তাজউদ্দীন আহমদের রাজনৈতিক জীবন : চতুর্থ পর্ব
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী || রাইজিংবিডি.কম
তাজউদ্দীন আহমদ এবং সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন
।। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ।।
শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাজউদ্দীন আহমদের মাঝে যে সম্পর্কটি স্থাপিত সেটি তাদের উভয়ের জন্য তো বটেই, আমাদের সমষ্টিগত ইতিহাসের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এটা অনিবার্য ছিল যে তারা একসাথে কাজ করবেন, এবং কাজের সময়ে ও ভেতর দিয়ে একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠবেন। দু’জনের মধ্যে বয়সের দূরত্ব ছিল পাঁচ বছরের, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবধান ছিল উল্লেখযোগ্য। স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশের প্রথম পররাষ্ট্র সচিব এস. এ করিম তার লেখা Sheikh Mujib, Triumph and Tragedy বইতে এই ব্যবধানের কথা বলতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে মুজিব ছিলেন অতুলনীয় বক্তা এবং সাধারণ মানুষের মনের ভাব ও ইচ্ছাকে সরল ভাষায় তুলে ধরে তাদের আস্থা ও ভালোবাসা জয় করে নেবার ব্যাপারে তার ক্ষমতা ছিল অসাধারণ। তিনি তার দলকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। অন্যদিকে তাজউদ্দীনের ছিল তীক্ষ্ণ বুদ্ধি এবং সুশৃঙ্খল মন; তিনি যে খুব ভালো বক্তা ছিলেন তা নয়, কিন্তু আলাপ-আলোচনার বেলায় ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ। তার কর্তব্যবোধ ছিল দৃঢ় দুর্দান্ত।
দু’জনের দৃষ্টিভঙ্গিতেও পার্থক্য ছিল। ডা. করিম ছিলেন উভয়েরই বন্ধু; ১৯৬২ সালে তারা একসঙ্গে জেলে ছিলেন; তখন তিনি দেখেছেন যে পূর্ববঙ্গকে যে স্বাধীন করতে হবে এ-বিষয়ে উভয়ের ভেতর ঐকমত্য ছিল, কিন্তু কোন পথে এগুতে হবে, তা নিয়ে বিস্তর তর্কবিতর্ক হতো। মন কষাকষির ঘটনা যে ঘটতো না তা-ও নয়। একদিনের কথা তার বিশেষভাবে মনে আছে। সেদিন তারা সবাই মিলে ভলিবল খেলছিলেন। একদিকের দলপতি শেখ মুজিব, অন্যদিকের দলপতি তাজউদ্দীন। হঠাৎ একটি পয়েন্ট নিয়ে দু’দলের ভেতর বচসা বেধে যায়; রেফারি ছিলেন মানিক মিয়া, তিনি রায় দিলেন পয়েন্ট কেউ পাবে না। খেলা নতুন করে শুরু হলো। মুজিবের দল জিতল, করিম লিখছেন : ‘‘মুজিব বললেন, ‘দেখলে ধর্মের কল বাতাসে নড়ে’। তাজউদ্দীন টিপ্পনী কেটে বললো, ‘হ্যাঁ যে-দিকে বাতাস সে-দিকে নড়ে’। তাজউদ্দীনের ওই মন্তব্যে দু’জনের ভেতর ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়, এবং কয়েকদিন কথাবার্তা বন্ধ থাকে।’’ করিমের ধারণা শেখ মুজিব মনে করেছিলেন যে, তাজউদ্দীন ধর্মকে তাচ্ছিল্য করেছেন। কিন্তু তিনি নিশ্চিত যে তাজউদ্দীন তা করেন নি।
