলে এটি একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের ওপর একতরফা বলপ্রয়োগ, যা আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

এই ঘটনার বিপজ্জনক দিক হলো, এটি একটি নতুন নজির স্থাপন করছে। যদি একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র অন্য একটি রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টকে সরাসরি অপহরণ করে নিয়ে যেতে পারে এবং পরে সেটিকে ‘ন্যায়বিচার’ বা ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার’-এর নামে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করে, তবে আন্তর্জাতিক আইনের সীমারেখা কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়ে। 

মাদুরোকে ছিনতাইয়ের খবর নিয়ে আলজাজিরা কথা বলে কাতারের হামাদ বিন খলিফা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সুলতান বারাকাতের সঙ্গে। তিনি একে আখ্যা দিয়েছেন ‘আন্তর্জাতিক আইনের কফিনে শেষ পেরেক’ হিসেবে।

যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে, মাদুরো একজন ‘অবৈধ শাসক’, যিনি বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আছেন এবং মাদক পাচারসহ গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত। তবে আন্তর্জাতিক আইনে কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বৈধতা নির্ধারণ করার একতরফা অধিকার অন্য কোনো রাষ্ট্রের নেই। এই প্রশ্ন নিষ্পত্তির দায়িত্ব মূলত সংশ্লিষ্ট দেশের জনগণ ও আন্তর্জাতিক বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার, যার আদর্শ স্থান জাতিসংঘ।

আরো বড় উদ্বেগের বিষয় হলো ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ অন্যান্য পরাশক্তিগুলোকে উস্কানি দেবে; সাম্রাজবাদী খায়েশ মেটাতে তারা একই পদ্ধতি প্রয়োগে উৎসাহিত হবে। এই বার্তা খুবই ভয়ংকর। 

যুক্তরাষ্ট্র যদি ভেনেজুয়েলায় এমন অভিযান চালাতে পারে, তবে চীন তাইওয়ান, রাশিয়া ইউক্রেনের আরো অংশ, বা অন্য কোনো পরাশক্তি তার চেয়ে দুর্বল প্রতিবেশী রাষ্ট্রে একই ধরনের হস্তক্ষেপকে ন্যায্যতা দেওয়ার সুযোগ পাবে। অর্থাৎ, ‘শক্তিই আইন’, এই বিপজ্জনক ধারণা আবারো বৈশ্বিক রাজনীতির কেন্দ্রে ফিরে আসতে পারে।

মধ্যযুদ্ধে রাজ্য দখলের মতো এখন দেশ দখলের মাৎস্যন্যায় ছড়িয়ে পড়লে আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা বলে কিছুই গুরুত্বপূর্ণ থাকবে না। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নিজের দেশের আইন-কানুনকে উপেক্ষা করে যে মাদুরোকে ছিনতাই করলেন, বিশ্বশৃঙ্খলায় এ এক বিরল বিশৃঙ্খলার দৃষ্টান্ত, যা বিশ্বব্যবস্থায় বিপর্যয় ঘটিয়ে দিতে পারে। 

এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা এক ধরনের নৈতিক সংকটে পড়েছে। একদিকে মানবাধিকার লঙ্ঘন, স্বৈরতন্ত্র ও জনগণের দুর্ভোগের বাস্তবতা রয়েছে; অন্যদিকে রয়েছে আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামো, যা ভেঙে পড়লে ছোট ও দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর অস্তিত্বই প্রশ্নের মুখে পড়বে। মাদুরোর শাসনের সমালোচনা করা এক বিষয়, আর একটি রাষ্ট্রকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে তার প্রেসিডেন্টকে তুলে নিয়ে যাওয়া আরেক বিষয়- এই দুইয়ের পার্থক্য না মানলে বিশ্বব্যবস্থা দ্রুতই বিশৃঙ্খলার দিকে এগোবে।

বিষয়টি ঠিকই আঁচ করতে পেরেছেন যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতারা। ভেনেজুয়েলায় হানা দিয়ে মাদুরো ও তার স্ত্রীকে ছিনতাইয়ের ঘটনায় মার্কিন নীতিপ্রণেতারা ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন।

নিউ ইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে জানিয়েছেন, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করার বিষয়টি এবং তাদের নিউ ইয়র্কে ফেডারেল হেফাজতে কারাবন্দি করার পরিকল্পনা সম্পর্কে তাকে অবহিত করা হয়েছে।

মাদুরো ও তার স্ত্রীকে নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিনে অবস্থিত ফেডারেল কারাগার মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টারে (এমডিসি) নেওয়া হচ্ছে।

