বিসিবির ‘সাকিব কার্ড’
ক্রীড়া প্রতিবেদক || রাইজিংবিডি.কম
কোথাও, কোনো এক বেলায় সাকিব আল হাসান নিজ থেকেই বলেছিলেন, ‘‘যেভাবেই হোক, আমাকে ক্রিকেটে রাখেন। নইলে আপনাদের লাইফ বোরিং হয়ে যাবে।’’ সাকিবের সেই মজাটাই যেন বিসিবি অক্ষরে অক্ষরে অনুসরণ করলো! নয়তো ‘কোথাও কেউ নেই’ এর মতো কেন সাকিবের নামটা ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালকদের রুমে আবার উঠবে।
সাকিব নিজ থেকে কিছু করেননি। এমন কিছু করছেনও না যে, বাধ্য হয়ে তার নাম নিতেই হবে। কদিন আগেও তিনি ছিল ‘যন্ত্রণার’। সেই সাকিব হঠাৎ হয়ে উঠলেন প্রাণভোমরা।
গতকাল ক্রিকেট বোর্ডের আলোচনায় সাকিবের প্রসঙ্গ তোলেন নির্বাচনের সময় দেশের বাইরে থাকা এক পরিচালক। সাকিবকে জাতীয় দলে ফেরানোর বার্তা তিনিই প্রথম বোর্ডে তোলেন। নিজের পরিকল্পনা বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেন। তাতে খুব বেশি পরিচালকের মত পাওয়া যায়নি। কিন্তু ওই পরিচালকের ইঙ্গিত ছিল অনেকটাই পরিস্কার, ‘‘বোর্ডের খারাপ সময় যাচ্ছে। একটা ভালো খবর দাও।’’
বোর্ড সভা শেষে সংবাদ সম্মেলনে সাকিবকে জাতীয় দলে ফেরানোর আলোচনা পরিস্কার করেন মিডিয়া কমিটির চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেন, ‘‘যদি সাকিব আল হাসানের এভেইলেবিলিটি, ফিটনেস এবং অ্যাকসেসেবেলেটি; সঙ্গে যে ভেন্যুতে খেলা হবে, ওখানে যদি উপস্থিত থাকার মতো সক্ষমতা থাকে, অবশ্যই বোর্ড বা নির্বাচক প্যানেল সাকিব আল হাসানকে পরবর্তী সময়ে দলে নির্বাচনের জন্য বিবেচনা করবে।’’
ক্রিকেটের পাশাপাশি রাজনীতিতে নাম লিখানো সাকিব ২০২৪ সালে জাতীয় নির্বাচনে সাংসদ নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের ফলে ৬ মাসও রাজনীতি করতে পারেননি তিনি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সাকিবের নামে একাধিক মামলা হয়েছে, যার মধ্যে হত্যা মামলাও আছে। এছাড়া দুদকেও আছে তার মামলা। এসব কারণেও সাকিবের দেশে ফেরাটা কঠিন। চাইলেই দেশে ফিরে দেশের মাটিতে খেলতে পারবেন না।
বিসিবির নতুন করে তাকে মাঠে ফেরানোর উদ্যোগ যখন নিয়েছে তখন স্বাভাবিকভাবেই মাঠের বাইরে ব্যক্তিগত বিষয়গুলোও দেখবে এমনটাই মনে হচ্ছিল। কিন্তু আমজাদ সরাসরিই জানিয়ে দিয়েছেন, ‘‘সাকিবের ব্যক্তিগত যে ইস্যুগুলো তার নিজস্ব। সেগুলো সরকার কীভাবে দেখবে, সেটা সরকারের বিষয়। কিন্তু আমরা বোর্ডের পক্ষ থেকে সাকিবকে চেয়েছি, এটাই মূল কথা।’’
