Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     রোববার   ১৩ জুন ২০২১ ||  জ্যৈষ্ঠ ৩০ ১৪২৮ ||  ০২ জিলক্বদ ১৪৪২

শিক্ষা খাতের ক্ষতি কীভাবে পূরণ হবে? 

আবদুল্লাহ আল মামুন || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৭:০২, ১৮ মে ২০২১  
শিক্ষা খাতের ক্ষতি কীভাবে পূরণ হবে? 

চৌদ্দ মাস যাবত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। মহামারিতে থমকে গেছে। দেশের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলো আপন মহিমায় ফিরতে শুরু করলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ফিরতে পারেনি চেনা রূপে। নির্জীব হয়ে আছে। যেখানে শিক্ষার্থীদের উচ্ছ্বাসে কল্লোলিত হতো, সেখানে ভূতুড়ে অবস্থা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এখন আর শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখরিত হয় না, আগমনে তৈরি হয় না কোলাহল।

মহামারিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিলেও সরকার প্রথম থেকেই শিক্ষাকার্যক্রম চালিয়ে নেওয়ার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করে। অনলাইন ও দূর শিক্ষণ শিক্ষাকার্যক্রম চালু করে। তবে এই উদ্যোগ খুব একটা ফলপ্রসূ হয়নি। একে নিয়ম রক্ষার উদ্যোগই বলা যেতে পারে। কেন না, দেশের সর্বত্র শিক্ষার্থীদের কাছে মোবাইল ফোন নেই, দেশের মোবাইল নেটওয়ার্ক সর্বত্র শক্তিশালী নয়। পাশাপাশি সব শিক্ষার্থীর বাসা-বাড়িতে টিভি, রেডিও নেই।  

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোন সমস্যার সমাধান করলেও কলেজ, স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা সেই সুবিধা পায়নি, টিভিতে ক্লাস করালেও যাদের বাসায় টিভি নেই, তাদের সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী হতে দেখা যায়নি। একইসঙ্গে মোবাইল নেটওয়ার্কের উন্নতিও সরকার ঘটাতে পারেনি। ফলে একে নিয়ম রক্ষার উদ্যোগ বলাই শ্রেয়। আর এর ফলাফলও যে খুব ভালো না, সেটা একটি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষণা হতে দেখা যায়। 

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রায় ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী দূর শিক্ষণ শিক্ষাকার্যক্রমে অংশ নিতে না পারলেও সবাই পরবর্তী ক্লাসে উত্তীর্ণ হয়ে গেছেন। ফলে শিক্ষার্থীরা শ্রেণীকক্ষের পাঠদানের বড় একটা ঘাটতি নিয়ে পরের ক্লাসে উঠে যাচ্ছে। এই ঘাটতি নিয়ে পরবর্তী ক্লাসগুলোতে উঠার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুললে শিক্ষার্থী, শিক্ষক তথা পুরো জাতিকে মূল্য দিতে হবে। 

শিক্ষার্থীদের যেমন ক্লাসের পড়া বুঝতে অসুবিধা হবে, তেমনি শিক্ষার্থীদের বোঝাতে শিক্ষকদের অনেক বেগ পোহাতে হবে। সময় স্বল্পতা ও নির্দিষ্ট সময়ে সিলেবাস শেষ করার তাগিদে শিক্ষকদের পক্ষে পূর্ববর্তী লেসনগুলো পড়ানো সম্ভব হবে না। ফলে ক্লাসের পড়ায় একটা ঘাটতি নিয়েই শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষাজীবন শেষ করবেন। এটা একজন শিক্ষার্থীর জন্য যেমন ক্ষতিকর, তেমনি দেশের জন্যেও ক্ষতিকর। এখানে অবশ্য অ্যাসাইনমেন্টের কথা আসতে পারে। মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চলমান রাখার জন্য শিক্ষার্থীদের অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এর চিত্র খুব একটা ভালো নয়। 

ফেসবুক গ্রুপগুলোতে এই অ্যাসাইনমেন্টগুলো পাওয়া যায়। শিক্ষার্থীদের দেখা গেছে বই দেখে এই অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে, এক একজন আরেকজনের কাছ থেকে কপি করতে। প্রকৃতপক্ষে যেহেতু শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা হয়নি এবং অনলাইন কিংবা টেলিভিশন ক্লাসের সুযোগ খুব কম সংখ্যক শিক্ষার্থীই পেয়েছেন, সেহেতু ফেসবুক গ্রুপ, বই দেখে লেখা, আরেকজনের কাছ থেকে কপি করে সেটা জমা দেওয়াই স্বাভাবিক।

অন্যদিকে দেশের বেসরকারি বিশ্বিবিদ্যালয়গুলোতে নিয়মিত ক্লাস পরীক্ষা হলেও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পরীক্ষা আটকে আছে। এতে শিক্ষার্থীরা চাকরির পরীক্ষা দিতে পারছেন না, পারছেন না পরবর্তী বর্ষে উত্তীর্ণ হতে। এতে শিক্ষার্থীরা তাদের কর্মজীবন থেকে পিছিয়ে পড়ছেন, পারিবারিক চাপ বাড়ছে, বাড়ছে হতাশা। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্লাস-পরীক্ষা ঠিক করে হলেও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পরীক্ষা না হওয়ার কারণে শিক্ষা খাতে তৈরি হচ্ছে বৈষম্য।

এই সমস্যাগুলোর পাশাপাশি আরও কিছু সমস্যা তৈরি হচ্ছে। দীর্ঘ দিন পড়াশোনার পরিবেশ থেকে বাইরে থাকার কারণে শিক্ষার্থীরা মানসিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হচ্ছেন, বাল্যবিবাহ বেড়ে যাচ্ছে, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা স্কুল থেকে ঝড়ে পড়ছে। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত অনিয়মিত ক্লাস, নগরে ও গ্রামের সুযোগ সুবিধার কারণে শিক্ষা বৈষম্য তৈরি হচ্ছে প্রকটভাবে।

আগামী ২৩ মে স্কুল, কলেজ এবং ২৪ তারিখে বিশ্ববিদ্যালয় খোলার কথা থাকলেও সেটা আর হচ্ছে না। ২৯ মের পর আবার সিদ্ধান্ত। দেশের প্রায় ৪ কোটি শিক্ষার্থীর জন্য টিকা নিশ্চিত হওয়া ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলাও প্রায় অনিশ্চিত। শিক্ষা খাতে তৈরি হওয়া সমস্যাগুলোর সমাধান কীভাবে হবে, সেটা এখনো আমাদের অজানা। 

সম্প্রতি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আটকে থাকা পরীক্ষাগুলো অনলাইনে নেওয়ার কথা শোনা গেলেও সেটা বাস্তবায়ন হবে কিনা, আর বাস্তবায়ন হলেও শিক্ষার্থীদের জন্য সুফল বয়ে আনবে কিনা সেটা দেখার বিষয়। একইসঙ্গে শিক্ষা খাতে অন্য যে সমস্যাগুলো ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে এবং সামনে তৈরি হবে, সেগুলোর সমাধান কী হবে? আর হলে কীভাবে, সেটা সরকারকে স্পষ্ট করতে হবে। নাহয় শুধু শিক্ষার্থীদের নয়, পুরো জাতিকেই এর জন্য দীর্ঘ মেয়াদে ভুগতে হবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, পরিসংখ্যান বিভাগ, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

পাবনা/মাহি  

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়