যত্নে আঁকা ক্যানভাসে কিছুটা বিবর্ণতার ছোঁয়া
ইয়াসিন হাসান, সিলেট থেকে || রাইজিংবিডি.কম
সারাদিন ছিল শৃঙ্খলা, ধৈর্য আর লড়াইয়ের এক অনবদ্য প্রদর্শনী। ব্যাটে-বলে দারুণ পরিকল্পনায়, প্রয়োগে এগোচ্ছিল সব। দাপট দেখানো বোলিংয়ের পর ব্যাটিং শক্তির নিদারুণ প্রকাশ। মনে হচ্ছিল, দিনশেষে হাসিটাও থাকবে পুরোপুরি বাংলাদেশেরই।
কিন্তু ক্রিকেটের নির্মম সৌন্দর্যটাই হয়তো এখানে…শেষ বিকেলের মাত্র ত্রিশ মিনিটে ছন্দ হারিয়ে সবকিছু খানিক এলোমেলো হয়ে গেল। যত্নে আঁকা ক্যানভাসে লেগে গেল কিছুটা বিবর্ণতার ছোঁয়া, তবু দিনের বড় অংশজুড়ে বাংলাদেশের লড়াই ছিল প্রশংসার দাবিদার। তাতে ম্যাচের নাটাইটা এখনও বাংলাদেশের হাতেই।
২১ রানে দিন শুরু করে পাকিস্তান অলআউট হয়ে যায় ২৩২ রানে। ৪৬ রানের লিড নিয়ে দ্বিতীয় ইনিংস শুরু করে বাংলাদেশ ৩ উইকেটে ১১০ রান তুলে দিন শেষ করে। লিড ১৫৬ রানের, এটাই বড় স্বস্তির।
গোধূলি লগ্নে বাংলাদেশের হতাশা বাড়ানো নতুন কোনো ঘটনা নয়। অভিষিক্ত তানজিদ (৪) শুরুতে হাল ছেড়ে দেওয়ার পর মাহমুদুল ও মুমিনুল যেভাবে প্রতি আক্রমণে গিয়ে রান তুলেছেন তাতে পাকিস্তানের মানসিকতায় চিড় ধরিয়ে দিয়েছিল। শেষ বিকেলে আলগা বোলিংয়ে তারাও লড়াইয়ের তেজ দেখাননি। কিন্তু মাহমুদুল নিজের উইকেট উপহার দিয়ে আসার পর মুমিনুল দিনের খেলার ৩ বল বাকি থাকতে যেভাবে আউট হলেন তাতে বাংলাদেশের সুখী ড্রেসিংরুমে এখন বিষাদের সুর। প্রথম ইনিংসে শূন্যর পর দ্বিতীয় ইনিংসে মাহমুদুলের ব্যাট থেকে আসল ৫২ রান। মুমিনুল থামেন ৩০ রানে।
তবুও হাল না ছেড়ে আগামীকাল পুরোদিন ব্যাটিং করার কথা বললেন নাহিদ, ‘‘আমরা কাল সারাদিন ব্যাটিং করতে চাই।’’
বাংলাদেশের বোলিং পারফরম্যান্স দুই সেশনে যতটা আলো ছড়িয়েছে, গর্ব করিয়েছে, শেষটা আরেকটু ধারালো হলে মন ভরিয়ে দিত। সকালের সেশনের ৭৫ রানে ৪ উইকেট এবং চা-বিরতির আগ পর্যন্ত ১১০ রানে আরও ৪ উইকেট বাংলাদেশের বোলারদের পকেটে। অথচ শেষটায় অস্বস্তিকর কিছু রানের বিনিময়ে বাংলাদেশ পেয়ে যায় বাকি ২ উইকেট। ২৬ রান যোগ হয় শেষ সেশনে। যেখানে তাইজুল ইসলাম তিন ছক্কা হজম করেন সাজিদ খানের ব্যাটে। তবুও ৪৬ রানের লিড বাংলাদেশকে এগিয়ে দিয়েছে অনেকদূর।
