ঢাকা     রোববার   ০৩ মার্চ ২০২৪ ||  ফাল্গুন ১৯ ১৪৩০

বঙ্গবন্ধু: বন্ধু ও শত্রু বেড়াজালের অতীত

অজয় দাশগুপ্ত || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৫:১৯, ১০ আগস্ট ২০২১   আপডেট: ১৮:১৬, ১৪ আগস্ট ২০২২
বঙ্গবন্ধু: বন্ধু ও শত্রু বেড়াজালের অতীত

এখন যা দিনকাল তাতে তখনকার বাংলাদেশ ও বাস্তবতা বোঝা যাবে না। তখন আমরা তরুণ। আমাদের সবকিছু মনে আছে। কেমন ছিলো পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট, কেমন ভয়াবহ ছিলো পরিবেশ, কেমন অশান্ত মন অথচ নির্বিকার রাষ্ট্র!

সকাল থেকে মাথার ওপর হেলিকপ্টারের চক্কর। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা তখন দূরের কোনো শহর। সবাই সবুর করে ছিল রেডিওতে কী ঘোষণা আসে শোনার জন্য। খুনীদের আত্মঅহঙ্কারী এলোমেলো ঘোষণার বাইরে নেপথ্যে থাকা আসল শয়তান বা তাদের সবার পরিচয় বেরিয়ে আসতে বিলম্ব হয়নি। হঠাৎ রেডিওতে ভাষণ দেয়া খন্দকার মোশতাক যে এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে সবাই জেনে গিয়েছিল। সঙ্গে এটাও দেখলাম এক নিমিষে চোখ উল্টানো দেশের চেহারা।

ধীরে ধীরে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত। পরদিন সকালে জানলাম এক রাত পার হয়ে যাওয়া দেশে বঙ্গবন্ধুর জানাজা হয়েছে বাংলা সাবান আর রিলিফের সাদা কাপড় জড়িয়ে। যেখানে কান্নাও ছিলো নিষেধ- এই হলো সত্য। তাই আজকের বাংলাদেশে হঠাৎ এতো আওয়ামী লীগ আর মুজিব কোট দেখলে আমি ভয় পাই। আমার সন্দেহ যেতে চায় না।

বঙ্গবন্ধুর শেষ দিনগুলো কেমন ছিলো? তিনি কি তাঁর একা হয়ে পড়াটা বুঝতে পেরেছিলেন? বাকশালের জন্ম ও দেশব্যাপী গর্ভণর নিয়োগ যে সমালোচনা আর গণতন্ত্র হত্যার অপবাদে নিমজ্জিত তিনি কি তা বুঝতেন? এ সব প্রশ্নের উত্তর জানা আজ আর সম্ভব না। কিন্তু ইতিহাসের অনিবার্য গতি প্রকৃতি বলে দিয়েছে বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে ছিলেন তাঁর দলের নিবেদিত অনুগত নামের সেসব নেতারা যারা কোনো কালে তাঁকে সহ্য করতে পারেনি। সময় ও সুযোগের জন্য মেনে নেয়া আর বন্ধু হয়ে থাকা ভিন্ন বিষয়। এই পার্থক্য নেতা জানতেন, বুঝতেনও। কিন্তু ঘটনা ততো দিনে গড়িয়েছে অনেক দূরে।

৭ আগস্ট, ১৯৭১ খন্দকার মোশতাক তখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। আর সে পদে থেকেই মার্কিনী দূতকে পাঠিয়েছিলেন পাকিস্তানিদের সঙ্গে কনফেডারেশানের প্রস্তাব দিয়ে। এই সমঝোতা যদি আলোর মুখ দেখতো আজও আমরা পাকিস্তানের অধীনে গোলামের মতো জীবন যাপন করতাম। খন্দকার মোশতাক আহমেদ শুরু থেকেই এক বিচিত্র চরিত্র। আওয়ামী লীগে থেকেও পোশাকে আচারে ব্যবহারে ভিন্ন। ছিপছিপে জিন্নাহর মতো শরীর। সীমান্ত পেরিয়ে একাত্তরে ভারতে গেলেও সৈয়দ নজরুল ইসলাম আর তাজউদ্দীন আহমদকে সহ্য করতে পারতেন না। বিশেষত স্পষ্টভাষী তাজউদ্দীন আহমদের প্রগতিশীল চরিত্র আর স্বাধীনতার প্রশ্নে দিল্লীর ওপর নির্ভরতা আর

