প্রথম দিনেই জমজমাট চকবাজারে ইফতারির বাজার
নিজস্ব প্রতিবেদক || রাইজিংবিডি.কম
ঢাকার ঐতিহ্যবাহী চকবাজার এলাকায় জমে উঠেছে ইফতারির বাজার। ছবি: রাইজিংবিডি
রোজার প্রথম দিন থেকেই পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী চকবাজার এলাকায় জমে উঠেছে প্রায় চার শতকের পুরোনো ইফতারির বাজার।
বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) দুপুরের পর থেকেই সার্কুলার রোডজুড়ে দেখা যায় মানুষের ঢল। বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছে কাবাব, হালিম ও জিলাপির মিষ্টি সুঘ্রাণ। বাহারি ইফতারের স্বাদ নিতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ভিড় করছেন এখানে।
বিক্রেতাদের কণ্ঠে শোনা যায় পুরোনো সেই চেনা হাঁক—‘বড় বাপের পোলায় খায়, ঠোঙায় ভইরা লইয়া যায়।’
চার শতকের ইতিহাসে গড়া এই বাজার কেবল কেনাবেচার স্থান নয়, বরং পুরান ঢাকার সংস্কৃতি ও রন্ধনঐতিহ্যের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
আস্ত মুরগির কাবাব থেকে মোরগ মুসাল্লম, বটি ও টিক্কা কাবাব,শামি, শিক ও সুতিকাবাব, কোয়েল ও কবুতরের রোস্ট—সবই মিলছে একসঙ্গে। রয়েছে হালিম, দইবড়া, সমুচা, শাহি জিলাপি, হালুয়া, লাবাং, কাশ্মীরি ও ইরানি শরবতসহ প্রায় শতাধিক পদ।
ঐতিহ্যবাহী ‘বড় বাপের পোলায় খায়’ ইফতার বিক্রেতা আজমল মিয়া জানান, ব্রিটিশ আমলে তার দাদা চাঁন মিয়া এই খাবারের ব্যবসা শুরু করেন। পাকিস্তান আমলে তার বাবা তা চালিয়ে যান। প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে তিনিও একই পেশায় যুক্ত। একসময় এটি ‘শেখ চূড়ার ভর্তা’ নামে পরিচিত ছিল; স্বাধীনতার পর বর্তমান নামটি প্রচলিত হয়। প্রায় ১৭ ধরনের মসলা ও খাঁটি ঘি দিয়ে তৈরি এ ইফতারে গরুর মাংস ব্যবহার করা হয় না—মুরগি, খাসি ও কবুতরের মাংস ও কলিজাই প্রধান উপকরণ।
একশ বছরের বেশি সময় ধরে সুতিকাবাব বিক্রি করে আসছে মিজান মোল্লার পরিবার। বর্তমানে তার ছেলে মনির মোল্লা গরু ও খাসির সুতিকাবাব বিক্রি করছেন—প্রজন্মান্তরে চলে আসা এই পেশায়।
বাজার ঘুরে দেখা যায়, বড় বাপের পোলায় খায় কেজি ৮০০ টাকা, সুতিকাবাব ১,০০০ টাকা, খাসির কাবাব ১,২০০ টাকা। শিক কাবাব ১২০–১৫০ টাকা, কাঠি কাবাব ৮০–১০০ টাকা, কবুতর ১৫০ টাকা, কোয়েল ৮০ টাকা, আস্ত মুরগি ২৫০-৩৫ টাকা, খাসির লেগ রোস্ট ১,০০০ টাকা, ঝাল পরোটা ৬০ টাকা। হালিম পরিমাণভেদে ১৫০–৬০০ টাকা, ডিম চপ ২০ টাকা। আলু চপ, পেঁয়াজু, বেগুনি, সিঙ্গারা ও সমুচা ৫–১৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। শাহি জিলাপি ও রসমালাই–দই কেজি ৩৫০ টাকা, দুধসর ৪৫০ টাকা, ঘিয়ে ভাজা জিলাপি ৩০০ টাকা, জাফরান শরবত লিটারপ্রতি ৩০০ টাকা।তাছাড়া দই বড়া ৩০ টা পিস, হালুয়া পরিমাণ ভেদে ৫০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ইফতার কিনতে আসা পুরান ঢাকার বাসিন্দা রহমত মিয়াজী বলেন, “রমজান এলে চকবাজারে না এলে যেন ইফতারই পূর্ণ হয় না। পরিবারের আবদারে এবারও এসেছি। তবে গত কয়েক বছর ধরে দাম বাড়ছে, মান কিছুটা কমেছে।”
তবে ঐতিহ্যবাহী এ বাজারের খাবার স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অনেক দোকানে খাবার খোলা অবস্থায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। বিক্রয়কর্মীদের অনেকের মাথায় ক্যাপ বা হাতে গ্লাভস নেই। বিক্রেতাদের দাবি, অধিকাংশ খাবার চুলা থেকে নামানোর পরপরই বিক্রি হয়ে যায়, তাই দীর্ঘ সময় ঢেকে রাখার প্রয়োজন পড়ে না।
১৬৭৬ সালে মোগল সুবেদার শায়েস্তা খান চকবাজারে শাহি মসজিদ নির্মাণ করেন। পরে নবাব মুর্শিদ কুলি খাঁ ১৭০২ সালে এলাকাটিকে আধুনিক বাজারে রূপ দেন। তখন থেকেই রমজানজুড়ে এই এলাকায় বসে মুখরোচক ইফতারের ভাসমান বাজার। প্রতি বছর ঐতিহ্য ধরে রেখে শাহি মসজিদের সামনেই বসে সেই চিরচেনা পসরা।
ঢাকা/এমএসবি/এসবি