ইউক্রেনে ওরেশনিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে রাশিয়ার হামলা ‘বিপজ্জনক উস্কানি’: যুক্তরাষ্ট্র
আন্তর্জাতিক ডেস্ক || রাইজিংবিডি.কম
ইউক্রেনে আবারো ‘ওরেশনিক’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে প্রাণঘাতী হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। মস্কোর এই পদক্ষেপকে ‘বিপজ্জনক উস্কানি’ হিসেবে অভিহিত করে এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা।
প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় ৪ বছর ধরে চলা ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন শান্তি আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন, তখন রাশিয়ার এই কর্মকাণ্ডকে যুক্তরাষ্ট্র একটি ‘বিপজ্জনক ও অকারণে উত্তেজনা বৃদ্ধি’ হিসেবে অভিযুক্ত করেছে।
সোমবার (১২ জানুয়ারি) জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের এক জরুরি বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র এই সর্বশেষ সতর্কতা জারি করে।
জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন উপ-রাষ্ট্রদূত ট্যামি ব্রুস নিরাপত্তা পরিষদকে বলেন, “রাশিয়ার এই পদক্ষেপ যুদ্ধকে আরো বিস্তৃত ও তীব্র করার ঝুঁকি তৈরি করছে।”
গত সপ্তাহে রাশিয়া ইউক্রেনে পারমাণবিক সক্ষমতাসম্পন্ন ‘ওরেশনিক’ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করায় যুক্তরাষ্ট্র বিশেষ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ওই হামলায় ইউক্রেনে ‘ব্যাপক সংখ্যক হতাহতের’ ঘটনা ঘটে।
ব্রুস বলেন, “বিশ্বজুড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অতুলনীয় অঙ্গীকারের কারণে যখন এক বিশাল সম্ভাবনার মুহূর্ত তৈরি হয়েছে, তখন উভয় পক্ষেরই উচিত উত্তেজনা কমানোর উপায় খুঁজে বের করা।”
তবে এর মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরই আজ মঙ্গলবার সকালে রাশিয়ার বাহিনী ইউক্রেনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর খারকিভে নতুন করে দফায় দফায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এতে অন্তত চারজন নিহত এবং অন্তত ছয়জন আহত হয়েছেন।
ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভেও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর পাওয়া গেছে, তবে কিয়েভে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
গত বৃহস্পতিবার রাশিয়া ইউক্রেনে শত শত ড্রোন এবং ওরেশনিক ক্ষেপণাস্ত্রসহ ডজনখানেক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ব্যাপক হামলা চালানোর পর ইউক্রেন নিরাপত্তা পরিষদের এই বৈঠকের আহ্বান জানায়।
ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে রাশিয়া তাদের শক্তিশালী ওরেশনিক ক্ষেপণাস্ত্র এ নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো ব্যবহার করল, যা মূলত কিয়েভের ন্যাটো মিত্রদের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সোমবারের বৈঠকে ব্রুস রাশিয়াকে মনে করিয়ে দেন যে, প্রায় এক বছর আগে তারা নিজেরাই ইউক্রেন সংঘাত বন্ধের আহ্বান জানিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছিল।
তিনি বলেন, “সেই প্রস্তাবের চেতনাকে ধারণ করে রাশিয়া, ইউক্রেন এবং ইউরোপকে গুরুত্বের সঙ্গে শান্তির পথ খুঁজতে হবে এবং এই দুঃস্বপ্নের অবসান ঘটাতে হবে।”
সোমবার (১৩ জানুয়ারি) মস্কো ওরেশনিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কথা স্বীকার করেছে। তারা জানায়, পশ্চিম ইউক্রেনের লভিভ অঞ্চলের একটি বিমান মেরামত কারখানাকে লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়েছে। মস্কোর দাবি, ইউক্রেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের একটি বাসভবনে হামলার চেষ্টা করায় তারা এর পাল্টা জবাব দিয়েছে। তবে কিয়েভ এই দাবি অস্বীকার করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র একে ‘ভুল তথ্য’ বলে নাকচ করে দিয়েছে।
গত সপ্তাহে রাশিয়ার এই ব্যাপক হামলা এমন এক সময়ে ঘটল যখন ইউক্রেন ও তার পশ্চিমা মিত্ররা মার্কিন নেতৃত্বাধীন শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে রাশিয়া থেকে দেশটিকে রক্ষা করার বিষয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর অগ্রগতি জানিয়েছিল।
এই হামলা মস্কো ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সম্পর্কের নতুন করে শীতলতা তৈরির সময়েও ঘটলো।
সম্প্রতি উত্তর আটলান্টিকে রাশিয়ার-পতাকাবাহী একটি তেল ট্যাংকার মার্কিন বাহিনীর জব্দ করার ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে ক্রেমলিন। একে তারা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে। অন্যদিকে, ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, তিনি রাশিয়াকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করার জন্য একটি কঠোর নিষেধাজ্ঞা প্যাকেজের পক্ষে রয়েছেন।
মস্কো ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে তাদের কঠিন শর্ত থেকে সরে আসার কোনো প্রকাশ্য ইঙ্গিত দেয়নি। রাশিয়ার দাবির মধ্যে রয়েছে- বিশ্ব সম্প্রদায়কে ইউক্রেনের দখলকৃত অঞ্চলগুলোকে রাশিয়ার অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।
সোমবারের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ভ্যাসিলি নেবেনজিয়া এই কূটনৈতিক অচলাবস্থার জন্য উল্টো ইউক্রেনকে দায়ী করেন।
নেবেনজিয়া বলেন, “যতক্ষণ না ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি “সুস্থ বুদ্ধিতে ফিরে আসেন এবং আলোচনার জন্য বাস্তবসম্মত শর্তে সম্মত হন, ততক্ষণ আমরা সামরিক উপায়ে সমস্যার সমাধান অব্যাহত রাখব।”
তিনি আরো বলেন, “তাকে (জেলেনস্কিকে) অনেক আগেই সতর্ক করা হয়েছিল। প্রতিটি অতিবাহিত দিন যা তিনি অপচয় করছেন, আলোচনার শর্তাবলী তার জন্য কেবল আরো খারাপই হবে।”
জবাবে ইউক্রেনের রাষ্ট্রদূত আন্দ্রি মেলনিক বলেন, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে পূর্ণমাত্রায় আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর থেকে রাশিয়া এখন সবচেয়ে বেশি ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে, রুশ অর্থনীতি মন্থর হয়ে গেছে ও তেলের রাজস্ব কমে গেছে।
তিনি নিরাপত্তা পরিষদকে বলেন, “রাশিয়া এই নিরাপত্তা পরিষদ ও পুরো জাতিসংঘ পরিবারকে বোঝাতে চায় যে তারা অপরাজিত, কিন্তু এটি একটি ভ্রম মাত্র।”
তিনি বলেন, “রাশিয়ার শক্তির এই পরিকল্পিত চিত্রটি ধোঁয়াশা ছাড়া আর কিছুই নয়, যার বাস্তবতার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই।”
আজ মঙ্গলবার ভোরে ইউক্রেনের খারকিভ অঞ্চলের গভর্নর ওলেহ সিনিয়েহুবভ সর্বশেষ রুশ হামলায় অন্তত চারজন নিহত ও ছয়জন আহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছেন।
ঢাকা/ফিরোজ