১৯৬২তে আন্দোলন ছিল না; নেতারা সবাই বন্দী ছিলেন; স্রোতহীনতার ওই সময়ে ভুল বোঝাবুঝিটা অস্বাভাবিক ছিল না; কিন্তু ১৯৬৪তে যখন রাজনৈতিক তৎপরতার একটি প্রবাহ তৈরি হলো তখন দেখি শেখ মুজিব ও তাজউদ্দীন এক হয়ে গেছেন; মুজিব আছেন সামনে, নেতা তিনিই; কিন্তু সবাই বুঝতে পারছেন যে, তাজউদ্দীন আছেন সঙ্গেই, পরিপূরক হিসাবে। ছয় দফার ঘোষণা দেবার পর জুলফিকার আলী ভুট্টো মুজিবকে বিতর্কে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। মুজিব সে-চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন। ভুট্টো তার উপদেষ্টাদের নিয়ে ঢাকায় এলে তাজউদ্দীন তার সঙ্গে দেখা করেন, বিতর্কের আনুষ্ঠানিকতা ঠিক করার জন্য। তার সাথে কথা বলে ভুট্টো বুঝেছেন বিতর্কের জন্য এপক্ষ থেকে যে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে তাতে তিনি সুবিধা করতে পারবেন না। তর্কযুদ্ধে না নেমে ভুট্টো সদলবলে প্রস্থান করেন। সাতই মার্চের সেই ঐতিহাসিক বক্তৃতাটি বঙ্গবন্ধুরই; কিন্তু তার পেছনেও তাজউদ্দীন ছিলেন; কোন কোন পয়েন্টে বলতে হবে তা তিনিই সাজিয়ে দিয়েছেন; এবং মঞ্চে বসে সতর্কতার সঙ্গে লক্ষ্য করেছেন কোনোটি যেন অঘোষিত না থাকে। এর পরে শুরু হয় অসহযোগ, তখন বাংলাদেশের সরকার চলতো আওয়ামী লীগের নির্দেশে। পঁয়ত্রিশটি নির্দেশ জারি করা হয়েছিল, সেগুলো তাজউদ্দীনের হাতেই রচিত। দেশের কাছে মুজিব তখন অদ্বিতীয়, আর তাজউদ্দীন অদ্বিতীয় মুজিবের কাছে।
চরম মুহূর্তটি এসেছিল পঁচিশে মার্চের রাত্রে। পাকিস্তানি হানাদারেরা কী করবে টের পাওয়া যাচ্ছিল, কিন্তু আন্দোলনের নেতারা কী করবেন সেটা ছিল অনিশ্চিত। এখন জানা যাচ্ছে যে, পরিকল্পনা ছিল আত্মগোপন করে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া হবে, এবং অনিবার্য যুদ্ধে মুজিব ও তাজউদ্দীন একসঙ্গে থাকবেন। তদানুযায়ী তাজউদ্দীন গেলেন বঙ্গবন্ধুর কাছে; গিয়ে শোনেন তিনি ঠিক করেছেন বাড়িতেই থাকবেন, তাজউদ্দীনদের সঙ্গে যাবেন না। দেশের ইতিহাস তখন তাকিয়ে ছিল সিদ্ধান্তের দিকে, সিদ্ধান্ত এলো না। তাজউদ্দীন একটি লিখিত বিবৃতি নিয়ে গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর স্বাক্ষরের জন্য, একটি টেপ রেকর্ডারও তার সঙ্গে ছিল, নেতার কণ্ঠস্বরে দিকনির্দেশ রেকর্ড করবেন এই আশায়। স্বাক্ষর পেলেন না, কণ্ঠস্বরও পেলেন না। হানাদার বাহিনী যে হত্যাকাণ্ড শুরু করবে তার সব লক্ষণ তখন স্পষ্ট, খবরও আসছে নানা সূত্রে। মোকাবিলা করতে হলে নেতাকে চাই, বঙ্গবন্ধু তখন জাতির অবিসংবাদিত নেতা, তাকে বাদ দিয়ে যুদ্ধ চলবে কী করে? তাছাড়া তার অনুপস্থিতিতে কার পরে কে থাকবেন সেই ক্রমটি যেহেতু তিনি জানিয়ে দেন নি, তাই নেতৃত্বের কেবল যে অভাব ঘটবে তা নয়, যারা থাকবেন তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেবে, কেউ কাউকে মানতে চাইবেন না, ফলে সঙ্কটের সৃষ্টি হবে। এসব যুক্তি তাজউদ্দীন দিয়েছেন। কিন্তু নেতা অনড় ছিলেন তার সিদ্ধান্তে।
