ঐতিহ্য, প্রতিবাদ ও অর্জন মিলে ৫৬ বছরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
লিখেছেন আহসান হাবীব, জাবি প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম
সবুজ গাছপালার ছায়া, আঁকাবাঁকা লেকের নীরব জলরেখা আর লাল ইটের নান্দনিক স্থাপত্য—এই তিনের অপূর্ব মেলবন্ধনেই দাঁড়িয়ে আছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। রাজধানীর কোল ঘেঁষে সাভারে বিস্তৃত এই ক্যাম্পাস শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি গৌরব, সংস্কৃতি ও প্রতিবাদের এক জীবন্ত দলিল। ৫৫ বছরের পথচলা পেরিয়ে আজ (১২ জানুয়ারি) বিশ্ববিদ্যালয়টি পা রাখল ৫৬তম বছরে।
৬৯৭ দশমিক ৫৬ একর আয়তনের এই ক্যাম্পাস সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হয়ে উঠেছে ইতিহাস, জীববৈচিত্র্য ও মুক্তচিন্তার এক অনন্য ঠিকানা। দেশের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে জাহাঙ্গীরনগর আজও আলাদা—চেতনায়, সংগ্রামে ও স্বপ্নে।
জন্ম ও রূপান্তরের গল্প
১৯৭০ সালের ২০ আগস্ট এক অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে জাহাঙ্গীরনগর মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৭১ সালের ১২ জানুয়ারি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম আহসান আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন প্রতিষ্ঠানটি। প্রথম উপাচার্য ছিলেন বিশিষ্ট রসায়নবিদ অধ্যাপক ড. মফিজ উদ্দিন আহমদ।
স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় নতুন নাম পায় বিশ্ববিদ্যালয়টি—জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। সেই নামের সঙ্গে যুক্ত হয় মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ, গণতন্ত্র ও প্রগতির দর্শন।
চারটি বিভাগ, ১৫০ জন শিক্ষার্থী আর ২১ জন শিক্ষক নিয়ে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, আজ তা বিস্তৃত হয়েছে ছয়টি অনুষদের ৩৪টি বিভাগ ও চারটি ইনস্টিটিউটে। বর্তমানে এখানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১২ হাজার ৩৭৯ জন। শিক্ষক রয়েছেন ৭১২ জন, আর কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলিয়ে জনবল প্রায় ১ হাজার ৮০০।
সংস্কৃতি ও প্রকৃতির সহাবস্থান
‘সাংস্কৃতিক রাজধানী’—এই অভিধা জাহাঙ্গীরনগরের সঙ্গে যেন স্বতঃসিদ্ধ। বছরজুড়ে নাটক, সংগীত, কবিতা আর বিতর্কে মুখর থাকে ক্যাম্পাস। গ্রিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত সেলিম আল দীন মুক্তমঞ্চ এই সাংস্কৃতিক চর্চার প্রাণকেন্দ্র। সন্ধ্যা নামলেই এখানে ভিড় করেন শিল্পী, শিক্ষার্থী আর সংস্কৃতিপ্রেমীরা।
প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের এই সহাবস্থান জাবিকে করেছে অনন্য। প্রাণিবিদ্যা বিভাগের উদ্যোগে গড়ে ওঠা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্র (ডব্লিউআরসি) ও বাটারফ্লাই পার্ক জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। শীত এলেই দূরদেশের অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখর হয়ে ওঠে লেকপাড়।
স্থাপত্যেও জাবির রয়েছে নিজস্ব স্বাক্ষর। দেশের সবচেয়ে উঁচু শহিদ মিনার, মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ‘সংশপ্তক’, ভাষা আন্দোলনের প্রতীক ‘অমর একুশে’—সব মিলিয়ে ক্যাম্পাস যেন এক খোলা ইতিহাসের বই। সাম্প্রতিক সংযোজন ‘অদম্য ২৪’ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মরণে নির্মিত বাংলাদেশের প্রথম স্মৃতিস্তম্ভ।
