ইসরায়েলি দখলদারিত্বের মুখে ঐতিহ্য রক্ষায় ফিলিস্তিনের বড় পদক্ষেপ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক || রাইজিংবিডি.কম
২০২৫ সালের ২১ নভেম্বরে গাজা সিটিতে ইসরায়েলি বিমান হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় গ্রেট ওমারি মসজিদ
ইসরায়েলি দখলের আশঙ্কায় ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ ইউনেস্কোর কাছে ১৪টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার আবেদন করেছে। এই পদক্ষেপের লক্ষ্য হলো, ইসরায়েলি দখল ও হামলা থেকে ফিলিস্তিনের সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক স্থানগুলোকে রক্ষা করা।
বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৪৮ সাল থেকে ইসরায়েলি দখলদারিত্বের মুখে থাকা ফিলিস্তিনিদের কাছে তাদের ভূমি ও ঐতিহ্য রক্ষা করা একটি জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৩ সাল থেকে গাজায় ইসরায়েলের ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পরিপ্রেক্ষিতে।
ফিলিস্তিনি পর্যটন মন্ত্রণালয়ের বিশ্ব ঐতিহ্য বিষয়ক ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক মারওয়া আদওয়ান আল-জাজিরাকে বলেন, “ফিলিস্তিন কেবল রাজনৈতিক সংঘাতের কোনো স্থান নয়, বরং এটি মানব ইতিহাসে প্রোথিত এক সভ্যতা।”
ফিলিস্তিনের ঐতিহাসিক স্থানগুলোকে ইসরায়েলের দখলের প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “ইতিহাসকে একচেটিয়া করার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে ইউনেস্কোর কাছে আবেদন সবচেয়ে শক্তিশালী জবাব।”
ফিলিস্তিনি পর্যটন মন্ত্রণালয়ের নতুন এই পদক্ষেপের লক্ষ্য হলো অধিকৃত পশ্চিম তীর এবং গাজা উপত্যকাজুড়ে বিপন্ন নিদর্শনগুলোর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করা। গাজা বর্তমানে ইসরায়েলের বিধ্বংসী যুদ্ধে বিপর্যস্ত। বিশেষজ্ঞরা একে ‘সাংস্কৃতিক গণহত্যা’ বলেও অভিহিত করেছেন, কারণ গাজায় ইসরায়েলি বোমাবর্ষণে দুই শতাধিক ঐতিহাসিক স্থান ধ্বংস হয়েছে।
নতুন এই তালিকার মাধ্যমে ইউনেস্কোর সম্ভাব্য স্বীকৃতির তালিকায় থাকা ফিলিস্তিনি স্থানের মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৪-এ। এর মধ্যে তিন হাজার খ্রিস্টপূর্বাব্দের কনানীয় নগর-রাষ্ট্র থেকে শুরু করে গাজার প্রাচীন শহর পর্যন্ত বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী স্থান রয়েছে।
ফিলিস্তিনের পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব মন্ত্রণালয় ইউনেস্কোর কাছে নতুন জমা দেওয়া ১৪টি ঐতিহ্যবাহী স্থানের তালিকা প্রকাশ করেছে:
১. গাজার ঐতিহাসিক কেন্দ্র (গ্রেট ওমারি মসজিদ এবং সেন্ট পোরফিরিয়াস চার্চসহ)
২. জাবালিয়ার বাইজেন্টাইন চার্চ (মুখেইতিম)
৩. কনানীয় নগর-রাষ্ট্র
৪. নাবলুস ঐতিহাসিক শহর ও এর আশপাশ
৫. ফিলিস্তিনে যিশু খ্রিস্টের পবিত্র অলৌকিক ঘটনাবলির স্থানগুলো)
৬. জেরুজালেম মরুভূমির মঠসমূহ (আল-বারিয়াহ)
৭. ফিলিস্তিনের মাকামাত (মাজার বা দরগাহ)
৮. জেরুজালেমের পানি সরবরাহ ব্যবস্থা (কানাত এস-সাবিল)
৯. জাবাল আল-ফুরেইদিস/হেরোডিয়াম
১০. লোয়ার জর্ডান রিভার ভ্যালি (নিম্ন জর্ডান নদী উপত্যকা)
১১. তুলুল আবু আল-আলাইকের প্রত্নতাত্ত্বিক প্রাসাদসমূহ
১২. ওয়াদি খারিতুন প্রাগৈতিহাসিক গুহা এলাকার সাংস্কৃতিক ল্যান্ডস্কেপ
১৩. ফিলিস্তিনের গুহা বসতি (আল-মাঘায়ির)
১৪. ফিলিস্তিনের আধুনিক স্থাপত্য।
