ইরানের পরিকল্পনা দীর্ঘমেয়াদী, যুক্তরাষ্ট্র চায় দ্রুত ফলাফল
পর্দার আড়ালে আলোচনা সচল রাখতে এবং একটি শান্তি চুক্তির দিকে ধীরে ধীরে এগোতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রস্তাব আদান-প্রদান করছে পাকিস্তান। তবে ইরান দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছে, আর যুক্তরাষ্ট্র চাচ্ছে দ্রুত ফলাফল। এর ফলে দ্রুত শান্তি চুক্তিতে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে কিছুটা প্রতিবন্ধকতা দেখা দিয়েছে। শুক্রবার (১ মে) দ্য গার্ডিয়ান এক বিশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
পাকিস্তানি কর্মকর্তারা বলছেন, তারা এ বিষয়ে সচেতন যে এর সাথে কেবল আঞ্চলিক শান্তিই নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতির সুস্থতা এবং বিশ্বের লক্ষ লক্ষ দরিদ্রতম মানুষের জীবন-জীবিকাও জড়িত। এই দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তানও রয়েছে, যেখানে যুদ্ধের ফলে মাসিক জ্বালানি আমদানির খরচ প্রায় তিনগুণ বেড়ে গেছে।
তিন সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলমান যুদ্ধবিরতির ধারাবাহিকতাকে ইসলামাবাদ একটি বড় সাফল্য হিসেবে দেখছে। তেহরান ও ওয়াশিংটন জানিয়েছে, আলোচনার প্রধান মাধ্যম হিসেবে পাকিস্তানই থাকছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বুধবার জানিয়েছিলেন, ইরান থেকে একটি সংশোধিত প্রস্তাব পাঠানোর প্রতিশ্রুতি তাকে দেওয়া হয়েছে।
সরাসরি আলোচনার গতি থমকে যাওয়ার পর, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে পাকিস্তানের ভূমিকা কম গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু জরুরি গোপন পথ পরিচালনার কাজে পরিবর্তিত হয়েছে। ইসলামাবাদ বিশ্বাস করে, মুখোমুখি বৈঠক ছাড়াই শান্তি প্রক্রিয়া এখনো অগ্রগতি অর্জন করতে পারে।
১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর দুই পক্ষের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের আলোচনা হিসেবে এপ্রিলে ইসলামাবাদে উভয়পক্ষকে একই কক্ষে সারারাতব্যাপী আলোচনার জন্য একত্রিত করার যুগান্তকারী সাফল্য অর্জন করেছিল। তবে এরপর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই তাদের অবস্থান আরো কঠোর করেছে।
তেহরানের মতে, সেই আলোচনা একটি চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছেছিল, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র হঠাৎ করেই বেরিয়ে যায়। ওয়াশিংটন বলেছে, ইরান যথেষ্ট অগ্রসর হতে প্রস্তুত ছিল না। গত সপ্তাহান্তে ইসলামাবাদে দ্বিতীয় দফা আলোচনার আয়োজনের একটি প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। কারণ ইরানি পক্ষ পাকিস্তানে উড়ে আসার জন্য প্রস্তুত মার্কিন দলের সাথে দেখা করতে অস্বীকৃতি জানায়।
মার্কিন কর্মকর্তারা চলতি সপ্তাহে জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন পুনরায় যুদ্ধে যাওয়ার কথা বিবেচনা করছে। ইরানের কিছু মহল হতাশা প্রকাশ করেছে যে, আলোচনায় দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো পালনে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রকে বাধ্য করতে পারেনি।
যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাসুদ খান বলেছেন, পাকিস্তান শুধু দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদানই করছিল না। ইসলামাবাদের হস্তক্ষেপে প্রাথমিকভাবে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি হয়েছিল এবং পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের রেফারি হিসেবে রেখে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ইসলামাবাদ ট্রাম্পকে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়াতে রাজি করিয়েছিল, যার এখন কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই।
তিনি বলেন, পরবর্তী কাজ ছিল উভয় পক্ষকে হরমুজ প্রণালির ওপর থেকে একযোগে তাদের অবরোধ তুলে নিতে রাজি করানো। কিন্তু ট্রাম্প বলেছেন, বোমাবর্ষণের চেয়ে অবরোধ বেশি কার্যকর। অন্যদিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি প্রণালিটির জন্য একটি ‘নতুন অধ্যায়ের’ প্রশংসা করেছেন – যা থেকে বোঝা যায়, কোনো পক্ষই পিছু হটতে রাজি নয়।
মাসুদ খান বলেন, “মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তান একটি জটিল ভূমিকা পালন করছে। ইরান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে তারা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে, কিন্তু আমেরিকা দ্রুত ফলাফল চায়।”
এপ্রিলে পাকিস্তানের সামরিক প্রধান তেহরানে তিন দিন কাটিয়ে দেশের বিভিন্ন ক্ষমতার কেন্দ্রের সঙ্গে বৈঠক করেন, অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী শান্তি প্রক্রিয়ার জন্য আঞ্চলিক সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে সৌদি আরব, কাতার ও তুরস্ক সফর করেন। ইসলামাবাদ এই কূটনীতিতে সমর্থন জোগাতে জাপানসহ দূরবর্তী দেশগুলোকেও যুক্ত করেছে এবং পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও এই সপ্তাহে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপারের সঙ্গে কথা বলেছেন।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি বলেন, “বৈঠকের পরিবর্তে দুই পক্ষ ফোনে কথা বললে তা সহায়ক হবে। পুরনো, নতুন, খুব নতুন নয় এমন বা খুব পুরোনো নয় এমন সব প্রস্তাবই আলোচনার টেবিলে রয়েছে।”
ঢাকা/শাহেদ
চার সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত জারি