ঢাকা     শুক্রবার   ২২ মে ২০২৬ ||  জ্যৈষ্ঠ ৮ ১৪৩৩ || ৫ জিলহজ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

শিশুরা নির্যাতনের সংকেত যেভাবে দেয়

লাইফস্টাইল ডেস্ক || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৮:৪৩, ২২ মে ২০২৬   আপডেট: ০৮:৪৭, ২২ মে ২০২৬
শিশুরা নির্যাতনের সংকেত যেভাবে দেয়

ছবি: প্রতীকী

শিশুর হঠাৎ করেই চুপচাপ হয়ে যাওয়া, আগে যে মানুষটির সঙ্গে সহজে মিশত এখন তাকে দেখলেই ভয় পাওয়া, একা থাকতে চাওয়া, মাঝেমধ্যে অকারণে কাঁদা কিংবা আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দেওয়ার মতো পরিবর্তন দেখলে সতর্ক হোন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক সময় নির্যাতনের শিকার শিশুরা এভাবেই নীরবে সংকেত দেওয়ার চেষ্টা করে।

মেয়েশিশুর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বিষয়টিকে আরও গভীরভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। সম্প্রতি ঢাকার পল্লবী এলাকায় দ্বিতীয় শ্রেণির এক কন্যাশিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে প্রতিবেশীকে ঘিরে যে ঘটনা সামনে এসেছে, তা শিশুদের ঘরে-বাইরে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

আরো পড়ুন:

শিশু অধিকারকর্মীদের মতে, বাংলাদেশে শিশুদের প্রতি যৌন সহিংসতার বড় একটি অংশ ঘটে পরিচিত মানুষের হাতেই। আত্মীয়, প্রতিবেশী কিংবা পরিবারের ঘনিষ্ঠ কেউই অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব ঘটনায় জড়িত থাকে। ফলে শুধু বাইরের অপরিচিত মানুষ নয়, পরিচিত পরিবেশেও শিশু কতটা নিরাপদ—সেই প্রশ্ন এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্যাতনের শিকার শিশুরা অধিকাংশ সময় সরাসরি কিছু বলতে পারে না। ভয়, লজ্জা এবং মানসিক চাপে তারা বিষয়টি গোপন রাখে। তবে আচরণগত পরিবর্তনের মাধ্যমে তারা অনেক সময় আগাম সংকেত দেয়। যেমন—হঠাৎ ভীত হয়ে পড়া, নির্দিষ্ট কারও কাছে যেতে না চাওয়া, অতিরিক্ত চুপচাপ হয়ে যাওয়া, খিটখিটে আচরণ করা কিংবা একা থাকতে চাওয়া—এসব লক্ষণকে গুরুত্ব দিয়ে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিভিন্ন গবেষণার তথ্যও একই চিত্র তুলে ধরছে। দেশে প্রায় ৮৫ শতাংশ ক্ষেত্রে নির্যাতনকারীরা ভুক্তভোগীর পরিচিত ব্যক্তি বলে উল্লেখ করা হয়েছে বিভিন্ন গবেষণায়। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা রানিন–এর বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, প্রায় ৯৩ শতাংশ ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তি ভুক্তভোগীর পরিচিত কেউ।

২০২০ সালে প্রকাশিত ‘Child Sexual Abuse in Bangladesh’ শীর্ষক গবেষণাতেও বলা হয়েছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নির্যাতনকারী ভুক্তভোগীর পরিচিত মানুষ। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের একটি নিবন্ধ অনুযায়ীও, প্রায় ৮৫ শতাংশ ক্ষেত্রে যৌন নির্যাতনকারীরা শিশুর আত্মীয়, বন্ধু কিংবা বিশ্বস্ত কেউ হয়ে থাকে।

ড. জোবাইদা নাসরীন শিশু ধর্ষণ ও অপরাধীর আচরণ নিয়ে করা এক যৌথ গবেষণায় দেখিয়েছেন, শিশুদের প্রতি যৌন সহিংসতার বেশিরভাগ ঘটনায় পরিবারের সদস্য, আত্মীয় বা পরিচিত মানুষ জড়িত থাকে; অপরিচিতরা নয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো শিশু যদি হঠাৎ নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা জায়গাকে ভয় পেতে শুরু করে কিংবা সেখানে যেতে অনীহা প্রকাশ করে, তাহলে সেটিকে গুরুত্ব সহকারে দেখা উচিত। বিশেষ করে আগে স্বাভাবিকভাবে মিশলেও পরে যদি সে কোনো নির্দিষ্ট মানুষের কাছে যেতে না চায় বা একা থাকতে ভয় পায়, তবে সেটি হতে পারে সতর্কসংকেত।

এ পরিস্থিতিতে অভিভাবকদের ধৈর্য ও সচেতনতার ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, শিশুর আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা গেলে তাকে সময় দিতে হবে, স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে হবে এবং এমন একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে সে নির্ভয়ে নিজের কথা বলতে পারে। কোনো ধরনের চাপ বা ভয় দেখানো থেকে বিরত থাকারও পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

শিশুকে ছোটবেলা থেকেই শরীরের ব্যক্তিগত অংশ, ভালো ও খারাপ স্পর্শ সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি কেউ অস্বস্তিকরভাবে স্পর্শ করলে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে হবে এবং কাকে বিষয়টি জানাতে হবে—সেসব বিষয়েও শিশুদের সচেতন করা জরুরি।
এ ছাড়া শিশুটি কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে এবং কার সংস্পর্শে বেশি থাকছে—এসব বিষয়েও অভিভাবকদের খেয়াল রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে কর্মজীবী বাবা-মায়ের ক্ষেত্রে সন্তানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও নজরদারি বজায় রাখাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার, স্কুল ও সমাজ—সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। সচেতনতা, নজরদারি এবং শিশুদের সঙ্গে খোলামেলা যোগাযোগই এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

ঢাকা/লিপি

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়