হাই তোলা খুবই সংক্রামক, শুরু হয় জন্মের আগেই: গবেষণা
প্রতীকী ছবি
হাই তোলা খুবই সংক্রামক। শরীর ক্লান্ত থাকুক বা না থাকুক, অনেক সময় পাশে থাকা কাউকে হাই তুলতে দেখলে কিংবা কেবল হাই তোলার কথা শুনলেই নিজের অজান্তেই মুখ হাঁ হয়ে যায়।
এমনকি আপনি অন্য প্রাণীদের দেখেও হাই তুলতে পারেন। মেরুদণ্ডী প্রাণীদের মধ্যে এটি একটি সার্বজনীন ঘটনা, যা আমাদের কঠোর পরিশ্রমী মস্তিষ্ককে সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বলে মনে করা হয়। হাই তোলা কেন এত সংক্রামক, তার কারণ এখনও অজানা।
তবে নতুন এক গবেষণা বলছে, হাই তোলার এই সংক্রামক প্রভাব আমাদের জন্মের আগেও শুরু হতে পারে। ইতালির ইউনিভার্সিটি অব পারমার গবেষকের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। খবর সায়েন্স অ্যালার্টের।
নতুন এই তথ্যটি প্রসবপূর্ব (জন্মের আগের) হাই তোলা সংক্রান্ত বর্তমান ধারণাগুলোর সম্পূর্ণ বিরোধী। এতদিন বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, ভ্রূণের বিকাশের খুব শুরুর দিকে- গর্ভধারণের প্রায় ১১ সপ্তাহ পরে- ভ্রূণ হাই তুলতে শুরু করে।
এতদিন পর্যন্ত এটি পরিষ্কার ছিল না যে, ভ্রূণগুলো কি কেবল তাদের নিজস্ব সময়সূচী অনুযায়ী হাই তোলে, নাকি পৃথিবীতে আসার আগেই তারা মায়েদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এটি করা শুরু করে।
নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, তারা সত্যিই মায়ের সঙ্গে তাল মেলায়।
গবেষণাটি যেভাবে করা হয়েছে
এই গবেষণায় ১৮ থেকে ৪৫ বছর বয়সী ৩৮ জন গর্ভবতী নারী অংশ নিয়েছিলেন। প্রত্যেক নারীই তাদের একটি সন্তানসহ গর্ভাবস্থার তৃতীয় ত্রৈমাসিকে (গর্ভধারণের ২৮ থেকে ৩২ সপ্তাহের মধ্যে) ছিলেন।
পরীক্ষার জন্য, মায়েদের একটি শান্ত ঘরে স্ক্রিনের সামনে বসানো হয়েছিল। যেখানে একদিকে তাদের মুখের অভিব্যক্তি রেকর্ড করা হচ্ছিল এবং অন্যদিকে একটি আল্ট্রাসাউন্ড মেশিনের সাহায্যে তাদের ভ্রূণ পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছিল।
শুরুতে, মায়েদের এক মিনিটের একটি সাধারণ প্রাকৃতিক দৃশ্যের ভিডিও দেখানো হয়। এর মাধ্যমে গবেষকরা মা ও ভ্রূণ স্বাভাবিক অবস্থায় কেমন আচরণ করে, তার একটি প্রাথমিক ধারণা নেন।
এরপর, তারা মায়েদের ৬ মিনিটের তিনটি ভিন্ন ভিন্ন ভিডিও দেখান। তার মধ্যে একটি ভিডিওতে মানুষ হাই তুলছিল। অন্য একটি ভিডিওতে মানুষ মুখ খুলছিল ও বন্ধ করছিল, যা দেখতে অনেকটা হাই তোলার মতো হলেও আসল হাই তোলা ছিল না। শেষ ভিডিওটিতে সাধারণ শান্ত ও স্বাভাবিক মুখের অভিব্যক্তি দেখানো হয়।
ডাটা বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে যেন কোনো রকম পক্ষপাতিত্ব না থাকে, সেজন্য মা ও ভ্রূণের রেকর্ডিংগুলো ফ্রেম-বাই-ফ্রেম খুবই সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। এই কাজটি করেছিলেন এমন তিনজন সহকারী, যারা জানতেনই না যে রেকর্ডিংয়ের সময় মায়েরা কোন ভিডিওটি দেখছিলেন।
গবেষণার ফলাফল
বেশিরভাগ মা-ই হাই তোলার ভিডিওটি দেখার সময় অন্তত একবার হাই তুলেছিলেন। আর যারা হাই তুলেছিলেন, তাদের মধ্যে ১৮ জনের ভ্রূণও মায়ের সাথে সাথে হাই তুলতে শুরু করেছিল।
গবেষকরা জানান, “মায়ের হাই তোলার পর ভ্রূণের হাই তোলার প্রবণতা বিশেষভাবে বৃদ্ধি পায়, যা অন্য কোনো সাধারণ বা নিয়ন্ত্রণাধীন পরিস্থিতিতে দেখা যায়নি।”