এই অভিযানের কড়া সমালোচনা করে মামদানি লিখেছেন, “একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের ওপর একতরফাভাবে হামলা চালানো যুদ্ধের শামিল এবং এটি যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আইন ও আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন।”

তিনি আরো বলেন, “শাসন পরিবর্তনের এই প্রকাশ্য চেষ্টা শুধু বিদেশের মানুষদের ওপর প্রভাব ফেলে না; এটি সরাসরি নিউ ইয়র্কবাসীদের জীবনেও প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে এই শহরে বসবাসকারী কয়েক লাখ ভেনেজুয়েলান নাগরিকের ক্ষেত্রে।”

মাদুরোকে ছিনতাইয়ের ঘটনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আরেকজন ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা বেকা বালিন্ট ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এই অভিযান ছিল অপ্রয়োজনীয়, অবৈধ এবং বহুদিন ধরেই পরিকল্পিত।” 

এক্সে দেওয়া পোস্টে বেকা বালিন্টের মতে, এর সঙ্গে মাদক পাচারের কোনো সম্পর্ক নেই; বরং এর মূল উদ্দেশ্য ছিল তেল, খনিজ সম্পদ এবং শাসন পরিবর্তন।

“নিকোলাস মাদুরোর শাসনব্যবস্থাকে নিন্দা করার হাজারো কারণ রয়েছে- এটি ছিল কমিউনিস্ট, অলিগার্কিক ও কর্তৃত্ববাদী,” লেখেন তিনি।

“কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় যে শাসন পরিবর্তন ঘটিয়েছে, তার বিরোধিতা করার একটি মৌলিক কারণ আছে। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব কখনোই দরকষাকষির বিষয় হতে পারে না- রাষ্ট্রটি যত ছোটই হোক, যত শক্তিশালীই হোক বা যে মহাদেশেই অবস্থিত হোক না কেন। সার্বভৌমত্ব অখণ্ডনীয় ও পবিত্র,” বলেন বেকা বালিন্ট।

গণতান্ত্রিক পশ্চিমা আইনপ্রণেতারা এভাবে আইন-কানুন, মানবাধিকারকে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন, অন্যদিকে তাদের সাম্রাজ্যবাদী নীতি-আদর্শ বাকি বিশ্বের ওপর চাপিয়ে দিয়ে আধিপত্য তৈরি করেন। তবে ট্রাম্প সেসবের ধার ধারলেন না। ট্রাম্পের শীর্ষ মন্ত্রীরাও তাকে সমর্থন করে ভেনেজুয়েলার মতো একটি কমিউনিস্ট রাষ্ট্রে রেজিম চেঞ্জকে উদযাপন করছেন। আবার প্রচ্ছন্ন হুমকিও দিচ্ছেন, এরপর কিউবা। তাহলে তারপর কি বলিভিয়া? তারপর...? না কি সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের এই খেলা এশিয়া ও ইউরোপে ছড়িয়ে পড়বে? 

এখন যদি তাইওয়ানের প্রেসিডেন্টকে ছিনতাই করে চীন, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র কী ধরনের জবাব দেবে? সামরিক হস্তক্ষেপ করবে? একই কাজ যদি ভারত করে, তারা যদি নেপাল বা ভুটানের মতো ছোট দেশ দখল করে বলে তাদের প্রভূত উন্নতি সাধন করে দেবে; তাহলে এসব দেশ কি মানবে? যদি রাশিয়া আরো কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ দখল করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র কি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঘোষণা করে তার ‘আপাত অন্তত বৈশ্বিক দাপট’ ধরে রাখার চেষ্টার করবে? এসব প্রশ্নের সরল উত্তর যেমন নেই, তেমনি ট্রাম্প স্বাধীন দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের যে চূড়ান্ত নজির স্থাপন করলেন, তার মাশুল বিশ্বকে কোনো না কোনো দিতে হবে। 

মাদুরো ব্যক্তিগতভাবে ইতিহাসে কীভাবে মূল্যায়িত হবেন, তা সময়ই নির্ধারণ করবে। কিন্তু তাকে ঘিরে এই ঘটনা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি গভীর প্রশ্ন রেখে গেল- আইন দিয়ে শাসিত বিশ্বব্যবস্থা কি শক্তির রাজনীতির কাছে আবারো হার মানছে? যদি এর উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তবে ভেনেজুয়েলা শুধু একটি দেশের নাম নয়, বরং একটি নতুন, অনিশ্চিত বিশ্বব্যবস্থার প্রতীক হয়ে উঠবে।

ঢাকা//

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়