সময় পেলে ইরানের তেল দখল করব: ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল শিল্প দখলের পরিকল্পনা করছে। তিনি দাবি করেছেন, এই যুদ্ধের জন্য আরও কিছুটা সময় প্রয়োজন। খবর আল-জাজিরার।
শুক্রবার (৩ এপ্রিল) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট লিখেছেন, “সামান্য একটু সময় পেলে আমরা খুব সহজেই হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করতে পারব, তেল দখল করতে পারব এবং প্রচুর অর্থ উপার্জন করতে পারব।” তিনি আরও যোগ করেন, “এটি পুরো বিশ্বের জন্য তেল খনির জোয়ার হবে না কি?”
তবে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করবে তা স্পষ্ট নয়। যুদ্ধের শুরুর দিকে ইরান এই পথটি কার্যকরভাবে বন্ধ করে দিয়েছিল, যার ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হয়ে পড়ে।
ট্রাম্প কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন যে যুক্তরাষ্ট্র শিগগির এই প্রণালিটি পুনরায় চালু করবে। এক মাস আগে তিনি বলেছিলেন, মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজগুলো কৌশলগত এই জলপথ দিয়ে তেলবাহী জাহাজগুলোকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাবে।
কিন্তু মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা এই সংকীর্ণ প্রণালিতে ধীরগতির জাহাজগুলোকে পাহারা দেওয়ার জন্য ‘প্রস্তুত নয়’। কারণ সেখানে তাদের জাহাজগুলো ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের সহজ লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠতে পারে।
ইরানের তেল ‘দখল’ করার বিষয়ে ট্রাম্পের এই বক্তব্য তার বাগাড়ম্বরপূর্ণ অবস্থানের একটি বড় ধরনের বৃদ্ধি হিসেবে দেখা হচ্ছে। শুক্রবার পরবর্তীতে তিনি তার ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে আবারও লেখেন, “তেল কি নিজেদের কাছে রাখব, কেউ কি আছেন?”
১৯৬২ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে গৃহীত ‘প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর স্থায়ী সার্বভৌমত্ব’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, তেল ও খনিজ সম্পদ সেই দেশেরই প্রাপ্য যেখানে সেগুলো অবস্থিত। সেই প্রস্তাবে বলা হয়েছে:
“জনগণ ও জাতিসমূহের তাদের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর সার্বভৌমত্বের অবাধ ও সুবিধাজনক প্রয়োগ অবশ্যই রাষ্ট্রের পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে এগিয়ে নিতে হবে।”
উল্লেখ্য, ট্রাম্প এর আগেও ইরাক এবং ভেনেজুয়েলার মতো দেশগুলোতে মার্কিন সামরিক সংশ্লিষ্টতার সময় ‘তেল দখল’ করার কথা নিয়মিতভাবে বলেছেন।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের হত্যার পাশাপাশি প্রতিদিনের বোমাবর্ষণ সত্ত্বেও ইরানের শাসনব্যবস্থা এখনও অক্ষত রয়েছে এবং তারা দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। ট্রাম্প দাবি করছেন, মার্কিন বাহিনী ইরানের সামরিক সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দিয়েছে, কিন্তু তেহরান এখনও হরমুজ প্রণালি অবরোধ করে রেখেছে এবং ইসরায়েলসহ পুরো অঞ্চলের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
ট্রাম্প ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং পানি শোধনাগারসহ বিভিন্ন বেসামরিক অবকাঠামোতে বোমা হামলার হুমকি দিচ্ছেন। গত বুধবার তিনি ইরানের একটি প্রধান বেসামরিক সেতু ধ্বংসের ফুটেজ শেয়ার করে ভবিষ্যতে এই ধরনের আরও হামলার সতর্কবার্তা দেন।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বেসামরিক স্থাপনায় বোমা হামলা করা ‘যৌথ শাস্তি’র শামিল এবং এটি আন্তর্জাতিক আইনে নিষিদ্ধ। শুক্রবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সেতুর ওপর এই হামলাকে আইএসআইএস-এর রণকৌশলের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
তিনি বলেন, “এই আইএসআইএস-শৈলীর সন্ত্রাসী যুদ্ধাপরাধ এবং ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে অনুরূপ হামলা একটি অনস্বীকার্য সত্য উন্মোচন করে: তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো ইরানের ধ্বংস সাধন।”
ভেনেজুয়েলা মডেলের পুনরাবৃত্তি?
ইরানের ভেতরে মার্কিন বাহিনীর কোনো প্রকাশ্য স্থল উপস্থিতির খবর নেই। ট্রাম্প বিস্তারিত জানাননি যে তার প্রশাসন কীভাবে দেশটির তেল নিয়ন্ত্রণ করার পরিকল্পনা করছে।
ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে, জানুয়ারিতে মার্কিন বাহিনী প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করার পর থেকে তার উত্তরসূরি ডেলসি রদ্রিগেজ ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে বিপুল পরিমাণ তেল বিক্রির কাজ করছেন। চলতি সপ্তাহের শুরুতে ট্রাম্প পরামর্শ দিয়েছিলেন যে ইরানেও ‘ভেনেজুয়েলা মডেল’ অনুসরণ করা সম্ভব, তবে এর জন্য যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী করা প্রয়োজন।
ট্রাম্প বলেন, “আমরা কেবল তাদের তেল নিয়ে নিতে পারি। কিন্তু আমি নিশ্চিত নই যে আমাদের দেশের মানুষের সেই ধৈর্য আছে কি না, যা দুর্ভাগ্যজনক। তারা এটার শেষ দেখতে চায়। আমরা যদি সেখানে থাকতাম, আমি শুধু তেল দখল করাকেই প্রাধান্য দিতাম। আমরা এটা খুব সহজেই করতে পারতাম। কিন্তু দেশের মানুষ বলছে, ‘শুধু জয়ী হও। তুমি অনেক বড় ব্যবধানে জিতছ, এবার জিতে বাড়ি ফিরে এসো’।”
যুদ্ধের শুরুতে ট্রাম্প প্রশাসন বলেছিল, এটি চার থেকে ছয় সপ্তাহ স্থায়ী হবে। আজ শনিবার (৪ এপ্রিল) এই যুদ্ধ ষষ্ঠ সপ্তাহে পদার্পণ করেছে।
ঢাকা/ফিরোজ