শিশু নির্যাতন : মানবতার অবক্ষয়
মাজেদুল হক তানভীর || রাইজিংবিডি.কম
মাজেদুল হক তানভীর : যে সব মানবিক গুণাবলীর অভাবে একটি সমাজ নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে ধাবিত হয় সেগুলোর মধ্যে অন্যতম শিশু নির্যাতন। শিশুরা বরাবরই সুন্দর ও পবিত্রতার প্রতীক, স্বর্গীয় আনন্দের উৎস। প্রতিটি শিশুর সঠিকভাবে গড়ে উঠার জন্য প্রয়োজন তার নিকটস্থ মানুষগুলোর আদর, যথাযথ পরিচর্যা, নিরাপত্তা ও সঠিক দিক নির্দেশনা। এক কথায় একটি শিশুবান্ধব সুস্থ পরিবেশ ও নিরাপদ আশ্রয়।
পরিতাপের বিষয় আমাদের দেশে শিশু নির্যাতন বেড়েই চলেছে। সময়ের পরিক্রমায় নির্যাতনের কৌশল নতুন রূপ ধারণ করছে।
শেখ রাসেলের জন্মদিন উপলক্ষে ১৮ অক্টোবর (রোববার) সকালে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিশু নির্যাতনকে মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে তুলনা করে বলছেন, ‘শিশু নির্যাতন করে কেউ পার পাবে না।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশে পরপর বেশ কয়েকটি শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে।’ এ ধরনের খারাপ প্রবৃত্তি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য তিনি দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে শিশু রাজন নির্যাতন একটি আলোচিত ঘটনা। এই মামলার রায় ইতিমধ্যে হয়েছে। ১৩ বছরের শিশু সামিউল ইসলাম রাজনের শরীরে ৬৪টি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। চুরির অপবাদ দিয়ে তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। দীর্ঘ ২৮ মিনিট ধরে চলে তার ওপর নির্যাতন। এ নির্যাতনের পুরো প্রক্রিয়াটি ভিডিও করে নির্যাতনকারীরাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছে।
২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে রাজধানীর পল্লবীতে ডাস্টবিনের পাশ থেকে উদ্ধার করা হয় নির্যাতনের বীভৎস শিকার গৃহকর্মী আদুরিকে। খুলনায় ১৩ বছরের সীমাকে গৃহকর্তা ও গৃহকর্ত্রী শুধু হত্যাই করেনি, দীর্ঘ ৯ মাস ডিপ ফ্রিজে রেখে দিয়েছিল।
সাম্প্রতিক সময়ের শিশু নির্যাতনের ঘটনা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ২০১২ থেকে ২০১৫ সালের জুন পর্যন্ত বাংলাদেশে ৫৮০৫টি শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। শিশু অধিকার ফোরাম, অধিকার ও পুলিশ সদর দফতরের সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, চলতি বছরের ৯ আগস্ট পর্যন্ত ১৯৩ জন শিশু হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে।
বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের (বিএসএএফ) তথ্যমতে, ২০১২ সালে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয় ২০৯ জন শিশু। এছাড়া আরও ৫ জনকে হত্যার চেষ্টা করা হয়। ২০১৩ সালে হত্যা করা হয় ২১৮ শিশুকে এবং হত্যার চেষ্টা করা হয় ১৮ শিশুকে। ২০১৪ সালে ৩৫০ শিশু হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়। হত্যার চেষ্টা করা হয় ১৩ শিশুকে।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত হত্যা করা হয়েছে ১৯১ শিশুকে এবং ১১ জনকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। বিএসএএফ সূত্র জানায়, গত সাত মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ২৩০ শিশু; ৬২ শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে; ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৭ শিশুকে। এ সময়ে অপহৃত হয়েছে ১২৭ জন শিশু। অপহরণের পর হত্যা করা হয়েছে ২৩ জন শিশুকে।
বিএসএএফ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৪ সালে অপহৃত হয় ১১৮ জন শিশু। এদের মধ্যে ৫০ জনকে হত্যা করা হয়। ৬৬ জন অপহৃত শিশুকে উদ্ধার করা হয়। ২০১৩ সালে ৪২ জন শিশু অপহরণের শিকার হয়। তাদের মধ্যে হত্যা করা হয় ১৩ জনকে। ২০১২ সালে ৬৭ জন শিশু অপহৃত হয়।
শিশু ও মহিলা পরিষদের এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, চলতি বছরের ১ মে থেকে ১৪ জুলাই পর্যন্ত তিন মাসে সারাদেশে ১০২৩টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। গত ৩ মাসে হত্যা করা হয়েছে ১৬০ জনকে, যাদের অধিকাংশই শিশু।
চলতি বছরের গত ৬ মাসে ৯০টি শিশু অপহৃত হয়েছে। ’মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’ ৬টি জাতীয় পত্রিকার খবর পর্যালোচনা করে ’বাংলাদেশ শিশু পরিস্থিতি ২০১৩’ প্রতিবেদনে বলেছে, বছরটিতে ২৬৭ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। এর মধ্যে মারা যায় ১২ জন। গুরুতর আহত হয় ২৩৯ জন।
