ঢাকা     মঙ্গলবার   ১২ মে ২০২৬ ||  বৈশাখ ২৯ ১৪৩৩ || ২৫ জিলকদ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

সাঁওতাল সম্প্রদায়ের সাতকাহন

আবদুল মান্নান পলাশ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৮:৫৬, ২২ জুলাই ২০১৪   আপডেট: ০৫:২২, ৩১ আগস্ট ২০২০
সাঁওতাল সম্প্রদায়ের সাতকাহন

সাঁওতাল সম্প্রদায়ের একটি উৎসবে নৃত্য পরিবেশন

আবদুল মান্নান পলাশ, চাটমোহর (পাবনা) : সাঁওতালরা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আদিবাসী গোষ্ঠীগুলোর একটি। দিনাজপুর ও রংপুর চলনবিল অঞ্চলে সাঁওতালদের বাস। দিনাজপুর জেলার ঘোড়াঘাট, ফুলবাড়ি, চিরিরবন্দর, কাহারোল এবং রংপুর জেলার পীরগঞ্জে এবং চলনবিলের তাড়াশ, রায়গঞ্জ ও চাটমোহর এলাকায় সাঁওতালরা অধিক সংখ্যায় বাস করে। রাজশাহী এবং বগুড়া অঞ্চলে কিছু সংখ্যক সাঁওতাল আছে।

নওগাঁতেও রয়েছে সাঁওতাল জনগোষ্ঠির অস্তিত্ব। এক গবেষণায় দেখা যায়, ১৮৫৫-৫৬ সালের সাঁওতাল বিদ্রোহের পর এরা নওগাঁ ছেড়ে নওগাঁর পার্শ্ববর্তি মালদহ, বামনগোলা ও হিলি অঞ্চলে বসবাস শুরু করে। পরে কোন এক সময়ে (সম্ভবত ১৮৭০ সালে) জোতদারদের প্রয়োজনে তাদেরই আমন্ত্রনে ধীরে ধীরে এরা নওগাঁর শালবন অধ্যুষিত এলাকা ধামইরহাটের বিভিন্ন বনাঞ্চলে এসে বসবাস শুরু করে।

এ সময় এই বনাঞ্চলে সামান্য চাষাবাস ও বিভিন্ন পশুপাখি শিকার করে এরা জীবন ও জীবিকা নির্বাহের পাশাপাশি জোতদারদের জমাজমি চাষ করতো।

সাঁওতাল মেয়েরা রঙ্গীন শাড়ি পড়ে চুলে রঙ্গীণ ফুল গুঁজে নাচে গানে উৎসব পালন করে থাকে। স্ত্রী পুরুষ উভয়েই সামাজিক রীতি হিসেবে শরীরে উল্কি আঁকে। এদের বিয়ে হয় ধুমধামে। বিয়েতে নাচ গান এবং চোলাই মদ থাকতেই হবে। এই মদ আর পাঁঠা বা শুকুরের মাংসের সাথে মোটা চালের ভাতের ভোজ দিয়েই চলে বিয়ে বাড়ির আহার। একসঙ্গে দুই স্ত্রী রাখার বিধান এদের নেই। এখনও এদের সমাজে প্রাচীন পঞ্চায়েত ব্যবস্থা চালু রয়েছে।
এদের মধ্যে বিধবা বিয়ে এবং ঘরভাঙ্গা বিয়ে প্রচলিত আছে। আগে বড় গোলা ঘরে নির্দিষ্ট পরবের দিনে একসঙ্গে একাধিক বিবাহযোগ্য নারী পুরুষ একত্রে বসে তাদের পছন্দ মতো পাত্র-পাত্রী নির্বাচন করতো। পরে পরিবারের লোকজনের সম্মতিতে বিয়ে হতো। এখন আর সে প্রথার প্রচলন নেই। পুরুষদের চেয়ে মেয়েরা বেশি পরিশ্রম করে এবং কৃষি কাজেও তারা অত্যন্ত দক্ষ।

১৯৯১ সালের আদমশুমারি অনুসারে বাংলাদেশে সাঁওতালদের মোট সংখ্যা ২,০২,৭৪৪। বর্তমানে ওদের সংখ্যা তিন লাখেরও বেশি হবে।  ১৯৪১ সালের ব্রিটিশ ভারতের আদমশুমারি রিপোর্টে সাঁওতালদের সংখ্যা ছিল ৮,২৯০২৫। এরমধ্যে বাংলাদেশে সাঁওতাল ছিলো ২,৮২,৬৮২ জন।

প্রকৃতপক্ষে সাঁওতাল এর সংখ্যা যেভাবে বাড়ার কথা সেভাবে বাড়েনি, উল্টো কমেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে এদের সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকলেও স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ভূমি থেকে উচ্ছেদ, নানা অত্যাচার, শোষণ-নিপীড়ন, হত্যা-ধর্ষণ ইত্যাদি কারণে এরা দলে দলে দেশ ত্যাগে বাধ্য হয় । এদের অনেকেই চলে গেছে পাশের দেশ ভারতে। সেখানে সাঁওতালদের বর্তমান সংখ্যা ৬ লাখের মতো, আর নেপালে রয়েছে ৫০ হাজারেরও বেশি।

সাঁওতালদের দৈহিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে খর্বাকৃতি, মাথার খুলি লম্বা থেকে মাঝারি, নাক চওড়া ও চ্যাপ্টা, গায়ের রঙ কালো এবং ঢেউ খেলানো । ভাষাগত পরিচয়ে এরা অস্ট্রো-এশিয়াটিক।

নৃতাত্ত্বিকদের ধারণা, এরা ভারতবর্ষের আদিম অধিবাসীদের অন্যতম। এক সময় এরা বাস করতো উত্তর ভারত থেকে শুরু করে প্রশান্ত মহাসাগরের ইস্টার দ্বীপ পর্যন্ত। আনুমানিক ৩০ হাজার বছর পূর্বে এরা ভারত থেকে অস্ট্রেলিয়া গিয়েছিল। আর সাঁওতালরা যে আর্যদের আগে থেকেই ভারতে আছে সে ব্যাপারে কোনই দ্বিমত নেই।

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২২ জুলাই ২০১৪/টিপু

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়