বাংলাদেশের দিনের শুরুটা হয়েছিল স্বপ্নের মতোই। তাসকিন আহমেদের পরপর দুই ওভারে দুই ওপেনার আব্দুল্লাহ ফজল ও আজান আওয়াইজ সাজঘরে। ফজল তাসকিনের বেরিয়ে যাওয়া বলে ব্যাট সরাতে না পেরে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দেন। আজান গতিতে পরাস্ত হয়ে ক্যাচ দেন স্কয়ার লেগে। প্রথম ঘণ্টায় তাসকিনের জোড়া আঘাতে বাংলাদেশ এগিয়ে যায়। পরের ঘণ্টায় মিরাজ দেখান নিজের কারিশমা। বাবর আজম ও শান মাসুদ প্রতি আক্রমণে গিয়ে রান তোলার চেষ্টা করেন। বাবর চেষ্টায় সফল হলেও শান থেমে যান অল্পতেই। মিরাজের বল উইকেট থেকে সরে জায়গা বানিয়ে ড্রাইভ করেছিলেন পাকিস্তানের অধিনায়ক। কিন্তু কাভারে বদলি ফিল্ডার নাঈম হাসানের তালুবন্দি হয়ে যান। এরপর সৌদ শাকিল মিরাজের বল সুইপ করতে গিয়ে টপ এজ হয়ে লিটনের গ্লাভসবন্দী হন। সকালের আর্দ্রতা, নতুন বলের উজ্জ্বলতা বেশ ভালোভাবে কাজে লাগিয়ে পাকিস্তানকে চাপে রেখে বাংলাদেশ এগিয়ে যায় নিমিষেই।
ফিফটি তুলে বাবর কিছুটা ভয় দেখাচ্ছিলেন। তাকে সঙ্গে দেওয়া সালমান আগাও রয়েশয়ে খেলছিলেন। ৯১ বলে ৬৩ রানের জুটি হয়ে উঠছিল মাথা ব্যথার কারণ। কিন্তু পিঠাপিঠি সময়ে দুজনই হাল ছেড়ে দেন। নাহিদ রানার ১৪৭ ছোঁয়া গতির লেন্থ বল ফ্লিক করে উড়াতে চেয়েছিলেন। কিন্তু প্লেসমেস্ট ঠিকমতো করতে পারেননি। মিড অনে থাকা মুশফিকুর রহিম জায়গায় দাঁড়িয়ে সহজে ক্যাচ নেন। ৮৪ বলে ৬৮ রান করে বাবর ফেরেন সাজঘরে। এরপর তাইজুলের বলে স্লগ সুইপ করে স্কয়ার লেগে ধরা পড়েন ২১ রান করা সালমান আগা।
পরের ঘণ্টায় তাইজুলের শিকার আরও দুই উইকেট। রিয়াজনকে সরাসরি বোল্ড করার পর হাসান আলীকে মিড অনে নাহিদের হাতে তালুবন্দি করান।
১৮৪ রানে ৮ উইকেট হারানো পাকিস্তান শেষ ২ উইকেটে আর কতদূর-ই বা যেতে পারেন? এমন ভাবনা যখন দোলাচল দিচ্ছিল তখন অনর্থক কিছু রান যোগ হয় স্কোরবোর্ডে। সাজিদ খান ৩৮ এবং খুররাম শেহজাদ ১০ রান তুলেন। সীমানায় শরিফুল ক্যাচ নিয়েছিলেন খুররামের। কিন্তু বল যখন তার হাতের মুঠোয় জমে তখন পা স্পর্শ করে বাউন্ডারি রোপের।
শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান শিবিরে শেষ দুই পেরেক ঠুকে দিয়ে তাদের অলআউট করেন নাহিদ। ৬০ রানে তার শিকার ৩ উইকেট। তাইজুল ৬৭ রানে পেয়েছেন সমান উইকেট। ২টি করে উইকেট নেন মিরাজ ও তাসকিন।
ঢাকা/আমিনুল