ঢাকা     সোমবার   ২৩ মে ২০২২ ||  জ্যৈষ্ঠ ৯ ১৪২৯ ||  ২১ শাওয়াল ১৪৪৩

বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের ৮ম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

শাহ মতিন টিপু || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১২:২৯, ১১ জানুয়ারি ২০২২   আপডেট: ১২:৫৩, ১১ জানুয়ারি ২০২২
বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের ৮ম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

সাহিত্য মানুষকে দীর্ঘজীবী করে। আর কিছু না হোক কেবল সাহিত্য কর্মের জন্য বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান আরো অনেক কাল আমাদের মাঝে জীবন্ত হয়ে থাকবেন।

বরেণ্য বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের মহাপ্রয়াণের ৮ম বার্ষিকী আজ। তিনি ২০১৪ সালের ১১ জানুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন। 

১৯৯৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি তিনি প্রধান বিচারপতি হিসেবে বাংলাদেশের বিচার বিভাগের দায়িত্ব নিয়ে অত্যন্ত যোগ্যতার সঙ্গে সে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৬ সালে তিন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন। তবে তিনি এই দুটি পরিচয়ের বাইরেও সর্বজন গ্রহণযোগ্য এক ব্যক্তিত্ব ছিলেন।

নির্লোভ ও নির্মোহ এই মানুষটি স্বস্তি বোধ করতেন প্রধান বিচারপতির পরিচয়ে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার পদটিকে তিনি ‘কণ্টকমুকুটশোভা’ বলে আখ্যায়িত করতেন।

মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান ছিলেন অত্যন্ত উঁচুমানের লেখক। নীরবে-নিভৃতে তিনি দুহাতে লিখে গেছেন। তার সেই লেখার পরিমাণ পাহাড়সম। লেখালেখির হাতেখড়ি আইন ব্যবসা শুরুর দিকে। ১৯৬৫ সালের ডিসেম্বরের ২৯ কি ৩০ তারিখে বই লেখা শুরু করেন। মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের প্রবন্ধ, নিবন্ধ, কবিতা গ্রন্থের সংখ্যা অনেক। তার গ্রন্থাবলির মধ্যে রয়েছে অভিধান, নানাবিষয়ে রবীন্দ্র উক্তি সংকলন, বচন-প্রবচন সংগ্রহ, বিষয়ানুযায়ী কোরানের উদ্ধৃতি বিন্যাস, বঙ্গের ইতিহাস সম্পর্কিত বই, বাংলাদেশের ঘটনাপঞ্জি এবং ভাষণের সংকলন।

মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের প্রবন্ধ বইয়ের সংখ্যা প্রায় ৪০টি। এর মধ্যে আছে- মাতৃভাষার সপক্ষে রবীন্দ্রনাথ (১৯৮৩), রবীন্দ্র প্রবন্ধে সংজ্ঞা ও পার্থক্য বিচার (১৯৮৩), কোরান সূত্র (১৯৮৪), রবীন্দ্র রচনার রবীন্দ্রব্যাখ্যা (১৯৮৬), রবীন্দ্রবাক্যে আর্ট, সঙ্গীত ও সাহিত্য (১৯৮৬), বাংলাদেশ দীর্ঘজীবী হোক (১৯৯৬), যথাশব্দ (১৯৭৪), বচন ও প্রবচন (১৯৮৫), বাংলাদেশ দীর্ঘজীবী হোক (১৯৯৬), তেরই ভাদ্র শীতের জন্ম (১৯৯৬), কলম এখন নাগালের বাইরে (১৯৯৬), আমরা কি যাব না তাদের কাছে যারা শুধু বাংলায় কথা বলে (১৯৯৬), বাংলাদেশের সংবিধানের শব্দ ও খন্ডবাক্য (১৯৯৭), বাংলাদেশের তারিখ (১৯৯৮), বং বঙ্গ বাঙ্গালা বাংলাদেশ (১৯৯৯), সরকার সংবিধান ও অধিকার (১৯৯৯), মৌসুমী ভাবনা (১৯৯৯), মিত্রাক্ষর (২০০০), কোরান শরিফ সরল বঙ্গানুবাদ (২০০০), চাওয়া-পাওয়া ও না- পাওয়ার হিসেব (২০০১), স্বপ্ন, দুঃস্বপ্ন ও বোবার স্বপ্ন (২০০২), রবীন্দ্র রচনায় আইনি ভাবনা (২০০২), বিষন্ন বিষয় ও বাংলাদেশ (২০০৩), প্রথমে মাতৃভাষা পরভাষা পরে (২০০৪), রবীন্দ্রনাথ ও সভ্যতার সংকট (২০০৪), দায়মুক্তি (২০০৫), উন্নত মম শির (২০০৫), এক ভারতীয় বাঙালীর আত্মসমালোচনা (২০০৫), একজন ভারতীয় বাঙালীর আত্মসমালোচনা (২০০৫), কোথায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ (২০০৬), শিক্ষার্থী ও শিক্ষাদাতাদের জয় হোক (২০০৭), বাংলার সূর্য আজ আর অস্ত যায় না (২০০৭), উদয়ের পথে আমাদের ভাবনা (২০০৭), যার যা ধর্ম (২০০৭), বাংলাদেশের তারিখ ২য় খন্ড (২০০৭), রাজার চিঠির প্রতীক্ষায় (২০০৭) এবং জাতি ধর্মবর্ণনারীপুরুষ নির্বিশেষে (২০০৭)। শিক্ষার্থী ও শিক্ষাদাতাদের জয় হোক (২০০৭), বাংলার সূর্য আজ আর অস্ত যায় না (২০০৭) ও স্বাধীনতার দায়ভার (২০০৭)।