কৃতীদের ঠিকানা
এই লাল ইটের প্রাঙ্গণ জন্ম দিয়েছে অসংখ্য গুণী মানুষকে। অভিনয়ে হুমায়ুন ফরীদি, শহীদুজ্জামান সেলিম, জাকিয়া বারী মম, সাজল নূরের মতো শিল্পীরা উঠে এসেছেন এখান থেকেই। ক্রিকেট মাঠে মাশরাফি বিন মর্তূজা ও মুশফিকুর রহিম দেশকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন বিশ্বমঞ্চে।
শিক্ষক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরেও জাহাঙ্গীরনগরের অবদান অনস্বীকার্য। কবি সৈয়দ আলী আহসান, অধ্যাপক সুনীল কুমার মুখোপাধ্যায়, হায়াৎ মামুদ, হুমায়ুন আজাদ, নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন—এই নামগুলো জাবির ইতিহাসকে করেছে আরও সমৃদ্ধ। অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ, কবি মোহাম্মদ রফিক, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী, অধ্যাপক তারেক শামসুর রেহমান এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা দীপঙ্কর দীপন—সবাই এই ক্যাম্পাসের পরিচয়ে গর্বিত।
প্রতিবাদের ঠিকানা
অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জাহাঙ্গীরনগরের রক্তে মিশে আছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন—সব আন্দোলনেই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ছিলেন সম্মুখসারিতে। লাইব্রেরির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ‘সংশপ্তক’ সেই ইতিহাসের নীরব সাক্ষী।
এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার আন্দোলনেও। জাবির শিক্ষার্থীরাই প্রথম ক্যাম্পাস থেকে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগকে বিতাড়িত করেন। কারফিউ, গুলি আর ভয় উপেক্ষা করে রাজপথে নামার সাহসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে তারা।
সাফল্য ও সংকট-দুই পাশে পথচলা
গত বছরটি জাবিয়ানদের জন্য ছিল সাফল্যে ভরা। দীর্ঘ ৩৩ বছর পর ২০২৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয় জাকসু নির্বাচন। প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের ‘গণরুম’ সংস্কৃতি বিলুপ্ত হয়েছে। নতুন নির্মিত ছয়টি হলসহ বর্তমানে মোট ২১টি হল। আধুনিক লাইব্রেরি, স্পোর্টস কমপ্লেক্স ও লেকচার থিয়েটারের কাজ এগোচ্ছে।
গবেষণাতেও পিছিয়ে নেই জাবি। বিশ্বসেরা দুই শতাংশ গবেষকের তালিকায় স্থান পেয়েছেন সাতজন শিক্ষক ও একজন শিক্ষার্থী।
তবে সীমাবদ্ধতাও কম নয়। প্রশাসনিক কাজে সনাতন পদ্ধতির ব্যবহার, চিকিৎসা কেন্দ্রে ওষুধ সংকট, কিছু বিভাগে শ্রেণিকক্ষের অভাব—এসব নিয়ে রয়েছে দীর্ঘদিনের অভিযোগ। গবেষণায় বরাদ্দ কম এবং লেক ও বনাঞ্চল সংরক্ষণে প্রশাসনিক উদাসীনতাও প্রশ্নের মুখে।
উৎসবের দিনে জাবি
প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব মিলিয়ে আজ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে উৎসবমুখর জাহাঙ্গীরনগর। শোভাযাত্রা, রাগিণী সংগীত, সাবেক-বর্তমানদের প্রীতি ফুটবল ও হ্যান্ডবল ম্যাচে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরেছে ক্যাম্পাসে। রাতে সেলিম আল দীন মুক্তমঞ্চে বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উদযাপনের পর্দা নামবে।
৫৬ বছরে পা রাখা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় তাই শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়—এটি এক জীবন্ত ইতিহাস, প্রতিবাদের প্রতীক আর ভবিষ্যতের স্বপ্নবীজ।
ঢাকা/জান্নাত