হতাশা ও অভিমানে তাজউদ্দীন নিজের বাড়িতে ফিরে কিছুক্ষণ বিছানাতেই শুয়ে ছিলেন। কিন্তু সেভাবে তো থাকা সম্ভব নয়; উঠে পড়েছেন, বাড়ির সামনের লনে পায়চারি করছেন। ওদিকে সময় সঙ্কুচিত হয়ে আসছিল; যে-ঘড়ির কাঁটা ধরে তিনি সব সময়ে চলতেন সেটি এগুচ্ছিল। যে-মানুষটি সব সময়েই দ্রুত ও সবার আগে সিদ্ধান্ত নিতেন এবং যার সিদ্ধান্ত অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অভ্রান্ত প্রমাণিত হয়েছে, ইতিহাসের ওই বিশেষ মুহূর্তটিতে, এবং জীবনে প্রথম বারের মতো, তিনি নিজেকে সম্পূর্ণ কেবল অপ্রস্তুত নয়, একেবারেই কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় দেখতে পেয়েছেন। শেষ পর্যন্ত কী ঘটতো আমরা জানি না, যদি না তরুণ রাজনীতিক ব্যারিস্টার আমীর-উল-ইসলাম প্রায় জোর করে তাকে উঠিয়ে নিয়ে যেতেন। এর অল্পক্ষণ পরেই হানাদারেরা এসে পড়েছিল। তাদের হাতে পড়লে তিনি হয়তো নিহত হতেন। কারণ গণহত্যার স্থানীয় পরিকল্পনাকারীদের শীর্ষে ছিলেন যে সেনাপতি সেই রাও ফরমান আলী তাজউদ্দীনকে বিশেষভাবে অপছন্দ করতেন। তাছাড়া বঙ্গবন্ধুকে আটক করা ও জীবিত রাখা দুটোই তাদের জন্য জরুরি ছিল; তাজউদ্দীনের ক্ষেত্রে জীবিত রাখার কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না। শত্রু নির্ণয়ের ব্যাপারে বিশেষ মহলের বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় একাত্তরে আরো দেখা গেছে, যেমন পাকিস্তানপন্থী গোলাম আযম মনে করতেন শেখ মুজিবের চেয়েও বড় দুশমন হচ্ছেন মওলানা ভাসানী; এবং জাতীয়তাবাদী মুজিববাহিনী ভাবতো তাদের প্রধান শত্রু পাকিস্তানিরা নয়, প্রধান শত্রু বামপন্থীরা। জহুরীরা যদি জহরই না চিনবে তবে তো তাদের পরিচয় বৃথা। তাজউদ্দীন না থাকলে ঘটনা কোন দিকে গড়াতো আমরা জানি না, তবে এটুকু জানি যে, মানুষের মধ্যে দিগভ্রান্তি ও হতাশা দুটোই বাড়তো এবং শত্রু পক্ষের গণহত্যা ও নারী নির্যাতন কাজটা আরো নৃশংস ও বীভৎস আকার ধারণ করতো। হানাদাররা তো বলতোই যে, তারা মানুষ চায় না, মাটির দখল চায়।