ইউনেস্কোর কাছে ফিলিস্তিনের এই আবেদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো গাজার ঐতিহ্য রক্ষা করা, যা ইসরায়েলি যুদ্ধের সময় ভয়াবহ ধ্বংসের সম্মুখীন হয়েছে। এই তালিকায় প্রায় এক হাজার চারশ’ বছর আগে নির্মিত গ্রেট ওমারি মসজিদ এবং ৪২৫ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত গ্রিক অর্থোডক্স চার্চ ‘সেন্ট পোরফিরিয়াস’ রয়েছে, এই দুটি স্থাপনাই ইসরায়েলি বিমান হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছিল।
আদওয়ান এই পদক্ষেপকে যুদ্ধের ‘পরবর্তী দিনের’ জন্য একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন, “গ্রেট ওমারি মসজিদের মতো স্থানগুলোকে তালিকাভুক্ত করা মানে এগুলোর বিশ্বজনীন মূল্যের একটি প্রাথমিক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং এগুলোর জরুরি সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা।”
এদিকে, ফিলিস্তিনের এই পদক্ষেপ ইসরায়েল সরকারের কাছ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে, বিশেষ করে পশ্চিম তীরের ‘এলাকা সি’-তে অবস্থিত স্থানগুলো নিয়ে, যেমন হেরোডিয়াম (জাবাল আল-ফুরেইদিস), যা বর্তমানে পূর্ণ ইসরায়েলি সামরিক নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
ইসরায়েলের চ্যানেল ১৪-এর তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলি ঐতিহ্যমন্ত্রী আমিচাই ইলিয়াহু প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর কাছে একটি জরুরি চিঠি পাঠিয়ে ফিলিস্তিনিদের এই পদক্ষেপকে ‘প্রত্নতাত্ত্বিক সন্ত্রাস’ বলে অভিহিত করেছেন। ইলিয়াহু দাবি করেন, এটি ‘ইহুদি ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্পন্ন’ স্থানগুলো দখলের একটি রাজনৈতিক প্রচেষ্টা।
অন্যদিকে, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য মুছে ফেলার এবং প্রত্নতত্ত্বকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে জমি দখলের অভিযোগ রয়েছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে একটি প্রস্তাব পাস করে ইসরায়েলকে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের দখল বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছিল।
ঐতিহ্য নিয়ে ফিলিস্তিন-ইসরায়েলের এই দ্বন্দ্ব এমন এক সময়ে শুরু হয়েছে যখন ইসরায়েল জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সম্পর্ক সম্পূর্ণ ছিন্ন করার পদক্ষেপ নিচ্ছে। সম্প্রতি ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডন সার ঘোষণা করেন যে, ইসরায়েল ইউএন ওমেন-সহ জাতিসংঘের বেশ কয়েকটি সংস্থার সঙ্গে ‘অবিলম্বে সব যোগাযোগ ছিন্ন’ করবে। এর আগে ইসরায়েল ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য জাতিসংঘের সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ-কে নিষিদ্ধ করেছে।
প্রতিকূল কূটনৈতিক পরিস্থিতি সত্ত্বেও, ফিলিস্তিনি পর্যটন মন্ত্রণালয়ের বিশ্ব ঐতিহ্য বিষয়ক ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক মারওয়া আদওয়ান জোর দিয়ে বলেন, ফিলিস্তিনিদের এই আবেদন একটি ‘সার্বভৌম অধিকার’। তিনি বলেন, “এটি সময়ের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া নয়, বরং অনেক দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই এই স্থানগুলোকে সুরক্ষা পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত করার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ।”
ঢাকা/ফিরোজ