বাগেরহাটে ধুঁকছে নারকেল তেলের কারখানা
বাগেরহাট সংবাদদাতা || রাইজিংবিডি.কম
বাগেরহাট বিসিক শিল্পনগরীতে অবস্থিত নারিকেল তেলের একটি কারখানা।
অলস পড়ে আছে ভারী ভারী যন্ত্রপাতি। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় মেশিনে ধরেছে মরিচা। এমন দৃশ্যই এখন বাগেরহাট বিসিক শিল্পনগরীতে অবস্থিত নারিকেল তেল উৎপাদনকারী বেশিরভাগ কারখানার। একসময় যেখানে ৪০টির বেশি মিল সচল ছিল, বর্তমানে পর্যাপ্ত কাঁচামালের অভাবে হাতে গোনা দুই-চারটি কোনভাবে টিকে আছে। ফলে কর্মসংস্থান হারিয়েছেন হাজারো শ্রমিক।
বিসিক ও মিল মালিক সূত্রে জানা গেছে, একসময় নারিকেল প্রক্রিয়াজাত শিল্পে জড়িত ছিলেন দুই হাজারের বেশি নারী-পুরুষ। প্রতিদিন উৎপাদন হতো ২৫ থেকে ৩০ মেট্রিক টন তেল। জেলার চাহিদা মিটিয়ে এই তেল পাঠানো হতো ঢাকা, রাজশাহী, বগুড়া, রাজবাড়ী, সিলেট, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়।
২০০৬ সালের দিকে বাজারে মোড়কজাত তেল বিক্রি শুরু হলে কমতে থাকে খোলা নারিকেল তেলের চাহিদা। পাশাপাশি নারিকেল উৎপাদন কমে যাওয়া এবং ডাবের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় কাঁচামালের সংকট দেখা দেয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সুপেয় ও ব্যবহারযোগ্য পানির ঘাটতি ও অবকাঠামোগত নানা সমস্যা। ধীরে ধীরে সংকটে পড়ে মিলগুলো।
সরেজমিনে দেখা যায়, কয়েকটি কারখানায় সীমিত পরিসরে কাজ চললেও অধিকাংশ বন্ধ। দীর্ঘদিন মিলগুলো বন্ধ থাকায় সেখানকার যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ১৯৯৬ সালে বাগেরহাট শহরের ভৈরব নদের পাশে প্রায় ১৯ দশমিক ৩০ একর জমির ওপর গড়ে ওঠে বাগেরহাট বিসিক শিল্পনগরী। এখানে রয়েছে ১১৯টি প্লট। ব্যবসায়ীরা সব প্লট বরাদ্দ নিয়ে ৫২টি শিল্পকারখানা স্থাপন করেছেন।
কোকোনাট অয়েল মিলের মালিক চয়ন কুন্ডু বলেন, “৫-৭ বছর ধরে প্রয়োজন অনুযায়ী নারিকেল পাচ্ছি না। কাঁচামাল না থাকায় মিল বন্ধ রাখতে হচ্ছে। আমাদের মিল আড়াই থেকে তিন মাস পরপর খুলি। নারিকেল ভাঙানোর পর আবার কবে খুলতে পারব, তার ঠিক নেই। কেরালা ও শ্রীলঙ্কা থেকে যে নারিকেল আসে, তার দামও বেশি।”
একই কারখানার শ্রমিক দেলোয়ার শেখ বলেন, “আগে তিনটি মেশিনে একসঙ্গে তেল ভাঙানো হতো। এখন কোনো মতে একটি মেশিন চালু রাখা যায়। আগে এখানে ৩০ জন শ্রমিক কাজ করত। এখন নারিকেল পেলে তিন-চার মাস পরপর মিল খোলে। বাকি সময় বাইরের কাজ করি। সবসময় কাজও পাই না। মিল বন্ধ থাকায় খেয়ে না খেয়ে দিন কাটে।”
মিল মালিক রানা হাওলাদার অভিযোগ করেন, “গত চার বছর ধরে পানির সংকট। খাবার পানি তো নেইই, ব্যবহারযোগ্য পানিও নেই। আগে একটি পুকুর থেকে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা ছিল, কিন্তু সেই লাইনগুলো নষ্ট হয়ে গেছে।”
অরণ্য সাহা নামে তেল ব্যবসায়ী বলেন, “কিছু রাস্তার কাজ হয়েছে, তবে এখনো অনেক কাজ বাকি। বর্ষায় হাঁটুসমান পানি জমে যায়। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন হয়নি। পানি সংকট চরমে। এভাবে চলতে থাকলে বিসিক হুমকির মুখে পড়বে।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, ড্রেন ও রাস্তার কাজ রাতে হওয়ায় তা মানহীন হয়েছে।
অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিসিক শিল্পনগরীর কর্মকর্তা মো. শরীফ সরদার। তিনি বলেন, “দিনে বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকায় কিছু কাজ রাতে করা হয়েছে। নারিকেলের অপর্যাপ্ততার কারণে দুটি তেলের কারখানা বন্ধ রয়েছে। অন্যান্য কারখানাও খারাপ অবস্থায় আছে। রাস্তা ও ড্রেনসহ অবকাঠামোগত কিছু সমস্যা ছিল, সেগুলো গত বছরগুলোতে অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছি। অবশিষ্ট সমস্যাগুলো সংস্কার করা হবে।”
তিনি জানান, সুপেয় পানির সংকট সমাধানে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে সাবমারসিবল পাম্প স্থাপন করা হবে। এছাড়া শিল্পনগরীতে কোনো বাউন্ডারি ওয়াল না থাকায় নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিদিন সন্ধ্যার পর টহল দিচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
ঢাকা/আমিনুল/মাসুদ