ঢাকা     রোববার   ১৬ জানুয়ারি ২০২২ ||  মাঘ ২ ১৪২৮ ||  ১২ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

হারিকেন মায়ার্স, একটি চিঠি ও বার্বাডোজ রক্ত

ইয়াসিন হাসান || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২১:২৫, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১   আপডেট: ১৩:০৫, ১৮ জুন ২০২১
হারিকেন মায়ার্স, একটি চিঠি ও বার্বাডোজ রক্ত

এক ডাবলে রেকর্ড চুরমার করলেন মায়ার্স

২৮০ কিলোমিটার গতিতে বইছিল ঝড় সেদিন, তিন বছরেরও কিছু বেশি সময় আগের কথা। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে ডোমিনিকা, সেন্ট ক্রইক্স ও পুয়ের্তো রিকোয় ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল হারিকেন মারিয়া। ওইসময় উইনওয়ার্ড নামের একটি ফ্রাঞ্চাইজি দলের হয়ে ডোমিনিকায় খেলতে গিয়ে কী বিপদেই না পড়েছিলেন কাইল মায়ার্স! যে বাড়িতে উঠেছিলেন, তার ছাদ ভেঙে পড়েছিল। বন্যার পানিতে ভেসে গিয়েছিলেন তার সতীর্থরা। পরদিন সকালে খাবার ও পানির সন্ধানে বের হয়ে স্থানীয় পুলিশ ও অফিসিয়ালের সহায়তায় উদ্ধার হন। খোলা আকাশের নিচে বিনিদ্র রাত কাটানোর পরও তার উপলব্ধি- জীবন সুন্দর! এদিকে বার্বাডোজে দুশ্চিন্তায় কপালে ভাঁজ পড়েছিল, তাদের ফোন করে নিশ্চিন্তে রাখলেন, ‘আমি ভালো আছি।’

মারাত্মক হারিকেন মারিয়া যাকে টলাতে পারেনি, একটুও চিড় ধরাতে পারেনি মনোবলে, তাকে ১৫৫.৯ গ্রাম থেকে ১৬৩ গ্রামের গোলাকার বস্তু কতটুকুই বা ভোগাতে পারবে? পারেনি একটুও। পারেনি বলেই সাগরপাড়ের স্টেডিয়ামে তার ব্যাটের ঝড় চললো। যে ঝড়ের আদুরে নাম ‘হারিকেন মায়ার্স’! যেটা গিয়ে থামলো ২১০ রানে, থামলোও নয়; থামতে বাধ্য হলেন। ততক্ষণে যে দলের লক্ষ্য পূরণ হয়ে গেছে। ৩১০ বল আর ৪১৫ মিনিটের এই ইনিংস জয় করেছে হৃদয়।

সেঞ্চুরির পর বোনারের সঙ্গে মায়ার্সের উদযাপন। ছবি: বিসিবি

হারিকেন মারিয়া কেড়ে নিয়েছিল তিন হাজারের বেশি প্রাণ, ক্ষতি করেছিল সম্পদের। ‘হারিকেন মায়ার্স’ লন্ডভন্ড করলো সাদা পোশাকের বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে। যে ঝড়ে স্রেফ উড়ে গেল মুমিনুল হকরা। ৩৯৫ রানের বিশাল লক্ষ্যে নেমে ওয়েস্ট ইন্ডিজ জিতলো ৩ উইকেটে। অভিষেকে ২১০ রানের ইনিংস খেলে মায়ার্স পেয়ে গেলেন অমরত্বের স্বীকৃতি।

দুর্বল শক্তির দল বলে অনেকেই অবজ্ঞা করেছিল। অনভিজ্ঞ দল গণমাধ্যমে খুব একটা গুরুত্ব পাননি। অথচ চট্টগ্রামে পাঁচদিনের লড়াইয়ের পর তারাই এখন গণমাধ্যমের শিরোনাম। তাইতো ১৪ জানুয়ারি তাদেরকে পাঠানো ক্লাইভ লয়েডের অনুপ্রেরণামূলক চিঠিটি এখানে প্রাসঙ্গিক। সর্বকালের সেরা অধিনায়ক চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘মনে রেখো, বেশিরভাগ মানুষকে বিচার করা হয় তারা যে বাধা পেরিয়ে এসেছে তার ভিত্তিতে।’

সেঞ্চুরিকে দেড়শ রানের ঘরে নিলেন মায়ার্স।

মায়ার্স শত বাধা পেরিয়েছেন। অভিষেকে ডাবল করে বহু রেকর্ড চুরমার করেছেন। তাতে বিজয়ের পতাকা উড়িয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। চতুর্থ ইনিংসে সবচেয়ে বেশি রান তুলে জয়ের রেকর্ডের তালিকায় ক্যারিবিয়ানদের এ জয় রয়েছে পঞ্চম স্থানে। আর উপমহাদেশের মাটিতে প্রথম। শীর্ষে রয়েছে তাদেরই করা ৪১৮ রান করে জেতার রেকর্ড। শেষ দিনে ২৮৫ রান তুলে জয় পেতে হতো ওয়েস্ট ইন্ডিজকে। প্রথম দুই সেশনের লড়াইয়ে অতিথিরা এগিয়ে যায়। শেষ সেশনে স্বাগতিকরা খানিকটা লড়াই করলেও দিনের খেলা শেষ হওয়ার ১৫ বল আগে জয় নিশ্চিত তাদের। 