বোর্ডের খারাপ সময় বলতে, নানা কারণে বোর্ড তো খারাপ সময় পাড় করছে। বাংলাদেশ দলকে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বাদ দিয়েছে আইসিসি। বোর্ডের পরিচালক পদত্যাগ করেছেন। বোর্ডের এক পরিচালকের বিরুদ্ধে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। আরো পরিচালকের পদত্যাগের গুঞ্জন রয়েছে। এর আগে ক্রিকেটারদের নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করায় আন্দোলনের মুখে পরিচালক নাজমুল ইসলামকেও পদ থেকে সরাতে বাধ্য হন বুলবুল। ঢাকার ক্লাব ক্রিকেটের অচলাবস্থা ও দীর্ঘদিনের বিরোধ এখন চরমে। বিশ্বকাপে বাংলাদেশ নেই, ঘরোয়া ক্রিকেটে পরবর্তী সূচি নিয়ে কারো কাছে কোনো পরিষ্কার ধারণা নেই।
এ অবস্থায় সাকিব আল হাসানের ‘কার্ড’ খেলে অনেক আলোচনা পাশ কাটিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে বোর্ড। এমনটাই মনে করছেন ক্রীড়া সংগঠকরা। সাবেক এক বোর্ড পরিচালক রাইজিংবিডিকে মুঠোফোনে বলেছেন, ‘‘সাকিব আল হাসানকে নিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট যখন চায় তখন আলোচনা করতে পারে। তা নিয়ে কোনো বাঁধা নেই। কিন্তু রাজনীতির কারণে দেশের বাইরে থাকা সাকিবকে নিয়ে আলোচনা যখন-তখন হতে পারে না। সাকিব কেন বাংলাদেশে নেই তা সবাই জানে।’’
তিনি মনে করেন, ‘‘হুট করে বিসিবির এই আলোচনা ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য দুইটা। এক, দৃষ্টি-আলোচনা অন্যদিকে নিয়ে যাওয়া। দুই, দায়সারা কাজ! এটা হচ্ছে, ধরেন এই বোর্ডের ভবিষ্যৎ কী হবে কেউ কিন্তু বলতে পারবে না। একজন পরিচালক চলে গিয়েছেন। একজন ফিক্সিংয়ে অভিযুক্ত। একজন সে-ই যে দেশের বাইরে গিয়েছেন, আসার কোনো নাম-গন্ধ নেই। এমন একটা অস্থিতিশীল বোর্ড তো সাকিবের নাম হুট করে স্রেফ স্ট্যান্টবাজিই করলো।’’
যদিও বিসিবি পরিচালক আসিফ আকবরের দাবি, ‘‘সাকিবের ব্যক্তিগত ইস্যুগুলো সরকার দেখবে। সরকার কিভাবে সামলাবে, সেটা তাদের বিষয়। তবে বোর্ডের পক্ষ থেকে আমরা সাকিবকে চাই। তিনি সংসদ সদস্য হওয়ার আগেও বাংলাদেশের ক্রিকেটার ছিলেন এবং বহু জয়ের সাক্ষী।’’
সাকিবের জন্য হুট করে বোর্ডের এই দরদ বেড়ে যাওয়া কেউই স্বাভাবিকভাবে দেখছেন না। ঢাকার ক্লাব ক্রিকেটের জনপ্রিয় দলের ম্যানেজার রাইজিংবিডিকে বলেছেন, ‘‘এটা এমন যে আপনি জানেন আপনার সময় শেষ তখন বিতর্কিত একটা বিষয় তুলে দিয়ে আপনি চুপ করে সরে পড়লেন। সাকিবকে যদি তাদের লাগতই তাহলে তো বিশ্বকাপের দলে যুক্ত করতে পারত। সাকিবের ভারত বা শ্রীলঙ্কায় গিয়ে খেলতে তো সমস্যা নেই। হুট করে বিশ্বকাপের বাদ পড়ার দিনে এটাই কেন জানাতে হলো?”
গতকাল সংবাদ সম্মেলন শেষ হতেই আসিফ ও আমাজদকে উদ্দশ্য করে যখন শোনানো হয়, ‘‘বিশ্বকাপ ইস্যুর মধ্যে সাকিবকে সামনে এনে ভালোই খেলে দিলেন!’ কোনো জবাব না দিয়ে স্রেফ হেসে গেলেন দুজনই। খেলাটার নাম, বিসিবির ‘‘সাকিব কার্ড।’’
ঢাকা/ইয়াসিন/আমিনুল