বাড়ি থেকে বেরিয়েই কিন্তু তাজউদ্দীন সমস্ত দ্বিধা ত্যাগ করে অবিলম্বে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। তার জানা হয়ে গেছে যে, অন্য কোনো উপায় নেই, যুদ্ধে যাওয়া ছাড়া। কিন্তু যুদ্ধটা কেমন হবে, কীভাবে লড়তে হবে, মিত্র হিসাবে কাদের পাওয়া যাবে, যোদ্ধা ও অস্ত্র কে সরবরাহ করবে সেসব একেবারেই জানা ছিল না। মুক্তির জন্য এত বড় একটি জনগোষ্ঠীর এমন প্রস্তুতিহীন যুদ্ধ ইতিহাসে বিরল। শুরুতে তাজউদ্দীন মনে হয় ধারণা করতে পারেননি শত্রু কেমন ভয়ঙ্কর ও সুসজ্জিত। নইলে তিনি কেন অমন ব্যস্ত হবেন চটের থলিতে-রাখা রাইফেলটির খোঁজে, যেটিকে পরে কোথায় ফেলবেন সেটাই এক সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছিল। কেবল তিনি নন, আরো অনেকেই যুদ্ধক্ষেত্রে প্রয়োজন হবে মনে করে নিজেদের সংগৃহীত অকিঞ্চিতকর হাতিয়ার নিয়ে রওনা হয়ে দেখেছেন হাতিয়ার বরং বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চীনপন্থী কমিউনিস্ট বলে পরিচিত মোহাম্মদ তোয়াহা ও বদরুদ্দীন উমর বের হয়ে পড়েছিলেন অনিশ্চিত যাত্রায়, তাদের সঙ্গে কিছু অস্ত্রশস্ত্র ছিল; সেগুলো নিয়ে বিশেষভাবে বিপদে পড়েছিলেন। কোথায় ফেলবেন কীভাবে ফেলবেন সে এক মহাসমস্যা। তাদের সঙ্গে ছিল দু’জন কিশোর, তারাও রওনা হয়েছে যুদ্ধে যাবে বলে, কিন্তু তারা বিপদে পড়েছে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়াশোনার দরুন ভালো বাংলা বলতে পারে না বলে। গ্রামের লোকদের সন্দেহ হয়েছে এরা বিহারী, অতিউৎসাহীরা কিছু লোক ঠিক করেছিল তাদেরকে হত্যা করে পাঞ্জাবিদের বাঙালি নিধনের প্রতিশোধ নেবে। অনেক কষ্টে কিশোর দু’টিকে তাৎক্ষণিকভাবে বাঁচানো সম্ভব হয়েছে। একই ধরনের বিপদে পড়েছিলেন অধ্যাপক রেহমান সোবহান ও অধ্যাপক আনিসুর রহমান। তারাও রওনা হয়েছিলেন যুদ্ধে যাবার জন্য, কিন্তু ভাষা ও উচ্চারণের সমস্যার দরুণ অবাঙালি বলে চিহ্নিত হয়েছিলেন। বাঁচা অসম্ভব হতো ঢাকা কলেজের অধ্যাপক মোহাম্মদ নোমান যদি ঘটনাস্থলে উপস্থিত না হতেন। তিনি তখন পাশের গ্রামে ছিলেন।
তাজউদ্দীনের জন্য অবশ্য এ ধরনের কোনো সমস্যা ছিল না। অস্ত্র ফেলে দিয়ে তিনি বের হয়েছিলেন লুঙ্গি ও ফতুয়া পরে, বাজারের থলিও ছিল হাতে। তবে তার জন্য ছদ্মবেশ ছিল অপ্রয়োজনীয়, কেননা চতুর্দিকের প্রায় সব মানুষই তখন আওয়ামী লীগের সমর্থক। আওয়ামী লীগের নেতা এবং কর্মীরাও ছিলেন প্রায় সর্বত্র। তবু বিঘ্ন ছিল বৈকি। অজানা বিপদ যে কোনো দিক থেকে আক্রমণ করত পারতো। শরণার্থীরা সবাই তখন সীমান্তমুখী, আমীর-উল-ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে তাজউদ্দীনও যাচ্ছিলেন সেদিকেই। কিন্তু স্রোতের প্রবাহে নয়, স্বতন্ত্রভাবে। ব্যারিকেড সৃষ্টি করে শহরে প্রতিরোধের চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু কোনো কাজে লাগেনি। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির বর্তমান সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম তখন ছাত্রনেতা। সম্ভাব্য সেনা আক্রমণের হাত থেকে ঢাকা শহরকে রক্ষা করার ব্যাপারে তারা যেসব উপায়ের কথা তখন ভেবেছিলেন সেগুলোর মধ্যে ছিল বিভিন্ন বাড়ির ছাদের ওপরে গরম ভাতের মাড়, মরিচের গুঁড়া ইত্যাদি রাখা, যাতে সেনাবাহিনী মার্চ করলে তাদের ওপর সেসব নিক্ষেপ করে রুখে দেয়া যাওয়া। তিনি মন্তব্য করেছেন, ‘একটি আধুনিক সেনাবাহিনীর বিপরীতে এমন ছেলেমানুষি প্রস্তুতি এখন হাস্যকর মনে হতে পারে, কিন্তু এর মধ্য দিয়ে আমাদের মাঝে যে আবেগ ছিল তার বলিষ্ঠ প্রমাণ পাওয়া যায়।’ সেটা সত্য। আবেগের কোনো অভাব ছিল না, অভাব ছিল প্রস্তুতির, এমন কি সঠিক ধারণারও।
মওলানা ভাসানী কিন্তু জানতেন কী করতে হবে। ১৯৫৭ সাল থেকেই তিনি স্বাধীনতার কথা প্রকাশ্যে বলে আসছেন। একাত্তরেও তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন যে, পাকিস্তানি সেনাপতিদের সঙ্গে আলোচনায় কোনো ফল হবে না, তারা বেঈমানী করবে। তার সে-ধারণা পুরোপুরি সত্য প্রমাণিত হয়েছে। পাকিস্তানি সেনাপতিরা যে কেবল বিশ্বাসঘাতকতাই করেছে তা নয়, আলোচনাকে আবরণ হিসাবে ব্যবহার করে গণহত্যার প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। পঁচিশে মার্চের পরে মওলানা ভাসানী গ্রামের বাড়িতেই ছিলেন, ৬ এপ্রিল যখন হানাদারেরা সে-বাড়িতে আক্রমণ চালাল তখন তিনি একবস্ত্রে বেরিয়ে গেছেন এবং যমুনা নদী দিয়ে নৌকায় ভাসতে ভাসতে আসামে গিয়ে উঠেছেন। হয়তো আশা ছিল ভারত থেকে বের হয়ে লন্ডন যাবেন, এবং সেখানে একটি প্রবাসী বিপ্লবী সরকার গঠন করে যুদ্ধ পরিচালনা করবেন। সেটা যে সম্ভব নয় তা ভারতের মাটিতে পা দিয়েই বুঝে ফেলেছেন। বাকি সময়টা তিনি অন্তরীণেই কাটিয়েছেন, কিন্তু নিজের অবস্থা নিয়ে একদিনের জন্যও কোনো আপত্তি তোলেননি, বরং বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে আবেদন জানিয়েছেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সাহায্য করার জন্য।
ভাসানীকে ভারতে পেয়ে তাজউদ্দীন নিশ্চয়ই খুশি হয়েছিলেন। একপর্যায়ে অস্থায়ী সরকারের জন্য যখন একটি সর্বদলীয় উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের প্রয়োজন দেখা দেয় তখন মওলানাকেই তার সভাপতি করা হয়, এবং তিনি বিনা দ্বিধায় সে-পদ গ্রহণ করেন। ওই পরিষদের সভা অবশ্য একবারই বসেছিল; তাজউদ্দীন সন্তুষ্ট হতেন সভা যদি আরো হতো এবং পরিষদকে যদি স্থায়ী রূপ দেওয়া যেতো। যুদ্ধটাকে শুধু আওয়ামী লীগের না-রেখে জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের রূপদানে তিনি আগ্রহী ছিলেন। ওই আগ্রহ থেকেই উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু পরিষদকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলা কোনো মতেই সম্ভব ছিল না। প্রবল আপত্তি ছিল আওয়ামী লীগের ভেতর থেকেই। ব্যতিক্রম বাদ দিয়ে, আওয়ামী লীগের নেতারা