আমেরিকাবিরোধী অবস্থান মেনে নিতে রাজী ছিলো না মুশতাক। সে সময় কার্যত ভারতীয় গোয়েন্দা বাহিনীর কারণেই প্রবাসী সরকারের পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে পারেনি। সময় মতো জানাজানি হবার কারণে মোশতাককে ভারত ছাড়তে বাধা দেয়া হয়। যাতে আমেরিকা বা অন্য কোনো দেশে গিয়ে ষড়যন্ত্র করতে না পারেন।

তাজউদ্দীন আহমদ আগাগোড়া এক নীতি, এক কথায় বিশ্বাস করে তাঁর পথে অটল ছিলেন। যার চূড়ান্ত পরিণতি বিজয় দিবস। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব এবং নির্দেশের সফল পরিকল্পক এই নেতাকে সহ্য করতে না পারা নেতাদের ভেতর এমন অনেক যুবনেতা ছিলেন যারা বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে মিথ্যা বলে উস্কে দেয়ার কাজটি অনায়াসে করতে পারতেন। এবং তাই করা হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের নয়মাস বঙ্গবন্ধু কারাগারে না থাকলে নিশ্চয়ই জানতেন কারা প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনকে কলকাতায় গুলি করার জন্য গিয়েছিল। কে বা কারা তাঁর ত্যাগ সাহসকে তুচ্ছ করে হটকারিতা বেছে নিয়েছিল। অথচ সবচেয়ে বিস্ময়ের ব্যাপার, বেদনার বিষয় বঙ্গবন্ধু সাড়ে তিন বছরে একদিনও তাজউদ্দীনের কথা শোনার সময় পাননি। নানাভাবে তাঁকে বিভ্রান্ত করে এরা আসলে বঙ্গবন্ধুর নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার পাশাপাশি চূড়ান্ত আঘাত হানার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। 

পনেরো আগস্ট আমাদের জীবনকে চিরতরে বদলে দেয়ার কাজটি প্রায় শেষ মনে হলেও আখেরে সময় কথা বলেছে। কথা বলেছে এ দেশের সাধারণ মানুষ। কথা বলেছে এ দেশের প্রগতিশীল মানুষ। অতঃপর নেতৃত্বে শেখ হাসিনার আগমন এবং ইতিহাসের মুক্তি দেখি আমরা।

বঙ্গবন্ধু নিঃসন্দেহে আমাদের সূর্য। তিনি না থাকলে রাজনীতির আকাশ অন্ধকার। কিন্তু তাঁর একাত্তরের ডান হাতগুলো কেন সরে গিয়েছিল? কীভাবে সফল হয়েছিল মোশতাক। সে কথা বলার আগে একটা কথা বলি। গবেষকরা মনে করেন: বাকশাল গঠন প্রশ্নে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তাজউদ্দীন আহমদের গুরুতর মতপার্থক্য দেখা দিয়েছিল। তাছাড়া মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর এ দেশীয় দোসরদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণায় তাজউদ্দীন হতাশ হয়েছিলেন। এসব ঘটনা বঙ্গবন্ধু ও তাজউদ্দীনের মধ্যে দূরত্বের সৃষ্টি করে। 

