ভেনেজুয়েলায় কী পরিমাণ তেলের মজুদ রয়েছে?
ভেনেজুয়েলার নজিরবিহীন হামলা চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ধরে নিয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র। মাদুরো ট্রাম্পের কট্টর সমালোচক হিসেবে পরিচিত। তিনি দীর্ঘদিন থেকেই অভিযোগ করে আসছিল যে, তাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদ দখলের পায়তারা করছে যুক্তরাষ্ট্র।
শনিবার (৩ জানুয়ারি) সেই আশঙ্কা সত্যি করে ভেনেজুয়েলায় আকস্মিক হামলা চালিয়ে মাদুরোকে বন্দি করে মার্কিন বাহিনী। এরপর ফ্লোরিডায় এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প খোলাখুলিভাবেই ঘোষণা করেন, ভেনেজুয়েলায় একটি সুষ্ঠু পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র দেশটি ‘পরিচালনা’ করবে এবং ভেনেজুয়েলার বিশাল তেল সম্পদ ব্যবহারের উপযোগী করে অন্যান্য দেশে বিক্রি করবে।
সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প আরো জানান, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার তেল খাতে বেশ জোরালোভাবে যুক্ত হবে। এজন্য মার্কিন বৃহত্তম তেল কোম্পানিগুলো ভেনেজুয়েলার তেল শিল্পের ‘বিপর্যস্ত অবকাঠামো’ মেরামতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করবে। আর মার্কিন এই বিনিয়োগ তেল বিক্রির টাকা থেকে উঠে আসবে।
বিশ্বের বৃহত্তম তেলের মজুদ ভেনেজুয়েলায়
ভেনেজুয়েলা সরকারের তথ্যানুয়ায়ী, দেশটিতে বিশ্বের বৃহত্তম প্রমাণিত তেলের মজুদ রয়েছে। তবে অব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগের অভাব এবং নিষেধাজ্ঞার কারণে এর অপরিশোধিত তেল উৎপাদন সক্ষমতার তুলনায় অনেক কম।
লন্ডনভিত্তিক এনার্জি ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, ভেনেজুয়েলার দখলে বিশ্বের মোট মজুদের প্রায় ১৭ শতাংশ বা ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল তেল রয়েছে, যা বিশ্বের বৃহত্তম তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরবের চেয়েও বেশি।
মার্কিন জ্বালানি বিভাগের মতে, এই মজুদের বেশিরভাগই মধ্য ভেনেজুয়েলার ওরিনোকো অঞ্চলের ভারী তেল। ফলে এই তেল উৎপাদন করা ব্যয়বহুল, যদিও প্রযুক্তিগতভাবে এটি তুলনামূলক সহজ।
ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন
ভেনেজুয়েলা ইরান, ইরাক, কুয়েত এবং সৌদি আরবের সঙ্গে ওপেকের (পেট্রোলিয়াম রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংস্থা) অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। ১৯৭০-এর দশকে দেশটি দৈনিক ৩৫ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করত, যা তৎকালীন বিশ্ব উৎপাদনের ৭ শতাংশেরও বেশি ছিল।
২০১০-এর দশকে দেশটির উৎপাদন ২০ লাখ ব্যারেলের নিচে নেমে আসে এবং ২০২৪ সালে উৎপাদন মাত্র ১১ লাখ ব্যারেলে দাঁড়ায়, যা বিশ্ব উৎপাদনের মাত্র ১ শতাংশ।
তেল উৎপাদনে যৌথ উদ্যোগ
১৯৭০-এর দশকে ভেনেজুয়েলা তার তেল শিল্পকে জাতীয়করণ করে এবং রাষ্ট্রীয় কোম্পানি পেট্রোলিওস ডি ভেনেজুয়েলা এস.এ. (পিডিভিএসএ) গঠন করে। ১৯৯০-এর দশকে দেশটি এই খাতকে বিদেশি বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করার পদক্ষেপ নেয়। ১৯৯৯ সালে হুগো চাভেজ ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর, সব তেল প্রকল্পে পিডিভিএসএ’র মালিকানা বাধ্যতামূলক করা হয়।
তেলের উৎপাদন বাড়ানোর আশায় যুক্তরাষ্ট্রের শেভরন, চীনের ন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন, এনি, টোটাল এবং রাশিয়ার রোসনেফটের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ শুরু করে পিডিভিএসএ।
তেল রপ্তানি ও শোধন
একটা সময় ভেনেজুয়েলার তেলের প্রধান ক্রেতা ছিল যুক্তরাষ্ট্র। তবে গত দশকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে চীন ভেনেজুয়েলার তেলের প্রধান গন্তব্য হয়ে উঠেছে।
সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজের আমলে চীন প্রধান ঋণদাতা হওয়ার পর ভেনেজুয়েলা চীনের কাছে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার ঋণী।ভেনেজুয়েলা ও চীনের যৌথ মালিকানাধীন তিনটি বিশাল তেলের ট্যাংকারের মাধ্যমে অপরিশোধিত তেল পাঠিয়ে এই ঋণ পরিশোধ করা হয়ে থাকে।
ভেনেজুয়েলায় সাম্প্রতিক মার্কিন হামলার পর দেশটির তেল রপ্তানি কার্যক্রম বর্তমানে স্থবির হয়ে রয়েছে। শনিবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প জানান, চীন তেল পাবে, তবে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি।
রাশিয়াও ভেনেজুয়েলাকে শত কোটি ডলার ঋণ দিয়েছে, তবে এর সঠিক পরিমাণ স্পষ্ট নয়।
ট্রাম্প যে কারণে ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদ চান
মার্কিন সংবাদমাধ্যম স্কাই নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও কেন ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর নির্ভরশীল, তার কিছু কৌশলগত কারণ রয়েছে।
তেলের ধরন: যুক্তরাষ্ট্র মূলত হালকা অপরিশোধিত তেল উৎপাদন করে। কিন্তু মার্কিন তেল শোধনাগারগুলো ভারী অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করার জন্য তৈরি।
শোধনাগারের সীমাবদ্ধতা: এই শোধনাগারগুলোকে নতুন করে তৈরি করা খুবই ব্যয়বহুল। তাই পেট্রোল ও ডিজেলের সরবরাহ ঠিক রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের ভারী তেলের প্রয়োজন হয়।
আমদানি নির্ভরতা: যুক্তরাষ্ট্র নিজের উৎপাদিত বেশিরভাগ তেল রপ্তানি করে দেয় এবং টেক্সাস ও লুইজিয়ানার শোধনাগারগুলোর জন্য প্রতিদিন ৬ হাজার ব্যারেলের বেশি ভারী তেল আমদানি করে। কানাডা ও রাশিয়ার পাশাপাশি ভেনেজুয়েলা বিশ্বের বৃহত্তম ভারী তেলের মজুদের ওপর বসে আছে।
ঢাকা/ফিরোজ