কেউই প্রত্যক্ষ যুদ্ধক্ষেত্রে ছিলেন না, তাদের অধিকাংশই থাকতেন হয় কলকাতায় নয়তো আগরতলায়। তাদের ভেতর দলাদলি ছিল, কিন্তু ঐক্য ছিল এক জায়গায়, সেটা হলো যুদ্ধ থেকে বামপন্থীদের দূরে রাখা। যুদ্ধের সম্ভাব্য সুফলের সবটুকুর ওপরই তাদের চোখ ছিল। মুক্তিবাহিনীতে বামপন্থী তরুণদেরকে না-নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এ ব্যাপারে সবচেয়ে উগ্র ছিলেন মুজিববাহিনীর যুবনেতারা।
এই বাহিনী যুদ্ধ করে নি। কাইউম খান নামে একছাত্র যুদ্ধে গিয়েছিলেন, স্বেচ্ছায়। যুদ্ধকালীন তিনি বাংলাদেশের নিয়মিত সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণের জন্য মনোনীত হন, এবং প্রশিক্ষণ শেষে আবার যুদ্ধক্ষেত্রে চলে আসেন। তিনি তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন, মুজিববাহিনী কোথাও কোনো যুদ্ধে অংশ নিয়েছে এমন একটি দৃষ্টান্তও কেউ দিতে পারবে না। এই যোদ্ধাটি টের পেয়েছেন যে, মুজিববাহিনী একটি গোপন যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল, সেটি হলো বামপন্থীদের হত্যা করার। মুজিববাহিনী ছিল তাজউদ্দীনের অজান্তে ভারতীয় গোয়েন্দাবাহিনী দ্বারা গঠিত একটি এলিট ফোর্স, যেখানে বামপন্থীদের তো বটেই, কোনো কৃষক-সন্তানেরও প্রবেশাধিকার ছিল না। অপরদিকে মুক্তিবাহিনীর অধিকাংশ সদস্যই ছিলেন কৃষক পরিবারের সদস্য। মুজিববাহিনীর সঙ্গে খোন্দকার মোশতাক আহমদের কোনো প্রকার মিল থাকার কথা নয়। মোশতাক সবসময়েই ছিলেন মুজিববিরোধী, তার বিপরীতে মুজিববাহিনীর নেতারা দাবি করতেন যে তারা বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী এবং তার ইচ্ছার ধারক। কিন্তু পরস্পরবিরোধী দুইপক্ষ এক হয়েছিল তাজউদ্দীন-বিরোধিতার ক্ষেত্রে। উভয়পক্ষই মনে করতো সরকারের সর্বময় কর্তৃত্ব তাদের হাতেই থাকা উচিত। অবশ্য এটাও তো সত্য যে এরা সবাই ছিলেন দক্ষিণপন্থী; মোশতাকের বামবিরোধিতা শুরু হয়েছিল তার রাজনৈতিক জীবনের যখন সূত্রপাত তখন থেকেই, তেমনিভাবে মুজিববাহিনীর সূচনাও বামবিরোধিতার ভেতর থেকেই। তাজউদ্দীনকে এরা উত্ত্যক্ত করেছেন। মোশতাককে তবু পররাষ্ট্র দফতরের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিয়ে কিছুটা হলেও কাবু করতে পেরেছিলেন, কিন্তু মুজিববাহিনীকে তিনি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেননি; বাহিনীটি মুক্তিবাহিনীর অন্তর্ভুক্ত করা হোক, এমন প্রস্তাব তিনি দিয়েছেন; কিন্তু সেটি গৃহীত হয় নি। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ হয়তো ভাবছিলেন যে, সব ডিম এক ঝুড়িতে রাখাটা ঠিক হবে না। কিন্তু যুদ্ধকালে তাজউদ্দীনের তো কোনো বিকল্প ছিল না। তার তুলনায় মেধাবী, দক্ষ, কর্তব্যজ্ঞান ও দায়িত্ববোধসম্পন্ন দ্বিতীয় কেউ ওই সময়ে ছিলেন না। তার প্রতি সমর্থনও ছিল ব্যাপক। তার জন্য ঝুঁকি ছিল নানা প্রকারের। ব্যর্থ হতে পারেন এমন আশঙ্কা তো সর্বক্ষণই থাকার কথা। পাকিস্তানের চরেরাও নিশ্চয়ই অনুপস্থিত ছিল না। মুজিববাহিনীর তৎপরতার বিষয়েও তাকে সতর্ক থাকতে হতো। ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানী বাহিনীর আত্মসমর্পণের সঙ্গে সঙ্গেই যে তিনি ঢাকা চলে আসেন নি, এক সপ্তাহের মতো সময় নিয়েছিলেন, তার কারণ ঢাকায় তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সময় লাগছিল; বলাবাহুল্য ভয়টা তখন পাকিস্তানিদেরকে নয়, তারা তো তখন পলায়নতৎপর, ভয়টা ছিল মুজিববাহিনীর সদস্যদেরকে জড়িয়েই। যুদ্ধের সময় পাকিস্তানিদের চোখে তিনি ছিলেন এক নম্বর শত্রু। যুদ্ধশেষেও তাকে শত্রু হিসাবে দেখবার লোক রয়েই গেল।
একাত্তরে সরদার ফজলুল করিম গ্রেফতার হন; তার কমিউনিস্ট পরিচয়টি পাকিস্তানি গোয়েন্দারা ভোলে নি। সেই সময়ে সামরিক বাহিনীর লোকেরা তাজউদ্দীনকে কোন দৃষ্টিতে দেখতো তার প্রমাণ তিনি তাদের হাতে বন্দী অবস্থাতে পেয়েছিলেন। তিনি স্মরণ করেছেন : ‘‘মেজর এসে বলল, ‘ইউ পিওপল, দি বাস্টার্ড সানস অব তাজউদ্দীন’। তাজউদ্দীনের নামটা তারা নিল, অন্য কারো নাম না। তাজউদ্দীন সাইলেন্টলি কাজ করত। তার কোনো বক্তৃতাবাজি ছিল না। আমাকে যেটা স্ট্রাইক করল সেটা হচ্ছে মেজর বেটা আমাকে গালি দিতে গিয়ে তাজউদ্দীনের নামটা উল্লেখ করল।’
বামপন্থীদের তথাকথিত উগ্র যে-ধারাটিকে মুজিববাহিনী তাদের বিশেষ লক্ষ্যবস্তু হিসাবে চিহ্নিত করেছিল সেটিতে তখন অনেকগুলো গ্রুপ। প্রথম দিকে কোনো কোনো গ্রুপের দ্বিধা ও সংশয় থাকলেও পরে কিন্তু সকল গ্রুপই যুদ্ধে অংশ নেয়। তবে লড়াইয়ের কাজটা তাদের জন্য মোটেই সহজ ছিল না। প্রথমত তারা লড়ছিলেন দেশের মাটিতে থেকেই, যে-কাজটা ছিল খুবই বিপজ্জনক, কারণ তাদের অস্ত্র সরবরাহ ছিল অত্যন্ত সীমিত, এবং পিছু হটে যে ভারতে আশ্রয় নেবেন সেটা ছিল বিবেচনার বাইরে। দ্বিতীয়ত, যদিও তাদের লড়াইটা ছিল পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকারদের বিরুদ্ধেই, তবু প্রথম থেকেই তারা আওয়ামী লীগের স্থানীয় সদস্য এবং পরে ভারতপ্রত্যাগত প্রশিক্ষিত মুক্তিবাহিনী ও মুজিববাহিনী উভয়ের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের সে-ইতিহাস লিপিবদ্ধ হবার অপেক্ষায় রয়েছে। (চলবে)
লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরেটাস অধ্যাপক, শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক
রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৭অক্টোবর২০১৪/তাপস রায়
রাইজিংবিডি.কম
নিখোঁজ পাইলটকে উদ্ধারে আসা মার্কিন বিমান ধ্বংসের দাবি ইরানের