ইতিহাস অনুগামী লেখকদের মতে, বঙ্গবন্ধুর সাধারণ ক্ষমা ঘোষণায় তাজউদ্দীন আশঙ্কা করেছিলেন, এতে হানাদারদের অনুচরেরা শক্তিশালী হয়ে উঠবে। আর বাকশাল গঠনের পর তিনি বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন, ‘যেভাবে দেশ চলছে তাতে আপনিও থাকবেন না, আমরাও না। দেশ চলে যাবে আলবদর-রাজাকারদের হাতে।’
তাঁর ব্যাপারে বঙ্গবন্ধুর ভুল যখন ভাঙল না, তখন তিনি তাঁর একজন হিতাকাঙ্ক্ষীকে বলেছিলেন, ‘স্বাধীনতা অর্জনের পরপরই আমি যদি মারা যেতাম, তাহলে সেটাই বরং ভালো হতো।’

নির্মম ইতিহাস আরো বলে: এটা অনিবার্য ছিল যে তাঁরা একসঙ্গে কাজ করবেন এবং কাজের মাধ্যমে একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠবেন। তবে এই দুই নেতার সম্পর্কে অবনতির পেছনে খন্দকার মোশতাক, চার ছাত্রনেতা ও মুজিব বাহিনীর হাত ছিল।

কথাগুলোর সত্যতা পাওয়া গেলো পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট। এর তিনমাসের ভেতরেই প্রাণ দিলেন চার জাতীয় নেতা। তাঁদের দীর্ঘকালের সহকর্মী কথিত বন্ধুটি তাঁদেরও ছাড় দেয়নি। বরং তার কুপ্রস্তাব বিশ্বাসঘাতকতার পরামর্শ গ্রহণ না করায় বলেছিল, আমি আর বাঁচাতে পারলাম না।  

জাতির জনক ও তাঁর পরিবারের সবাইকে মারার নেপথ্য কারিগর মোশতাক। এই লোকটিকে কেন চিহ্নিত করা গেলো না? এ কি কেবল ব্যক্তিগত কারণ? নাকি আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র? এটা অস্বীকার করা যাবে না বায়াত্তর থেকেই ষড়যন্ত্রের কারণে আওয়ামী লীগের ভেতর ঝামেলা চলছিল। আন্তর্জাতিক টাকার প্রভাব স্বভাবসুলভ বিদ্রোহে ছাত্রনেতারা আলাদা। আলাদা হয়ে গিয়েছিলেন সঙ্গীরা। এ জন্য আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থাসহ নানা দেশের চক্রান্ত যে কি পরিমাণ সক্রিয় ছিলো তা তখনকার মিডিয়া খুললেই চোখে পড়বে। এমন কঠিন সময়ে ইউজিন বুষ্টার নামে এক কূটনীতিক সদ্য স্বাধীন গরিব দেশের রাজধানী ঢাকায় দায়িত্ব নিয়েছিলেন। বলা হতো এই লোকটির উড়োজাহাজ যেসব দেশের ওপর দিয়ে উড়ে যেতো সেসব দেশে নাকি ক্যূ হয়ে যেতো। এটা জানার পরও আমাদের গোয়েন্দারা কি চোখ বন্ধ করে ছিলো, নাকি তারাও অংশ নিয়েছিল প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে?

ইতিহাস বলছে বঙ্গবন্ধু তাজউদ্দীন একসঙ্গে থাকতে পারলে আমরা কখনোই আজকের অপবাস্তবতা দেখতাম না। বাংলাদেশের গতিপ্রকৃতি নির্ধারিত হতো ভিন্নভাবে। যা হয়নি তা হয়নি। কিন্তু ইতিহাসের পাঠ বা তার মূল বিষয় মেনে সতর্ক আর সাবধান থাকাই হচ্ছে জ্ঞানের পরিচায়ক। আজকের বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর উদ্বোধন ও বিস্তার বড় করতে হলে এর কোনো বিকল্প দেখি না। 

জয়তু বঙ্গবন্ধু। জয়তু বাংলাদেশ। 

* বঙ্গবন্ধু জরুরি ছিলেন, জরুরি থাকবেন

* শোক এখন শক্তির অনির্বাণ উৎস

ঢাকা/তারা

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়