ইরান চুক্তির গুঞ্জনের মধ্যেই হরমুজ প্রণালি ছাড়ল চীনা ট্যাঙ্কার
হরমুজ প্রণালিতে পার হওয়ার অপেক্ষায় ওমানের খাসাব শহরের কাছে নোঙর করা জাহাজ
ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে একটি সমঝোতা চুক্তি যখন প্রায় চূড়ান্ত বলে দাবি করছে হোয়াইট হাউজ, ঠিক তখনই পারস্য উপসাগরে দুই মাস ধরে আটকে থাকা দুটি বিশাল চীনা তেল ট্যাঙ্কার হরমুজ প্রণালি ছেড়ে চলে গেছে।
বুধবার (২০ মে) আন্তর্জাতিক শিপিং ট্র্যাকিং সংস্থা এলএসইজি ও কেপলার-এর বরাত দিয়ে এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে আল-জাজিরা।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চীনা পতাকাবাহী ‘ইউয়ান গুই ইয়াং’ ও ‘ওশেন লিলি’ নামের দুটি সুপারট্যাঙ্কার প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল নিয়ে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। এর মধ্যে ‘ইউয়ান গুই ইয়াং’ যুদ্ধ শুরুর ঠিক একদিন আগে, গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০ লাখ ব্যারেল ইরাকি বসরা ক্রুড বোঝাই করেছিল। অন্যদিকে, ‘ওশেন লিলি’ কাতার ও ইরাক থেকে মোট ২০ লাখ ব্যারেল তেল নিয়ে আটকা পড়েছিল।
একই সময়ে দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী চো হিউন সিউলে এক সংসদীয় শুনানিতে জানিয়েছেন, তাদেরও একটি তেলবাহী জাহাজ বুধবার নিরাপদে হরমুজ প্রণালি পার হতে পেরেছে।
প্রণালিটি থেকে জাহাজ তিনটি বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দেশটির আইনপ্রণেতাদের বলেছেন যে, “ইরানের সঙ্গে এই যুদ্ধ ‘খুব দ্রুত’ এবং ‘আশা করি... খুব সুন্দরভাবে’ শেষ হবে।”
জাহাজ তিনটি হরমুজ প্রণালিতে ইরানের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে নিরাপদ অতিক্রম করেছে। বিশ্ব বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ বর্তমানে তেহরানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সব জাহাজ এবং তাদের মিত্রদের সামরিক সরঞ্জামের চলাচল নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।
হোয়াইট হাউজের এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার শান্তি আলোচনা ‘বেশ ভালো অবস্থানে রয়েছে’।
ভ্যান্স বলেন, “এখানে অনেক আলোচনা ও অগ্রগতি হচ্ছে, বেশ ভালো উন্নতি দেখা যাচ্ছে, তবে আমরা কেবল আমাদের কাজ চালিয়ে যাব।”
এর আগে ট্রাম্প আবারো ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দিয়েছিলেন এবং দেশটিকে একটি চুক্তিতে আসার জন্য ‘দুই থেকে তিন দিন’ সময় বেঁধে দিয়েছিলেন। এমনকি তিনি দাবি করেছিলেন যে, হামলা স্থগিত করার মাত্র এক ঘণ্টা আগে তিনি আক্রমণের নির্দেশ দেওয়ার খুব কাছাকাছি ছিলেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারবার ইঙ্গিত দিচ্ছেন- একটি চুক্তি খুব সন্নিকটে। তবে একই সঙ্গে তিনি হুমকি দিয়েছেন, ইরান যদি মার্কিন দাবি না মানে তাহলে দেশটির বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে, হোয়াইট হাউজের ইতিবাচক মন্তব্যের পর বিশ্ববাজারে তেলের দামে কিছুটা স্বস্তি দেখা গেছে। বুধবার (২০ মে) আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের মানদণ্ড হিসেবে পরিচিত ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি সর্বনিম্ন ১১০.১৬ ডলারে নেমে এসেছে।
তবে বাজার বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, চুক্তি হলেও তেলের দাম খুব দ্রুত কমবে না। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এলএসইজি-এর সিনিয়র তেল গবেষক এমরিল জামিল বলেন, “একটি চুক্তি সম্পন্ন হলেও তেলের দাম কিছুটা বাড়তির দিকেই থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ যুদ্ধ শেষ হলেও তেলের সরবরাহ সাথে সাথেই যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরে যাবে না।”
হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন অবরোধের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। গত মাসে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২০২২ সালের জুনের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল।
এই জ্বালানি সংকট ও দুর্বল বাণিজ্যের কারণে জাতিসংঘ চলতি বছরের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২.৫ শতাংশ করেছে। জাতিসংঘের 'ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক সিচুয়েশন অ্যান্ড প্রসপেক্টস' প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, এই সংকটে উন্নয়নশীল দেশগুলোর নিম্ন আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কারণ, খাদ্য ও জ্বালানির অতিরিক্ত খরচের তুলনায় তাদের সাধারণ মজুরি বাড়ছে না।
ঢাকা/ফিরোজ
হাম ও হামের উপসর্গে ৬ শিশুর মৃত্যু