ম্যাচ পরিস্থিতি বিবেচনায় মায়ার্সের ব্যাট চলতে থাকলো। কখনও আক্রমণ করেছেন, কখনও ধীরস্থির হয়ে খেলেছেন। বাজে বল শাসন করতে একটুও কাপর্ণ্য করেননি। তাইতো মিরাজ, নাঈম কিংবা তাইজুল ও মোস্তাফিজকে ডাউন দ্য উইকেটে ও মিড উইকেটে উড়িয়েছেন সিদ্ধহস্তে। নামের পাশে ২০ চার ও ৭ ছক্কা তো সেই পরিসংখ্যানের প্রমাণ। সঙ্গে অভিষেকে সবচেয়ে বেশি ছক্কা হাঁকানোর রেকর্ডে দ্বিতীয় স্থানে মায়ার্স। অভিষেকে একমাত্র ডাবল সেঞ্চুরিয়ানের বিশ্বরেকর্ডও আঁকা রইলো চট্টগ্রামে।

অভিষেকে ডাবল সেঞ্চুরিতে ইতিহাস গড়লেন বাঁহাতি ব্যাটসম্যান মায়ার্স।

মায়ার্সের সঙ্গে ২১৬ রানের জুটি গড়েছিলেন আরেক অভিষিক্ত এনক্রুমাহ বোনার। ৮৬ রানের ঝকঝকে ইনিংস খেলে তাইজুলের বলে এলবিডাব্লিউ না হলে ১৪তম অভিষিক্ত সেঞ্চুরিয়ান হতে পারতেন। কিন্তু দিন শেষে ১৪ রানের আক্ষেপ নিশ্চিয়ই ভুলে গেছেন মায়ার্সের মহাকাব্য ও তরুণ দলের অবিস্মরণীয় জয়ে।

বার্বাডোজের রক্তে মিশে আছে হার না মানা মনোবল, জয়ের চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞা, প্রতি আক্রমণে বোলিং এলোমেলো করে দেওয়ার দৃঢ়সংকল্প ও ভয়ডরহীন মানসিকতা। সেখান থেকে উঠে এসে ক্রিকেট বিশ্ব শাসন করেছেন স্যার গ্যারফিল্ড সোবার্স, গর্ডন গ্রিনিজ, ডেসমন্ড হায়েন্সরা। মায়ার্সের শরীরে বার্বাডোজ রক্ত বহমান। তার ব্যাটিংয়ে ফুঠে ওঠে সেই শিল্প। চট্টগ্রামের ২২ গজে এ বার্বাডিয়ানের প্রতিটি অর্জন ইতিহাসের পাতায় টিকে থাকবে অযুত-নিযুত বছর। 

রূপকথার মতো ইনিংসে মায়ার্স বাংলাদেশকে দুইটি সুযোগ দিয়েছিলেন। সাত সকালেই ৪৭ রানে তাইজুল তার বোলিংয়ে রিভিউ নিলে বাঁহাতি ব্যাটসম্যান ফিরে আসতেন সাজঘরে। ৪৯ রানে মিরাজের বলে শান্ত স্লিপে দাঁড়িয়ে ক্যাচ নিতে পারলে অনবদ্য ইনিংস খেলা হতো না বার্বাডোজের নতুন বরপুত্রের। সব কিছুই গিয়েছে মায়ার্সের পক্ষে। ‘দাগ থেকে যদি দারুণ কিছু হয়, তাহলে দাগ-ই ভালো’- সার্ফ এক্সেলের এই বিজ্ঞাপনের সঙ্গে কে-ই বা পরিচিত নন। আক্ষরিক অর্থে, তাইজুল কিংবা শান্তর ভুলে যদি মায়ার্স নামের মহাকাব্য রচিত হয় তাহলে সেটা কি বড্ড বেমানান শোনাবে?

দলকে জেতানোর পর মায়ার্সের উল্লাস।

তরুণ দলকে অনুপ্রাণিত করতে ক্লাইভ লয়েড লিখেছিলেন, ‘যোগ্যতার ভিত্তিতেই তোমরা সুযোগ পেয়েছ। বিশ্বকে নিজের প্রতিভা, দক্ষতা দেখানোর চমৎকার এক উপায়। তোমরা দ্বিতীয় সারির ক্রিকেটার নও। তোমরাও শীর্ষ সারিতে উঠে আসতে পারো।’

মায়ার্স সুযোগটি শুধু কাজে লাগাননি। ক্রিকেট বিশ্বকে নিজের আগমণী বার্তা দিয়েছেন। তার এক ডাবলে প্রাক্তন ইংলিশ অধিনায়ক মাইকেল ভন টুইট করতে বাধ্য হয়েছেন, ‘মায়ার্স, নামটা মনে রাখুন।’ হার্শা ভোগলে সাফ জানালেন, ‘অভিষেকে সর্বকালের সেরা ইনিংস হয়ে থাকবে।’

সেই সঙ্গে ক্রিকেট ওয়েস্ট ইন্ডিজ মায়ার্সের এক সাক্ষাৎকারের স্ক্রিনশট শেয়ার করে লিখেন, ‘Man of his words.’ বাংলাদেশ সফরের আগে বার্বাডোজ নেশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মায়ার্স বলেছিলেন, ‘I am going to make a century.’ এবং তিনি করলেনও। সেটাকে ছাড়িয়ে নিয়ে গেলেন আরও দুই ধাপ বেশি- ডাবল সেঞ্চুরি করলেন, জেতালেন ম্যাচ। কথার মানুষই বটে!

চট্টগ্রাম/ফাহিম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়