ধর্ষণ ছাড়া অন্যান্য যৌন নির্যাতনের খবর প্রকাশিত হয় ১৫০টি। তবে ২০১২ সালে ১৫৫ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের পর্যালোচনা অনুযায়ী, বছরটিতে ৯০ টি শিশু অপহরণের শিকার হয়। অপহরণের পর খুন করা হয় দুজনকে।
পারিবারিক কলহ, মুক্তিপণ না পাওয়া এবং জমি নিয়ে বিরোধসহ নানা কারণে ৩৩৫ শিশু খুন হয়। অশ্লীল ভিডিওচিত্র ছড়ানোর ভয়ে বা অন্যান্য কারণে আত্মহত্যা করে ১৬৬ শিশু। বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ২৪৫ শিশুকে সম্পৃক্ত করা হয়। এর মধ্যে মারা যায় ১৭৬ জন। বছরটিতে পাচার হয় ৪২ শিশু। এসিডদগ্ধ হয় ১০ শিশু।
রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার হয়ে ৪১ শিশু মারা যায়। ১০৭ শিশু গুরুতর আহত হয়। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সাড়ে ৩ বছরে দেশে ৯৬৮টি শিশুকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। ২০১৪ সালে শিশু হত্যার হার আগের বছরের চেয়ে প্রায় ৬১ শতাংশ বেশি ছিল।
এ বছর হত্যার পাশাপাশি বেড়েছে নৃশংসতা। বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে শিশু অধিকার ফোরামের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ২০১২ সালে ২০৯, ২০১৩ সালে ২১৮, ২০১৪ সালে ৩৫০ জন শিশুকে হত্যা করা হয়। চলতি বছর সাত মাসেই সংখ্যাটি দাঁড়িয়েছে ১৯১। আর কতো শিশু যে প্রতিদিন নির্যাতিত হচ্ছে তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই কারও কাছে।
শিশু নির্যাতনের ঘটনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে যৌন হয়রানি, ধর্ষণসহ অপহরণের ঘটনা। এগুলোর মধ্যে কিছু ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলেও বেশিরভাগই আত্মসম্মানের কারণে লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যায়। বছরে কত শিশু নির্যাতিত হচ্ছে, সে বিষয়ে সরকারি কোনো তথ্য নেই। বিভিন্ন এনজিও, সংগঠন এবং সরকারের নানা সংস্থার কাছ থেকে নির্যাতনের কিছু খ-কালীন চিত্র চোখে পড়ে মাত্র।
বাংলাদেশে সম্প্রতি বিভিন্ন জায়গায় প্রকাশ্যে নির্যাতন ও পিটিয়ে শিশু হত্যার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইউনিসেফও। ৬ আগস্ট এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি এডওয়ার্ড বেগবেদার জানান, এ ঘটনা `শিশু অধিকার` নীতির পরিপন্থী। ঘটনাগুলো সারা দেশকে নাড়া দিয়েছে, তাই ইউনিসেফ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
সেভ দ্য চিলড্রেনের কান্ট্রি ডিরেক্টর মাইকেল ম্যাকগ্রাথও শিশু হত্যার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, সরকার শিশুদের জন্য যে নীতিগুলো গ্রহণ করেছে তার আলোকেই কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
১৮ বছর পার না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যেকটি মানুষ শিশু। এই বয়সের একটা মানুষ অর্থাৎ শিশু কেন নির্যাতনের শিকার হবে? এই প্রশ্ন এখন সকলের বিবেকে কাড়া নাড়ছে।
আমাদের দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন (বিশেষ বিধান) আইন, ১৯৯৫ প্রচলিত আছে। এই আইন অনুযায়ী কোন ব্যক্তি যদি বিষাক্ত, দাহ্য বা দেহের ক্ষয় সাধনকারী কোন বস্তু দ্বারা কোন নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটায় তবে তার শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড। অন্যথায়, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা ন্যূনতম ৭ থেকে ১৪ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
এতোসব আইন থাকা সত্ত্বেও আমাদের দেশে অহরহ নানাভাবে শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে, যা রীতিমতো উদ্বেগজনক। এসব শিশু নির্যাতনের যে ভয়াবহতা তা যে কোন সভ্য-শিক্ষিত সমাজের জন্য কলঙ্ক। শিক্ষা-সংস্কৃতির দিক থেকে আমরা যতদূরই অগ্রসর হই না কেন, শিশু নির্যাতন বন্ধ না হলে সব অর্জন স্লান হয়ে যাবে।
আমরা চাই শুধু আইন তৈরি করে নয় বরং তার সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করে দেশে শিশু নির্যাতন চিরতরে বন্ধ হোক। আমাদের শিশুরা উজ্জল ভবিষ্যতের সম্ভাবনা নিয়ে নিরাপদে, সুস্থ দেহে ও মনে বেড়ে উঠুক এই প্রত্যাশা করি।
লেখক : শিক্ষার্থী, জার্নালিজম, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ, স্টেট ইউসির্ভাসিটি অব বাংলাদেশ।
majadulhaque786@ gmail.com
রাইজিংবিডি/ঢাকা/১০ নভেম্বর ২০১৫/শাহনেওয়াজ
রাইজিংবিডি.কম
লিবিয়ায় ভূমধ্যসাগরের তীর থেকে ২ বাংলাদেশির মৃতদেহ উদ্ধার