তার কবিতাগ্রন্থ চারটি। এগুলো হলো কলম এখন নাগালের বাইরে (১৯৯৭), মনের আগাছা পুড়িয়ে (১৯৯৮), সাফ দেলের মহড়া (২০০৪) এবং মানুষের জন্য খাঁচা বানিও না (২০০৭)।

আত্মপরিচয় দিতে গিয়ে এক লেখায় তিনি বলেছেন, ‘আমার দাদার বাবা ছিলেন একজন কৃষক, আমার দাদা কৃষক-কাম-সিল্ক ব্যবসায়ী এবং আমার বাবা একজন আইনজীবী। শিক্ষাই ছিল আমার একমাত্র পুঁজি।’ ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে তার সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। তিনি একাধারে ভাষাসৈনিক, কবি, প্রাবন্ধিক, শিক্ষাবিদ এবং আইনজীবী।

তার জন্ম ১৯২৮ সালের ৩ ডিসেম্বর ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলার জংগীপুর মহকুমার দয়ারামপুর গ্রামে শিক্ষিত ও রাজনৈতিক পরিবারে। বাবা মৌলভী জহিরউদ্দিন বিশ্বাস আইনজীবী ছিলেন। জহিরউদ্দিন বিশ্বাস প্রথমে আঞ্জুমান এবং পরে মুসলিম লীগ আন্দোলনের সাংগঠনিক পর্যায়ে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় হাবিবুর রহমানের বাবা জাতীয় যুদ্ধ ফ্রন্টের বিভাগীয় নেতা ছিলেন। দেশভাগের পর ১৯৪৮ সালে মুর্শিদাবাদ ছেড়ে জহিরউদ্দিন বিশ্বাস রাজশাহীতে চলে আসেন এবং স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। হাবিবুর রহমানের মা গুল হাবিবা ছিলেন গৃহিণী।

জীবনে সংবর্ধনা, সম্মাননা ও স্বীকৃতির অভাব নেই তার। মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান ১৯৮৪ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পান। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস গবেষণা পরিষদ পুরস্কার, ১৯৯৬ সালে দক্ষ প্রশাসক পুরস্কার, ইব্রাহিম মেমোরিয়াল পুরস্কার, অতীশ দীপংকর পুরস্কার, হিউম্যান ডিগনিটি সোসাইটি থেকে সরোজিনী নাইডু পুরস্কার, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জন্য মার্কেন্টাইল ব্যাংক পুরস্কার-২০০৫ এবং স্পেশাল কনট্রিবিউশন টু হিউম্যান রাইটস পুরস্কার পান। এ ছাড়া সাহিত্য ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পান একুশে পদক-২০০৭।

মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান তার কর্মকাণ্ড ও সৃষ্টির জন্য বাঙালি গণমানসে অনেক অনেক দিন জাগ্রত থাকবেন।

ঢাকা/টিপু 

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়