‘স্বপ্নযাত্রা’ এখন দুঃস্বপ্ন, অযত্নে পড়ে আছে ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্স
লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম
লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার আলেকজান্ডার এলাকার সেন্টার খালে পড়ে আছে ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্সটি।
লক্ষ্মীপুরের প্রান্তিক ও বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলের মানুষের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে বড় আকারে চালু করা হয়েছিল ‘স্বপ্নযাত্রা’ অ্যাম্বুলেন্স প্রকল্প। তবে, পরিকল্পনার ঘাটতি, তদারকির অভাব এবং ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় সেই উদ্যোগ এখন প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে একটি ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্স (স্পিডবোট) দীর্ঘদিন ধরে বিকল থাকায় প্রকল্পটির বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
রামগতি উপজেলার আলেকজান্ডার এলাকার সেন্টার খালে পড়ে আছে ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্সটি। চর আব্দুল্লাহ, তেলিয়ার চর ও চরগজারিয়ার মতো নদীবেষ্টিত এলাকার প্রায় ২০ হাজার মানুষের জন্য এটি চালু করা হলেও শুরু থেকেই চালক সংকট ও জ্বালানির অভাবে কখনোই কার্যকর হয়নি। বর্তমানে এটি অযত্ন-অবহেলায় পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে, এমনকি এর কিছু যন্ত্রাংশও চুরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের ৬ অক্টোবর তৎকালীন জেলা প্রশাসক আনোয়ার হোছাইন আকন্দ এই ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্সের উদ্বোধন করেন। ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে জাইকা, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের যৌথ অর্থায়নে প্রায় ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে এটি কেনা হয়। উদ্বোধনের সময়ই চালক নিয়োগ না দেওয়ায় শুরু থেকেই এটি ব্যবহারযোগ্য হয়ে ওঠেনি।
সূত্র জানায়, ‘স্বপ্নযাত্রা’ প্রকল্পের আওতায় জেলার পাঁচটি উপজেলায় মোট ১৬টি স্থল অ্যাম্বুলেন্স ও একটি ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্স চালু করা হয়। প্রতিটির জন্য প্রায় ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও চালক ও রক্ষণাবেক্ষণের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ছিল না। ফলে প্রকল্পটি ধীরে ধীরে স্থবির হয়ে পড়ে।
নীতিমালা অনুযায়ী, প্রতিটি অ্যাম্বুলেন্স তিনটি ইউনিয়নের রোগীদের সেবা দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। স্থানীয় রোগী পরিবহনের বদলে চালকরা দূরপাল্লার যাত্রায় বেশি আগ্রহী ছিলেন, ফলে স্থানীয় পর্যায়ের সেবা ব্যাহত হয়।
অ্যাম্বুলেন্সে রোগীর বদলে যাত্রী পরিবহনের অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী
এলাকার বাসিন্দা জাহিদ ও হান্নান জানান, বিভিন্ন সময়ে এই অ্যাম্বুলেন্সগুলো রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার হয়েছে। নির্বাচনকালীন প্রচারণা ও রাজনৈতিক সভাতেও এই যান ব্যবহার হয়েছে।
তাদের অভিযোগ, প্রশাসনিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রকল্পটির তদারকি কমে যায়। পরবর্তী জেলা প্রশাসকদের সময়েও এ প্রকল্পে কার্যকর নজরদারি দেখা যায়নি। বর্তমানে অনেক অ্যাম্বুলেন্স থেকেই ‘স্বপ্নযাত্রা’ প্রকল্পের স্টিকার তুলে ফেলা হয়েছে এবং সেগুলো কার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
চরাঞ্চলের জনপ্রতিনিধিরা জানান, এই অ্যাম্বুলেন্স সেবা কার্যকর হলে দুর্গম এলাকার মানুষ দ্রুত চিকিৎসা পেতেন। কিন্তু বাস্তবে এটি কোনো উপকারে আসেনি। চালক সংকট, জ্বালানি খরচ এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে প্রকল্পটি ইউনিয়ন পরিষদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চর আব্দুল্লাহ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন মঞ্জু বলেন, “উদ্বোধনের পর থেকে ড্রাইভার এবং তেল না থাকায় অ্যাম্বুলেন্সটি ব্যবহার করা হয়নি। চর থেকে একটি নৌকা নিয়ে এককভাবে চলাচল করতে একজন ব্যক্তির খরচ হয় ২০০০ টাকা, অ্যাম্বুলেন্সে খরচ হয় ৫ হাজার টাকা, এ কারণে কেউ আর অ্যাম্বুলেন্সটি ব্যবহার করেননি।
স্বাস্থ্য বিভাগের একাধিক সূত্র জানায়, প্রকল্পটি সরাসরি জেলা প্রশাসনের অধীনে পরিচালিত হওয়ায় স্বাস্থ্য বিভাগ এতে সম্পৃক্ত ছিল না। ফলে তারা এ বিষয়ে দায়িত্ব নিতে বা মন্তব্য করতে আগ্রহী নয়।
রামগতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নিলুফা ইয়াসমিন বলেন, ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্সটি অকার্যকর অবস্থায় পড়ে থাকার বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে। কেন এটি এতদিন ব্যবহার হয়নি, তা তদন্ত করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে জানতে লক্ষ্মীপুরের জেলা প্রশাসক এসএম মেহেদী হাসানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
ঢাকা/জাহাঙ্গীর/মাসুদ