হাই তোলার এই তরঙ্গটি মা থেকে ভ্রূণে পৌঁছানোর জন্য হাই তোলার ভিডিওটি কতটা জরুরি ছিল, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। কারণ এই নির্দিষ্ট পরিস্থিতি ছাড়া অন্য কোনো সময়ে হাই তোলার ঘটনা তেমন একটা ঘটেনি।
হাই তোলার ভিডিও সেশনের পুরো সময় জুড়ে, অর্ধেক ক্ষেত্রে মা এবং ভ্রূণ একই সঙ্গে হাই তুলেছিল। আর ৩৩ শতাংশ ক্ষেত্রে তাদের কেউই হাই তোলেনি।
ভিডিও দেখার সময় মাত্র ১৪ শতাংশ ক্ষেত্রে মা একা হাই তুলেছিলেন (ভ্রূণ তোলেনি), আর ভ্রূণ একা হাই তুলেছিল মাত্র ৩ শতাংশ ক্ষেত্রে।
অন্যদিকে, নিয়ন্ত্রণাধীন বা সাধারণ ভিডিও সেশনের সময় মাঝেসাঝে হাই তোলার ঘটনা ঘটলেও, ৮০ শতাংশ সময়ই মা বা ভ্রূণ-কেউই কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি।
মজার বিষয় হলো, গবেষকরা লক্ষ্য করেছেন যে, “যেসব মায়েরা বেশি হাই তুলেছেন, তাদের ভ্রূণও বেশি হাই তোলার প্রবণতা দেখিয়েছে। যা মা ও ভ্রূণের হাই তোলার হারের মধ্যে একটি শক্তিশালী ইতিবাচক সম্পর্ক প্রকাশ করে।”
সায়েন্স অ্যালার্টের প্রতিবেদন বলছে, এসব তথ্য ইঙ্গিত করে যে, হাই তোলার এই সংক্রামক স্বভাবের শিকড় অনেক গভীরে, যা আমাদের ধারণার চেয়েও জীবনের অনেক প্রাথমিক স্তরে শুরু হয়।
রয়েছে কিছু সীমাবদ্ধতাও
বিজ্ঞানীরা স্বীকার করেছেন যে, এই গবেষণার পরিধি কিছুটা ছোট ছিল। মাত্র ৩৮ জন ইতালীয় নারীর ওপর এই পরীক্ষা চালানো হয়েছে। তাই গর্ভাবস্থার ঠিক কোন সপ্তাহ থেকে এই সমন্বয় শুরু হয় এবং পৃথিবীর সব অঞ্চলের মানুষের ক্ষেত্রে এটি একইভাবে কাজ করে কিনা, তা নিশ্চিত হতে আরো বড় পরিসরে গবেষণার প্রয়োজন।
তাছাড়া, মা হাই তুললে গর্ভের সন্তানের কাছে সেই বার্তাটি ঠিক কোন শারীরিক বা স্নায়বিক পথ ধরে পৌঁছায়, তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। এ বিষয়টি আরো বড় একটি প্রশ্নের দিকে নিয়ে যায়- আমরা কেন আদৌ হাই তুলি?
বর্তমানে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ধারণাটি হলো, আমরা আমাদের মস্তিষ্ককে ঠান্ডা করার জন্য হাই তুলি। তবে, নতুন প্রযুক্তি যার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা মানুষের মস্তিষ্কের ভেতরে নজর রাখতে পারছেন, তা প্রতিনিয়ত এর বিকল্প বা অতিরিক্ত ব্যাখ্যা হাজির করছে।
আর হাই তোলা কেন এত বেশি সংক্রামক, তা-ও এখনো একটি রহস্য। তবে মা ও তার অনাগত সন্তানের ক্ষেত্রে, এটি কেবল চোখে দেখার মাধ্যমে অনুকরণ করার চেয়েও গভীর কিছু হতে পারে, যা সাধারণত প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে হাই তোলার কারণ হয়ে থাকে।
গবেষকরা লিখেছেন, “বরং, এই ঘটনাটি জরায়ুর ভেতরের এক ধরনের শারীরিক ছোঁয়াচে প্রক্রিয়ার সঙ্গে বেশি সংগতিপূর্ণ, যা সম্ভবত মায়ের শারীরিক কর্মকাণ্ড ও তার অভ্যন্তরীণ শারীরিক প্রতিক্রিয়ার ওপর ভিত্তি করে ঘটে।”
“সংক্রামক হাই তোলাকে এমন একটি শারীরিক প্রক্রিয়ার সামাজিক বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বোঝা যেতে পারে, যা মানব শিশুর বিকাশের খুব শুরুর দিকেই বেশ শক্তিশালী ও কার্যকরভাবে তৈরি হয়ে যায়।”
এই গবেষণাটি বিজ্ঞান সাময়িকী ‘কারেন্ট বায়োলজি’-তে প্রকাশিত হয়েছে।
ঢাকা/ফিরোজ